ছাত্ররাজনীতি। মানে রাজনীতি শেখার ছাত্র। যেখান থেকে হওয়া যায় বড় বড় নেতা। আমাদের বঙ্গবন্ধুকেও আমরা ছাত্ররাজনীতি থেকে পেয়েছি। যত বড় নেতা এসেছেন, তারা সবাই ছাত্ররাজনীতি থেকেই সৃষ্টি। যারা ছাত্ররাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন, তারাই আজ জনপ্রিয় নেতা হতে পেরেছেন। যাহোক, এসব পুরনো কথা। এখনকার ছাত্ররাজনীতির কথা বলি। ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রসেনা, ছাত্রজোটসহ কতশত দল। আমি মনে করি, ছাত্ররাজনীতি প্রয়োজন দেশের রাজনীতিতে ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি হওয়ার জন্য। ছাত্ররাজনীতি থেকে রাজনীতির ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহণসহ নানা কলাকৌশল রপ্ত করতে পারলে এবং মানুষের জন্য কাজ করলে তারা একদিন দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে, সন্দেহ নেই।
২৮ বছর পর আজ ডাকসু সচল। সচল হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি। অনেক নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমাকে হার মানিয়েছে এ নির্বাচন। আর নির্বাচনের ফল দেখে অনেকেই শকড্। যারা ২৮ বছর আগেও ছাত্ররাজনীতিকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করেছেন, এখন তারাই এ রাজনীতিকে বাঁকা চোখে দেখছেন। কোনো এক ছাত্রনেতা তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে আরো ২৮ বছর ডাকসু অচল থাকুক তবু জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে আমরা এক হব না। তবে তার সঙ্গে আমি আরেকটু যোগ করতে চাই, তা হচ্ছে— প্রয়োজনে যদি ২৮ হাজার বছর ডাকসু বন্ধ থাকত, তাহলে মানুষের মধ্যে ছাত্ররাজনীতির প্রতি সম্মান থাকত, সেটাই ভালো ছিল। আজ ২৮ বছর পরে এ ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে ডাকসুর ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে গেল। এখন মানুষ বলে, যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, সেখানে একটি দেশে আর কী নির্বাচন হবে! বলতেই পারে। কারণ দেশের মানুষের তো বাকস্বাধীনতা আছে। যা দেখছে তা তো বলবেই। আমার মনে হয় কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল ডাকসু নির্বাচন পুনরায় দিয়ে দেশের মানুষের মনে বিশ্বাস স্থাপন করার।
কিন্তু আমাদের দেশে এসব লিখে কোনো লাভ নাই; বরং সবকিছু যেন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এই যেমন নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করেছিলাম। এখন দেখছি আগের চাইতে বেশি মৃত্যু হচ্ছে। শব্দদূষণ নিয়ে লিখেছি, মানববন্ধন করেছি। এখন রাস্তায় নামলে দেখি শব্দবোমা আরো বেড়ে গেছে। নিজেদের সচেতন হওয়ার জন্য লিখেছিলাম; কিন্তু এখন দেখি নিজেরাই বেশি অসচেতন। একজন ছাত্র যখন ছাত্ররাজনীতি থেকে চুরি, মারামারি, অন্যায় এসব শেখে, তখন সে বড় নেতা হয়ে কী হবে বলুন তো? সহজ উত্তর দুর্নীতিবাজ। তাহলে কি এখন আমরা বড় বড় নেতার অপেক্ষায় না থেকে বড় বড় দুর্নীতিবাজের অপেক্ষায় থাকব! অনেকটা সেরকমই মনে হচ্ছে।
আগে জানতাম ছাত্ররাজনীতির হাতিয়ার কলম। কিন্তু এখন ছাত্ররাজনীতির হাতিয়ার লাঠি। ছাত্ররাজনীতি মানে এখন একদল অন্যদলকে ধাওয়া করবে, একদল অন্যদলকে পেটাবে। এ সবই এখনকার ছাত্ররাজনীতির মূল প্রতিপাদ্য। সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচন সে কথাই প্রমাণ করে। তাই ডাকসু সচল করতে গিয়ে আমরা অচল করে ফেলেছি ছাত্ররাজনীতি।
আমরা ছাত্ররাজনীতি মানে এখন বুঝি পড়াশোনা বাদ দিয়ে মারামারি করা। হাতে কলম আর খাতা থাকার পরিবর্তে লাঠি আর ছুরি-পিস্তল থাকা। কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব কিন্তু ক্যাম্পাসে বসে নেতাগিরি করার নাম ছাত্ররাজনীতি। কয়েকটি নামকরা কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ঘুরে এলে দেখা মিলবে কত কত নেতা কলেজ ক্যাম্পাসে পড়ে আছে। তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখুন তারাও পড়াশোনায় আছে। কিন্তু রাজনীতির জন্য সে ক্লাস করে না। আমার কাছের কয়েকজন বন্ধু আমাকে সবসময় বলে, রাজনীতি করলে নাকি পড়াশোনা করা যায় না। তার পড়াশোনা নাকি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি আমার কাছে বিষের মতো মনে হয়। কেন রাজনীতি করলে পড়া যাবে না? রাজনীতি করা যদি কারো স্বপ্ন হয়ে থাকে তবে সে কেন রাজনীতি করবে না?
রাজনীতি তো বঙ্গবন্ধুও করেছেন। রাজনীতি তো শেখ হাসিনাও করেছেন। রাজনীতি তো ওবায়দুল কাদেরও করেছেন। রাজনীতি তো তোফায়েল আহমেদও করেছেন। কিন্তু তারা পড়াশোনাটাও সেভাবে করেছেন। সবাই উচ্চশিক্ষিত হয়ে আজ প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ হয়েছেন। তাহলে আমরা কেন পারব না? আমরা কেন অন্যায় অনিয়মে থাকব? ডাকসু নির্বাচনে ভোট চুরি, মারামারি, লাঠিপেটা এসব কেন আমরা করব? যারা মারামারি করেছে, তারা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়? যদি তা-ই হয়, তাহলে দেশের অন্য শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা পড়াশোনা করে, তারাও উচ্চমানের মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য দেখে এসব শিক্ষার্থীর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা যেন একনিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায়। এটা শুধু আমার কথা নয়, দেশের মানুষের কথা। তাই পরিশেষে বলতে চাই— ছাত্ররাজনীতি বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে সচেতন হতে হবে বড়দের। ছাত্ররাজনীতি মানে মারামারি নয়, শিক্ষা অর্জন— এটা যতদিন প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির সুনাম বাড়বে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক





