দক্ষিণাঞ্চলের (পিরোজপুর) বলেশ্বর নদী তীরবর্তী জেলে জনগোষ্ঠীর শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন, তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত, নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করার পাশাপাশি তাদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সৃষ্টি করতে কাজ করে যাচ্ছে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন। দারিদ্র্য এ জনগোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত যার ফলে সামাজিক ভাবে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সমাজের অন্যদের সাথে বৈষম্য দূরীকরণে তাদের জন্য কাজ করছে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন। এরই ধারাবাহিকতায় হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের ‘ডিজিটাল ভিলেজ’ মাধ্যমে বলেশ্বর নদী তীরবর্তী শিশু শিক্ষর্থীদের জন্য আয়োজন করা করে হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা। মঠবাড়িয়ার জেলেপল্লীর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে বিজ্ঞানমেলার এই আয়োজন করা হয়। এই মেলায় অংশ নিয়েছে তরুণ উদ্ভাবকরা। গত সোমবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া মেলাটি চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। আয়োজকেরা জানান, হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের বিজ্ঞান শিক্ষা উদ্যোগ ‘ডিজিটাল ভিলেজ’-এর অধীনে বর্তমানে বেশকয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় শেখানো হচ্ছে। প্রতিবছর এই বিজ্ঞানমেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ এবং তাদের উৎসাহ প্রদান করা হয়। বিভিন্ন প্রযুক্তির অভিনব গঠন বিভিন্ন প্রজেক্টে নিজেদের সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ, প্রযুক্তির এমন বিবিধ ব্যবহার দেখতে খেজুরবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেলা প্রাঙ্গনজুড়ে ছিল আগ্রহী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়। আয়োজিত এ উৎসবে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান প্রজেক্ট, কুইজ প্রতিযোগিতা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনা, বিজ্ঞানের মজার বইয়ের সঙ্গে পরিচিতি করে দেওয়া হয়। হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রুবেল মিয়া মনে করেন, এ রকম বিজ্ঞান উৎসব শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বাড়িয়ে দেবে। এসময় উপস্থিত ছিল সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সুমন মিস্ত্রী সজিব, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৌরভ হাওলাদার নীল, উপজেলা শাখার সভাপতি পলাশ বৈরাগী, সুস্মিতা অধিকারী, দ্বীপ দেবনাথ, সৌরভ বেপারী, দুর্জয় তালুকদার প্রমুখ।
২০১৮ সালের ১৭ মার্চ হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু। শুরুর পর থেকে বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে জেলে জনগোষ্ঠীর শিশুদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন। প্রজেক্টের বাইরেও তারা কাজ করছে সামাজিক ব্যাধি বাল্যবিবাহ এবং ইভটিজিং প্রতিরোধে। সরকারি টোল ফ্রি নম্বর ৯৯৯, ১০৯ এর সুবিধাসমূহের তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন আদর্শকে নতুন ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তারা করছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক শিশু চলচ্চিত্র প্রদর্শনী উৎসব। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রাস্তার ধার জেলেদের বাড়ির আঙিনা ও বিভিন্ন স্থানে তারা করে যাচ্ছেন বৃক্ষরোপণ। হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তড়িৎ প্রকৌশলী মো. রুবেল মিয়া নাহিদ। তিনি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। যার দিকনির্দেশনায় এগিয়ে যাচ্ছে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন। হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তরুণ উদ্যোক্তা সুমন চন্দ্র মিস্ত্রি সজিব। তিনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। যার পরিশ্রম ও পরিচালনায় এগিয়ে যাচ্ছে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন।
জেলে শিশুদের কল্যাণে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন কাজ করে বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে। যে সমস্ত শিশুদের নেই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ সে সমস্ত শিশুদের জন্য রয়েছে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের ‘হাতে খড়ি ফ্রাইডে স্কুল’।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই শিশুদের জন্য নেই কোনো খেলাধুলার ব্যবস্থা। পড়াশুনা করতে করতে যখন তারা ক্লান্ত, তাদের মধ্যে বাসা বাঁধে একঘেয়েমিতা। তখন তাদের প্রয়োজন একটু খেলাধুলার। কিন্তু নানা কারণে সেই সুযোগ পায় না এই সব জেলে জনগোষ্ঠীর শিশুরা। তাদেরকে একটু বিনোদন দিতে প্রায় সময় তাদের জন্য হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন আয়োজন করে উপকূলে আনন্দবিলাস। যেখানে থাকে জেলে শিশুদের জন্য নানারকম খেলাধুলার আয়োজন ও পুরস্কারের ব্যবস্থা। হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়ে স্কুলমুখী হয় জেলে শিশুরা। তবে বিপত্তি বাধে বর্ষা মৌসুমে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এই সময়ে। যেখানে নেই তাদের পড়াশুনার সুযোগ সেখানে বৃষ্টিতে ছাতা ব্যবহার তাদের কাছে অলীক স্বপ্ন। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে স্কুলে যেতে পারে না এই সব শিশুরা। এসময়ও তাদের পাশে দাঁড়ায় হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন। তাদেরকে উপহার দেয় রঙিন ছাতা, কর্দমাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে মাথার ওপর রঙিন ছাতা নিয়ে আনন্দে স্কুলে পৌঁছায় জেলে শিশুরা। দুপুরের টিফিন নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদেরকে দেওয়া হয় সুন্দর সুন্দর টিফিন বক্স, পানি নিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়াটার পট। অনেক জেলে শিশু আছে যারা মনে করে তাদের দয়া করা হচ্ছে। এই সংগঠন তাদের দয়া করছে না সেজন্য তারা আয়োজন করে এক টাকার মিনি মার্কেট। যে মার্কেট থেকে শুভেচ্ছা মূল্য এক টাকার বিনিময়ে বাচ্চারা কিনে নিতে পারে তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণটি। এক টাকার মিনি মার্কেটে প্রতিটি শিশুর জন্য থাকে এক একটি প্যাকেজ। যে প্যাকেজে থাকে তাদের খুব প্রয়োজনীয় চার-পাঁচটি শিক্ষা উপকরণ। এছাড়াও বেশ কয়েকটি প্রজেক্টের মাধ্যমে হাতে খড়ি ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে জেলে শিশুদের কল্যাণে। জেলে জনগোষ্ঠীর শিশুদের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা হাতে খড়ি ফাউন্ডেশনের সফলতার ঝুঁড়িতেও রয়েছে পূর্ণতা।





