রাজধানীর শাহাজাহানপুর থানার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যায় ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করা হয়েছে। হত্যায় অংশগ্রহণকারী দুজনের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আটককৃতের নাম মাসুম। তবে এ খুনের মোটিভ বা কারা তাকে ভাড়া করেছিল এ বিষয়ে কিছুই জানায়নি ডিবি।
তবে স্থানীয় সূত্র ও গোয়েন্দাদের ধারণা বিদেশে পলাতক কিছু সন্ত্রাসী দেশীয় সহযোগীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্র ধরেই এ আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে।
ডিবি পুলিশ জানায়, টিপুকে হত্যার জন্য ঘটনার ৫ দিন আগে ‘কন্ট্রাক্ট’ (চুক্তি) করে মাসুম মোহাম্মদ আকাশ নামে এক পেশাদার খুনি। তিন দিন আগে সে নাম পায় কাকে খুন করতে হবে। ঘটনার আগের দিন টিপুকে কমলাপুরে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সে। হত্যাকাণ্ডের জন্য টাকা নয়, আগের কয়েকটি মামলা তুলে নেওয়াসহ বিশেষ সুবিধার নিশ্চয়তা দেওয়া হয় তাকে।
গতকাল রোববার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির (গোয়েন্দা) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার।
তিনি বলেন, জাহিদুল ইসলাম টিপু ও সামিয়া আফরান প্রীতিকে গুলি করে হত্যাকারী শুটারের নাম মাসুম মোহাম্মদ আকাশ (৩৪)। সে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার কাইশকানি এলাকার মোবারক হোসেনের ছেলে। রাজধানীর পশ্চিম মাদারটেকের ৬০/১৫ বাসায় পরিবার নিয়ে থাকে সে। তার নামে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে।
বগুড়া জেলা পুলিশের সহযোগিতায় ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনাল টিম বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বগুড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।
হাফিজ আক্তার বলেন, গত ২৪ মার্চ রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে মতিঝিল এজিবি কলোনি থেকে বাসায় যাওয়ার পথে শাহজাহানপুর থানার আমতলা এলাকায় অজ্ঞাত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করার উদ্দেশে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে জাহিদুল ইসলাম টিপু ও তার ড্রাইভার এবং রিকশা আরোহী সামিয়া আফরান প্রীতি নামের এক মেয়েকে গুরুতর জখম করে। তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও রিকশা আরোহী প্রীতিকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় শাহজাহানপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। গোয়েন্দা মতিঝিল বিভাগ ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে।
ঘটনার আগের দিন প্রথম হত্যার চেষ্টা : হাফিজ আক্তার বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শুটার আকাশ জানিয়েছে, ঘটনার আগের দিন ২৩ মার্চ জাহিদুল ইসলাম টিপুকে তার এজিবি কলোনির রেস্টুরেন্ট থেকে বাসায় যাওয়ার রাস্তায় অনুসরণ করে গুলি করার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু বেশি লোকজন থাকায় সে ব্যর্থ হয়।
অনুসরণ করে শাহজাহানপুরে এসে হত্যা : ঘটনার দিন ২৪ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একজন ফোন করে মাসুমকে জানায়, টিপু তার অফিসে (রেস্টুরেন্ট) অবস্থান করছে। এ সংবাদ পেয়ে মাসুম জাহিদুল ইসলাম টিপুর রেস্টুরেন্টের কাছ থেকে টিপুকে অনুসরণ করা শুরু করে এবং গুলি করার জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু টিপু অনেক লোকজনের মধ্যে থাকায় গুলি করতে না পেরে টিপুর গাড়ি অনুসরণ করে সে। গাড়িটি শাহজাহানপুর রেল লাইনের আগে আমতলাসংলগ্ন রাস্তায় যানজটে আটকা পড়লে মাসুম গাড়ির চালকের পাশের আসনে বসা টিপুকে লক্ষ করে উপর্যুপরি গুলি করে। টিপুর মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায় সে।
জয়পুরহাট সীমান্ত দিয়ে পালানোর চেষ্টা : ঘটনার পর দুই বন্ধুর সহযোগিতায় নিরাপদ স্থানে আত্মগোপনে যায় শুটার মাসুম। পরে সে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিরপরাধ রিকশা আরোহী প্রীতি এবং টিপুর মৃত্যুর সংবাদ দেখতে পায়। এরপর সে জয়পুরহাট চলে যায়। সেখান থেকে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পার হতে না পেরে বগুড়ায় যায় সে। সেখানে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর বগুড়া জেলা পুলিশের সহযোগিতায় মাসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কারা মাসুমকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছে জানতে চাইলে হাফিজ আক্তার বলেন, যারা কন্ট্রাক্ট দিয়েছে তাদের কয়েকজনের নাম সে বলেছে। টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, তার নামে মামলা তুলে নেওয়ার সুবিধার বিষয় থাকতে পারে।
ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, অনেকদিন পর শুটিং কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। আমরা দিনরাত পরিশ্রম করেছি। শুটিং মিশনে অনেকগুলো গুলি ছোড়া হয়। মূল কিলার গ্রেপ্তার হয়েছে। এখন তদন্তে জানা যাবে মোটিভ। আর কারা ছিল, কী কারণে খুন, পেছনে কারা জড়িত তা জানার চেষ্টা চলছে।
অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে বলছেন মাসুমই টিপু হত্যার শুটার এমন প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আক্তার বলেন, তদন্তে নিশ্চিত হয়েছি, সে কিলিং মিশনে ছিল। ঘটনার পর ৫/৬ ঘণ্টার মধ্যেই নিশ্চিত হই, কিলিং মিশনে সেসহ দুজন ছিল। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।
পালানোর সময় তার কর্মকাণ্ড, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোটরসাইকেলের ব্যবহার- এসব মিলিয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেপ্তার করেছি।
এদিকে স্থানীয় সূত্র বলছে, গত দুই বছর ধরে কমলাপুর রেল কলোনি ও শাজাহানপুর গরুর হাট নিয়ে মতিঝিল ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়ান টিপু। এর আগে তিনি বিদেশে ছিলেন। ক্যাসিনোকাণ্ডে বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ জেলে যাওয়ার পর ওই ছাত্রলীগ নেতা কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। এক পর্যায়ে খালেদের শাজাহানপুর এলাকার ডিশ ও ইন্টারনেটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন। এ নিয়ে খালেদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হলে সেই নেতা কিছুদিন আত্মগোপনে যান। এই সুযোগে খালেদের বাগিচা এলাকার ক্যাডারদের নিয়ে টিপু ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিজের আয়ত্তে নেন। সমপ্রতি ওইসব ব্যবসা থেকে টাকার ভাগ পাচ্ছিল না খালেদ ও তার নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে খালেদের সঙ্গে টিপুর দূরত্ব বাড়তে থাকে। একই সময়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তিবাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় টিপুর হাতে। সমপ্রতি সেখানে ভাগ বসান মহানগর আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা। গত বৃহস্পতিবারও ওই স্কুলে বিপুলসংখ্যক ছাত্র কর্মচারী কোটায় ভর্তি হয় বলে কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান। সেই টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ১০নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী ওমর ফারুকের সঙ্গে ঘটনার দিন সকালেও এজিবি কলোনিতে বিবাদ হয়। তাতে যোগ দেন এক কাউন্সিলর। এ ঘটনার আগে রেলের একটি বড় ধরনের টেন্ডার নিয়ে মহানগর ওই নেতার সঙ্গেও বিরোধ সৃষ্টি হয় টিপুর। সব বিষয় নিয়ে টিপুবিরোধী পক্ষগুলো এক হয়ে খুনের পরিকল্পনা করে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষ থেকেও এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানানো হয়েছে।
২০১৬ সালে মতিঝিল এলাকায় যুবলীগ নেতা রিজভী হাসান বাবু ওরফে বোচা বাবু খুন হন। বোচা বাবুর বাবা কালামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু টিপু। টিপু হত্যার সময় একই গাড়িতে ছিলেন কালাম। সৌভাগ্যেক্রমে বেঁচে যান তিনি। বোচা বাবু হত্যা মামলায় ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী ওমর ফারুক, মিল্কী হত্যা মামলার আসামি সুমনসহ ১০-১২ জন সবাই যুবলীগের নেতাকর্মী। এই মামলায় ওমর ফারুকসহ সবাই চার্জশিটভুক্ত আসামি। সমপ্রতি একজন মন্ত্রীকে দিয়ে ওমর ফারুক ওই মামলা থেকে তার নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করান। কিন্তু বাদ সাধেন টিপু। এ বিষয়টি নিয়েও ক্ষিপ্ত হন ওমর ফারুক। সূত্রমতে, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ধারণা, ত্রিমুখী গেমের সঙ্গে সর্বশেষ যুক্ত হন মিল্কী হত্যায় যুক্ত তারই গাড়ির চালক ও দেহরক্ষী সাগর। অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল এলাকার এক সময় নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্রাট, খালেদ, তারেক ও টিপু। এদের মধ্যে মিল্কী খুনের পর তারেক র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। খালেদ ও সম্রাট জেলে। মিল্কীর নেতাকর্মীদের একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সাগর। মিল্কী খুনের সময় সাগরের স্ত্রীর সঙ্গে খুনি তারেকের একাধিকবার কথোপকথনের রেকর্ড পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় মিল্কীর খুনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তার স্ত্রী গ্রেপ্তার হলেও অজ্ঞাত কারণে রেহাই পায় সাগর। সমপ্রতি সাগরও মতিঝিল এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সবার বাধা ছিলেন টিপু। এ কারণে মতবিরোধ থাকলেও টিপুকে সরাতে একজোট হয়েছে বিরোধীপক্ষগুলো। এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্ত সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, পুরো ঘটনা সমন্বয় করা হয়েছে দেশের বাইরে থেকে। দেশের বাইরে থেকে কারা কারা কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে পাশাপাশি মাসুমের কল লিস্টে কাদের যোগাযোগ ছিল সব তদন্ত করা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই পুরো বিষয়টি সামনে চলে আসবে বলেও জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে জাহিদুল ইসলাম টিপু মাইক্রোবাসে করে শাহজাহানপুর আমতলা হয়ে বাসায় ফিরছিলেন। শাহজাহানপুর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ করে গুলি করে। এতে জাহিদুল ও তার গাড়িচালক মুন্না গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় জাহিদুলের গাড়ির পাশে রিকশায় থাকা বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী প্রীতিও গুলিবিদ্ধ হন। তাদের রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল ও প্রীতিকে মৃত ঘোষণা করেন। গুলিবিদ্ধ গাড়িচালক মুন্না বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় পরের দিন শুক্রবার (২৫ মার্চ) দুপুরে নিহত জাহিদুল ইসলাম টিপুর স্ত্রী ফারজানা ইসলাম ডলি বাদী হয়ে শাহজাহানপুর থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১৮।





