জিনা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে

প্রতীকী ছবি

ধর্ম

জিনা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে

  • প্রকাশিত ৬ অক্টোবর, ২০২১

মোসা. সানজিদা কুররাতাইন

আমরা সর্বদা একটা কথা সব জায়গাতেই শুনে থাকি যে, বেগানা একটা ছেলে ও একটা মেয়ের মাধ‍্যমে সম্পর্কের সৃষ্টি হওয়াই জিনা। আসলেই কি তাই? যদিও এই কথাটার কিয়দংশ সঠিক কিন্তু অনেক কিছুই গোপন রয়ে গেছে। ‘জিনা’ শুধু দুটি বর্ণ নয়, এর ব‍্যাপকতা অনেক। কিন্তু সহজভাবে অন্তরে ধরে রাখতে পারলে খুবই সহজ। বলতে গেলে জিনা তিনটি ধাপ পেরিয়ে পরিপক্বতা লাভ করে। যেমন মনের জিনা, চোখের জিনা, মুখের জিনা। সবশেষে এই তিন প্রকারের চরম পরিণতি হয় ব‍্যভিচার।

মনের জিনা বলতে বোঝায়, কোনো বেগানা নারী বা পুরুষের প্রতি মন থেকে আকর্ষণ অনুভব করা তা বিন্দু পরিমাণ হলেও। আপনার মনে চাইল কোনো বন্ধু অথবা বান্ধবীর সাথে বা কাজিনের সাথে, ছেলে হলে মেয়েদের সাথে এবং মেয়ে হলে ছেলেদের সাথে কথা বলা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই। আপনি তখন বিন্দু পরিমাণ চিন্তা না করে তার (আপনার কাঙ্ক্ষিত  ব‍্যক্তির) সাথে কথা বলার জন‍্য প্রস্তুতি নিলেন সে অনলাইনে হোক বা অফলাইনে। এটাই মনের জিনা।

চোখের জিনা বলতে বোঝায়, ইসলামের নিয়মে যাদের সাথে দেখা দেওয়া হারাম। একদম অতিরিক্ত বাধ‍্য না হয়ে তাদের সাথে দেখা দেওয়া চোখের জিনা। শরীয়তের বিধিসম্মত নিয়ম হচ্ছে, বেগানা নারী অথবা বেগানা পুরুষ (একদম অতিরিক্ত বাধ‍্য না হলে) একে অপরের দিকে চোখ পড়ার সাথে সাথে তার দৃষ্টি অবনত করবে। কিন্তু আপনি যদি দৃষ্টি অবনত না করে আরো মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তা হলে এইটা হবে আপনার চোখের জিনা।

আর মুখের জিনা বলতে বোঝায়, অতিরিক্ত বাধ‍্যবাধকতা ছাড়া অবাধে বেগানা পুরুষ ও বেগানা নারীর কথোপকথন হচ্ছে মুখের জিনা। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, চোখের জিনা হলো দেখা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খায়েশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। (মুসলিম ৪৬/৫, হাঃ ২৬৫৭, আহমাদ ৮২২২, সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬২৪৩) আল্লামা খাত্তাবী (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘‘দেখা ও কথা বলাকে যিনা বলার কারণ এই যে, দুটোই হচ্ছে প্রকৃত যিনার ভূমিকা- যিনার মূল কাজের পূর্ববর্তী স্তর। কেননা দৃষ্টি হচ্ছে মনের গোপন জগতের উদ্বোধক আর জিহবা হচ্ছে বাণী বাহক, যৌনাঙ্গ হচ্ছে বাস্তবায়নের হাতিয়ার- সত্য প্রমাণকারী।’’ মা’আলিমুস সুনান ৩য় খণ্ড ২২৩ পৃষ্ঠা) অন্য হাদিসে আছে- যেখানে দুজন বেগানা নারী-পুরুষ নির্জনে একত্রিত হয়, সেখানে তৃতীয়জন হয় শয়তান।" (সহীহ্ তিরমিযী, ১১৭১)

জিনা কীভাবে সৃষ্টি হয় সে ধারণা আমাদের পুরোপুরি থাকে না। মুলত অতিরিক্ত প্রয়োজন ছাড়া আমরা যদি একজন তার বিপরীত লিঙ্গের (শরীয়তে হারাম এমন) সাথে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ না করেই দেখা সাক্ষাৎ করতে থাকি তখনই জিনার সৃষ্টি হয়। জিনার সূচনা পর্ব হচ্ছে মন। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি মানসিক আকর্ষণ সৃষ্টি হলে আমরা যদি নিজেদের মনকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারি বা করার চেষ্টা না করি তাহলেই একে একে চোখের ও মুখের জিনা সংঘটিত হবে। অবশেষে এটা ব্যভিচারে রূপ নেবে। এজন‍্যই সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে।

বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত‍্য; অনলাইনে বা অফলাইনে বিনা কারণে একজন বেগানা নারী অথবা পুরুষের সাথে সালাম বিনিময় তার খোঁজ খবর নেওয়া থেকেও প্রায়ই জিনার সৃষ্টি হয়। এই বিষয়টি হচ্ছে নেক ছুরতে শয়তানের ধোকা। সে (শয়তান) আপনাকে স্বাভাবিকভাবে জাহান্নামী বানাতে না পারলে আপনার পছন্দের পথেই চেষ্টা করবে। (বনি ইসরাইলের বারসিসার কথা তো জানাই আছে) প্রথম দিকে ব্যাপারটা সালামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে আস্তে আস্তে তা বিস্তার লাভ করে।

জিনা থেকে মুক্তি পেতে পরিপূর্ণ ইসলামি তরিকায় পর্দা করতে হবে। কারণ, সঠিকভাবে পর্দা করলে বেগানা পুরুষ আপনার প্রতি আকর্ষিত হবে না। যেমনটি কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ্ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন। (সূরা আল-আহযাব, আয়াত নং ৫৯) আরো কিছু পন্থা আছে- জিনা থেকে বেঁচে থাকার জন‍্য। যেমন, আমরা বেগানা নারী বা পুরুষের খোঁজ খবর কেন নিতে যাব? আমাদের খোঁজ নেওয়ার জন‍্য বা কুশল বিনিময়ের জন‍্য আমাদের ইসলাম সম্মত আত্মীয় সজন বা আমাদের স্বজাতি (ছেলেদের জন‍্য ছেলে এবং মেয়েদের জন‍্য মেয়ে) বন্ধুরা তো আছে। আমরা কেন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার খোঁজখবর নিতে যাব! কি মনে করছেন আপনার সমাজ রক্ষা বা বন্ধুদের মন রক্ষা হবে না? নর্দমায় ছুরে ফেলে দিন ওইসব আজেবাজে মন রক্ষার বিষয়কে। আল্লাহ্ তাআলার মন রক্ষা করেন। ইনশাআল্লাহ্ তিনি আপনার ইমেজ অন‍্যদের সামনে খারাপ হতে দেবেন না।

এছাড়া জিনা থেকে বেচে থাকার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে বেশি বেশি আল্লাহ্ তাআলার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা। আল্লাহ্ তাআলার সাথে সম্পর্কে যখন ছেদ পরবে, তখনই শয়তান আপনাকে জিনার দিকে ঠেলে দেবে। যখন মনকে নিয়ন্ত্রণ  করা একান্তই কষ্ট হয়ে পরবে। আল্লাহ্ তাআলার কাছে সাহায্য চান। একাকিত্ব পরিহার করুন। একান্তই কোনো সাহায্যের দরকার প্রথমে নিজের স্বজাতীয় ফ্রেন্ডদের কাছে দেখেন, না পারলে তারপর ছেলে অথবা মেয়েদের কাছে। এভাবে ছোট ছোট কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে আমরা মুক্ত হতে পারবো জিনানামক ভয়াবহ গুনাহ থেকে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখিকা : শিক্ষার্থী (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads