রতন বালো :
স্বাধীনতার ৫০ বছরেও কার্যকর হয়নি ট্যানারি শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি কাঠামো। ফলে সারা দেশে দুই লাখ পুরুষ ও নারী শ্রমিক ন্যায়সংগত পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও সরকার পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করেছে। আর গত ১৫ জানুয়ারি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে ২ হাজার ৬ শ ৪৩ শ্রমিক এবং তাদের পরিবারকে ১৫ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদানে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
যদিও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত এই চামড়া শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই সরকার চামড়া শিল্পকে অন্যতম উচ্চ অগ্রাধিকার শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে। পাশাপাশি। শিল্পটি ২০১৭ সালে ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তারপরও গত বছর ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে এই শিল্প খাতটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
জানা গেছে, ট্যানারির মালিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দুইটি এসোসিয়েশন রয়েছে। বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশন এর সাথে ট্যানারী ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন ৩৮ বছর ধরে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে প্রতি দুই বছর পর পরই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করে আসছে। কিন্তু মালিকরা সব সময়ই পুরো চুক্তি বাস্তবায়ন অনীহা দেখান। ফলে শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
চুক্তির শর্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে কোনো শ্রমিকই বর্তমানে অস্থায়ী শ্রমিক হিসাবে থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্থায়ী কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ১০ থেকে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করেও স্থায়ী শ্রমিক হতে পারেননি। দীর্ঘ সময় পরেও তাদের অস্থায়ী হিসাবে আখ্যায়িত করে স্থায়ী শ্রমিকের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এছাড়া একটি আধুনিক, উন্নত ও পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের সরকারি উদ্যোগকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। শ্রমিকদের আশা ছিল ট্যানারি স্থানান্তর হলে কিছুটা হলেও তাদের শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু শ্রমিকদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। চামড়া শিল্প নগরীতে শ্রমিকদের থাকার জন্য বাসস্থান, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, খাবার জন্য ক্যান্টিনসহ অন্যান্য ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা না রাখায় প্রতিনিয়ত শ্রমিকরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এবং বেরকারি প্রতিষ্ঠান সলিডারিটি সেন্টার (বাংলাদেশ অফিস) এর যৌথ এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয় ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক বলেন, প্রায় ৭০ বছরের পুরানো ট্যানারি শিল্প প্রথমে নারায়ণগঞ্জে এবং পরে ঢাকার হাজারীবাগে বিকাশ লাভ করে। পরিবেশ ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য ট্যানারি শিল্প ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ঢাকার অদূরে সাভারের হেমায়েতপুরে ‘বিসিক চামড়া শিল্প নগরী’তে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে ১৫৪টি ট্যানারি জমি বরাদ্দ পায়, কিন্তু বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে ১৩২টি ট্যানারি। এর ২২টি ট্যানারি এখনো কোনো কাজ ধরতে পারেনি।
করোনা মহামারির মধ্যেও ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন কাজ করেছে বলে জানান ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। এসময় ট্যানারি শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং পরিবেশ বিষয়ে শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সম্পর্কে শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সক্ষমতা উন্নয়ন, শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যক্যাম্প আয়োজন, কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষার জন্য মাস্ক ও অন্যান্য উপকরণ বিতরণ এবং আইন সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে করোনা মহামারির কারণে প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে সলিডারিটি সেন্টার-বাংলাদেশ অফিস এর প্রোগ্রাম অফিসার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যের কারণে পরিবেশ দূষণের ইস্যুটি বহুল আলোচিত। ট্যানারি স্থানান্তরের দীর্ঘ ৫ বছরেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং মানসম্পন্ন কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) তৈরি না করা ও তা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ দূষণের দায়ে কারখানাগুলো এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পায়নি।
তিনি বলেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ প্রতিবেদনে জানিয়েছিল,‘চামড়াশিল্প নগর বন্ধের সুপারিশ’ চামড়া শিল্পের সংকটকে আরো প্রকট করেছে। ট্যানারি বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণের দায় কখনোই শ্রমিকদের নয়, কিন্তু দুঃখজনক হলো এই যে এর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই সংকটের পেছনে যে বা যারাই দায়ী তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিৎ।
ট্যানারি শ্রমিকরা ন্যায়সঙ্গত পাওনা মজুরি থেকে বঞ্চিত কিনা জানতে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলেননি। তবে তার তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম একটি প্রেসবিজ্ঞপ্তি দেন। এতে শ্রম কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আমরা চেষ্টা করছি ট্যানারি শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো সক্রিয় করার। গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন কাঠামো তৈরি হয়েছে। ট্যানারি শ্রমিকদেরও ন্যায়সঙ্গত মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন তিনি।





