জালেমের শাস্তি অনিবার্য

প্রতীকী ছবি

ধর্ম

জালেমের শাস্তি অনিবার্য

  • প্রকাশিত ১৯ মে, ২০২১

মুহাম্মদ মিযানুর রহমান

জুলুম-অত্যাচার, নিপীড়ন-নির্যাতন এই জাতীয় শব্দগুলো মিশে যাচ্ছে মুসলিম জনপদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মাজলুমের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ। দুর্বল অসহায়দের ওপর জালেমের এই জুলুম দিন দিন বাড়ছেই। জালেম দুনিয়ার ত্রাস‌ ও অভিশপ্ত। পরিভাষায় দুনিয়াতে ব্যক্তির প্রাপ্য বা অধিকার থেকে বঞ্চিত বা মাহরুম করার নামই জুলুম। যে বাধা প্রদান করে থাকে তাকে বলা হয় জালেম।। ইনসাফবিরোধী কাজ করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, কারো অধিকার হরণ করা, বিনা অপরাধে মানুষের ওপর হামলা করা, নির্যাতন চালানো, কাউকে শারীরিক, আর্থিক, মানসিক ও মান-সম্মানের ক্ষতিসাধন করা, কারো ওপর নৃশংসতা চালানো, অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ দখল করা, অশ্লীল ভাষায় কাউকে গালি দেওয়া, কাউকে যন্ত্রণা দেওয়া, এসবই জুলুমের শামিল।

মনে রাখা উচিত, ইসলাম শুধুমাত্র  কিছু আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব কোনো ধর্ম নয়; বরং ইসলাম জীবন পরিচালনার একটা পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম। এটা একটা পরিপূর্ণ জীবনবিধান। অন্তত কয়েক শতক ধরে ইসলাম যে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনপদ্ধতি তা নিয়ে সারা দুনিয়ায় অহরহ আলোকপাত চলছে। কিন্তু নাস্তিক, মুরতাদ, ইসলামবিদ্বেষী, ধর্মব্যবসায়ী, স্বার্থান্বেষী মুসলমানের কর্ণকুহরে তা যেন কিছুতেই প্রবেশ করছে না! অতএব, যা হবার তাই হচ্ছে, পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজ, জ্ঞান-বিজ্ঞান ইত্যাদিতে আজ একচেটিয়া আধিপত্য মুসলিম বিদ্বেষীদের। ইহুদি- নাসারাদের। জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ ইহুদি-নাসারা ও মুসলিম বিদ্বেষীদের হাতে। সমগ্র সমাজ পরিচালনা করছে আজ তথাকথিত প্রগতিবাদীরা! সাম্রাজ্যবাদ, সমাজবাদ, সেক্যুলারবাদ, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ আজ মুসলমানদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে টেনে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। মানুষ আজ রাষ্ট্রের দাসে পরিণত হয়েছে। অথচ হওয়ার কথা ছিল তার উল্টো। মানুষের জন্য রাষ্ট্রের জন্ম, রাষ্ট্রের জন্য মানুষের জন্ম হয়নি। মানুষের প্রয়োজনেই মানুষ রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলেছে। একমাত্র মানুষের কল্যাণের জন্য একটা সিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে। অথচ সেই রাষ্ট্রই আজ জুলুমতন্ত্রের সর্ব নিকৃষ্ট হাতিয়ার। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেই চলছে জুলুমের প্রতিযোগিতা। ইসলামে সব রকমের অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন অত্যন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন করা নয় এমনকি এসব অন্যায় কাজে সহযোগিতা করাও ইসলামে হারাম করা হয়েছে। তাছাড়া জালিমদের সাথে সম্পর্ক রাখাও ইসলামে হারাম করা হয়েছে। আর জালেমদের জন্য কোনো বন্ধু, সাহায্যকারী ও সুপারিশকারী থাকবে না রোজ হাশরের মাঠে। এটাই তাদের অন্যতম প্রধান শাস্তি।

পৃথিবীতে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা এগিয়ে আসে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় অকৃত্তিমভাবে। অথবা কেউ কোনো ভুল করলেও মানুষ তার জন্য সুপারিশ করে, যেন তাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু মৃত্যুর পর আল্লাহর আদালতে যখন জালেমদের বিচার হবে, তখন কেউই এগিয়ে আসবে না তাদের জন্য। কোনো উপকারী বন্ধুও তারা এই দুর্দিনে পাবে না। পাবে না কোন সুপারিশকারীকেও। সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন মহান আল্লাহ- ‘জালেমদের জন্য কোনো বন্ধু নেই এবং সুপারিশকারীও নেই যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে।’ (সুরা মুমিন, আয়াত-১৮) অন্যত্র বলেন, ‘জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত-১৯২)

মানুষের ওপর অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন এমনই এক মারাত্মক অপরাধ যার কারণে দুনিয়ার জীবনেই এর শাস্তি কোনো না কোনোভাবে জালেম পেয়ে যায়। অসংখ্য শাসক দুনিয়াতে সীমাহীন জুলুম করার শাস্তি এই দুনিয়াতেই ভোগ করে গেছেন। অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন করার কারণে অনেক শাসককে মজলুমের হাতে জীবন দিতে হয়েছে। ফেরআউন, হামান, নমরূদ, আবু জাহেলের ইতিহাস বেশ পুরনো। গত শতাব্দীতে দুনিয়ার অন্যতম জালেম শাসক কামাল আতাতুর্ক মরণের আগেই পেয়েছে জুলুমের স্বাদ।  হাজার জালেমের এমন ঘটনা  ইতিহাসের পাতায় ভুরিভুরি।

আমরা অনেকে জ্ঞানী হিসেবে সমাজে বেশ পরিচিত হলেও অন্যের ওপর জুলুম-নির্যাতন করার ক্ষেত্রে অজ্ঞ জালেমের চেয়ে কোনো দিক থেকে কম নই। বিশেষ করে দুর্বল মানুষের ওপর, প্রকৃত ধার্মিকদের ওপর, অসহায়দের ওপর জুলুম করাকে আমরা অনেকে অন্যায় মনে করি না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জালেমরা জুলুম করে কৌতুক ও আনন্দ অনুভব করে। মনে রাখা জরুরি যে জুলুম এমন এক মহাপাপ যা সাধারণত আল্লাহ কখনো ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত যার ওপর জুলুম করা হয়েছে সে যদি জালেমকে ক্ষমা না করে। শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের নাম ধর্ম নয়। ইসলাম যেমন মসজিদে আছে, ঠিক তেমনি আছে সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে। ক্ষমতার দাপটে অন্যের ওপর চড়াও, জুলুম-নির্যাতন করা মহান আল্লাহতায়ালা সহ্য করবেন না। চাই যত‌ই সে  দীন-ধর্ম পালন করুক না কেন! কারণ সে‌টা বান্দার হক। সুতরাং সব ভালো কাজ পালন করা এবং অন্যায় থেকে বাঁচার নাম‌ই ইসলাম।

মহাগ্রন্থ আল কোরআনে জুলুম সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জালেমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো উদাসীন মনে করো না। তবে আল্লাহ তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন চোখসমূহ বিস্ফোরিত হবে, মানুষ মাথা উপরমুখী করে পড়িমরিভাবে দৌড়াতে থাকবে, তাদের চোখ নিজেদের দিকে ফিরবে না এবং তাদের অন্তর দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আজাব আসার দিন সম্পর্কে সাবধান করে দাও, যেদিন তাদের কাছে আজাব আসবে সেদিন জালেমরা বলবে, হে আমাদের প্রভু! সামান্য সময়ের জন্য আমাদের অবকাশ দিন, আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব (আর কারো ওপর জুলুম করব না) এবং রাসুলদের অনুসরণ করব। (জালেমরা) তোমরা কি ইতঃপূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে তোমাদের কখনো পতন হবে না! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা তো তাদের স্থানেই বসবাস করছ এবং ওই সব জালেমের সাথে আমি কি ধরনের আচরণ করেছি, তা তো তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ পেশ করেছি।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪২-৪৫) অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘জুলুমবাজরা তাদের জুলুমের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে, তাদের গন্তব্যস্থল কেমন?’ ‘আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না, জালেমদের সহযোগী হবে না, তাহলে জাহান্নামের আগুন তোমাদেরও স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত-১১৩) জালেম বা জুলুমবাজদের জানা উচিত, তাদেরও একদিন আল্লাহর দরবারে গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, জালেমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহকে উদাসীন মনে করো না। যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে, জুলুমবাজরা তাদের অত্যাচারের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে।’ (সুরা শুরা, আয়াত-২২)

হাদিস শরিফে জালেমের ব্যাপারে উল্লেখ রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা জালেমদেরকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন তাদের পাকড়াও করেন তখন আর তাদের রেহাই দেন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন, তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও হয় অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুমিনরা যখন দোজখের আগুন থেকে পরিত্রাণ পাবে তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে একটি সেতুর ওপর তাদেরকে থামানো হবে এবং তখন দুনিয়ায় তারা একে অপরের প্রতি যে জুলুম করছিল তার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা পাপমুক্ত হয়ে পবিত্র হবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এরপর তিনি বলেন, সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে  মোহাম্মদের জীবন নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যেকের কাছে দুনিয়ার বাড়িঘর যেমন পরিচিত ছিল তার থেকেও বেশি জান্নাতের বাড়ি চিনতে পারবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-২২৬৩)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘জুলুম জালেমের জন্য কিয়ামতের দিন কঠিন অন্ধকার হয়ে আসবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ২২৭০) হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠালেন এবং তাকে বললেন, মজলুমের অভিশাপকে ভয় কর। কেননা, তার অভিশাপ ও আল্লাহর মাঝে কোনো আড়াল থাকে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-২২৭১) হজরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি রাসুলুলাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারো জমি জোর-জবরদস্তি করে কেড়ে নেবে কিয়ামাতের দিন সাতস্তর জমি তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-২২৭৫) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, হে আমার বান্দারা! আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পরের ওপর জুলুম করো না।’ (সহিহ মুসলিম, তিরমিজি)

লেখক : তালিবে ইলম, মাদরাসাতুল ইহসান আল  আরবিয়া, উত্তরা, ঢাকা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads