আখাউড়া পৌর শহরের তারাগন এলাকার কৃষক মো. আলম খাঁ। তিনি একজন বর্গা চাষি। চলতি আমন মৌসুমে তিনি ১০ বিঘা জমি আবাদ করেন। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে ধান কাটা। হঠাৎ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান কাটা নিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন। এলাকায় ধান কাটার শ্রমিক সংকট থাকায় হারভেস্টার মেশিনের উপর নির্ভর করে জমির পাকা ধান কাটছেন। তবে ওই মেশিন কৃষকদের স্বস্তির কারণ হলেও ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বিঘা প্রতি প্রায় ৪ থেকে ৫শ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান কাটা নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েন। যেখানে এক বিঘা জমি ১৫শ টাকায় ধান কাটা যেতো এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে ২হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। এপযর্ন্ত ৫ বিঘা জমির ধান তার কাটা হয়েছে। অর্থ সংকটের কারণে বাকী জমির ধান কাটা হয়নি। কী ভাবে কাটবেন এ চিন্তায় তিনি দিশেহরা হয়ে আছেন।
তিনি আরও বলেন, আমন ধান ঘরে তুলার পর শুরু হবে বোরো ধান আবাদ। জমিতে হাল চাষ ও আবাদ করতে অতিরিক্ত টাকা লাগার কারণে ধান চাষে লোকসান গুণতে হবে ।
ডিজেলসহ কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় কৃষকরা উঠতি আমন ধান কাটা ও চলতি মৌসুমের বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কায় পড়ছেন। এ অবস্থার ফলে অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিতে এক চরম এক অস্থিরতা বিরাজ করায় স্থানীয় কৃষকরা যেন দুচোখে অন্ধকার দেখছেন।
এদিকে স্থানীয় একাধিক কৃষক জানায়, এ মৌসুমে আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। শ্রমিক সংকট থাকায় কৃষকদের ভরসা হয়ে উঠছে হারভেস্টার মেশিন। কিন্তু ডিজেলের দাম দৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে দিতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা। যা অন্য সময়ের চাইতে ৫০০ টাকা বেশী।
তারা আরও জানায়, আমন কাটা শেষ হওয়ার পরই শুরু হবে জমিতে ইরি বোরো ধান আবাদ। কিন্তু ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বোরো ধান আবাদে এর প্রভাব পড়বে বলে জানায়। জমিতে হাল দেওয়া, সেচ পানি, তেল, সার, মজুরি, কিটনাশক,জমি নিরানি, ধান কাটা পযর্ন্ত বিঘা প্রতি কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হবে। যেখানে এক বিঘা জমি চাষ করতে তাদের খরচ হতো ৭-৮ হাজার টাকা এখন তা দাঁড়াবে ১১-১২ হাজার টাকার উপর। অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে কৃষকরা লোকশানের মুখে পড়বেন বলে জানায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেকেই ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন ।
এছাড়া যাদের জমি কম, বর্গাচাষি ও আয়ের বিকল্প নেই কেবল তারাই হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কৃষি কাজে জড়িত রয়েছেন বলে তারা জানায়। দ্রুত ডিজেলের মূল্য কমানো না হলে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, পৌর শহরসহ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে এ মৌসূমে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়। বেশীরভাগ জমির পাকা ধান মেশিনের মাধ্যমে কাটা হয়। তাছাড়া ইরি বোরো ধান আবাদে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি বোরো ধানের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে দফায় দফায় ডিজেল, সার, সেচ পানি, মজুরি, কিটনাশকসহ কৃষি উপকরনের মূল্যবৃদ্ধিতে উপজেলার ক্ষুদ্র , প্রান্তিক ও মাঝারি চাষিরা জমি আবাদ নিয়ে অনেকটাই বিপাকে রয়েছেন ।
উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের সাতপাড়া গ্রামের কৃষক তামজিদ খান বলেন এ মৌসুমে তিনি প্রায় ৬০ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেন। এখন চলছে ধান কাটা। শ্রমিক সংকট থাকায় হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে তার ধান কাটা হয়। গত দুই বছর ধরে প্রতি বিঘা জমি ১৪-১৫শ টাকায় ধান কাটা হয়। কিন্তু এবার হঠাৎ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে ধান কাটা বিঘা প্রতি ৪শ থেকে ৫শ টাকা বেড়ে যায়। এতে করে তার এ মৌসুমে ধান আবাদে তার অনেক লোকসান গুণতে হবে বলে জানায়।
তাছাড়া চলতি মৌসুমে ইরি বোরো আবাদ নিয়েও শঙ্কায় আছেন স্থানীয় কৃষকরা। কারণ ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে হাল চাষ, আবাদ, সার, সেচ পানি , ইঞ্জিন চালিত বিভিন্ন যন্ত্রে ধান কাটার খরচ কয়েকগুন বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন।
কৃষক মো. রমজান মিয়া বলেন, এ মৌসুমে তিনি ১৫ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছে। ধানও ভালো হয়েছে। চলছে ধান কাটা। যেখান হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ১৫শ টাকা বিঘায় জমির ধান কাটা হতো এখন দিতে হচ্ছে ২হাজার টাকা।
তাছাড়া জমিতে হাল দিতে যেখানে ২শ থেকে আড়াইশ টাকা লাগতো এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫শ টাকায় হয়েছে। তিনি আরও বলে বোরো আবাদে সেচ পানিসহ সব কিছুতেই অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ধান চাষ করা ছেড়ে দিতে হবে।
কৃষক মো. আবুল কালাম বলেন এক সময় জমিতে গরু লাঙ্গল দিয়ে হাল চাষ করা হতো। এখন তা যেন অনেকটাই উঠে গেছে। আধুনিক এই যুগে জমি চাষ দিতে ট্রাক্টর, পাওয়ার ট্রিলার ব্যবহার করা হয়। যন্ত্রনির্ভর চাষে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে জমি চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বলে জানায়। তিনি আরও বলেন টাকার অভাবে ১০ বিঘা জমির মধ্যে এখন পযর্ন্ত অর্ধেক ধান তিনি কাটতে পারছেন না বলে জানায়।
মো: লোকমান হোসেন জানান, ১৫ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়। ধার দেনা করে জমির ধান কাটা হয়েছে। গত বছরের চাইতে এবার বিঘা প্রতি ৪-৫শ টাকা বেশী দিতে হয়েছে। যে ভাবে কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ধান চাষ লোকসান গুণতে হবে।
কৃষক আবু তাহের বলেন, এক বিঘা জমি হাল দিতে খরচ ছিল ৩’শত টাকা। এখন দিতে হচ্ছে প্রায় ৫’শত টাকা। তাছাড়া হারভেস্টারে এক বিঘা জমির ধান কাটতে দেড় হাজার টাকার জায়গায় প্রায় দুই হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। কৃষি নির্ভর সব জিনিসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি মৌসুমের বোরো ধান আবাদ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
একটি সূত্রে জানা গেছে এ উপজেলায় ২৩টি বৈদ্যুতিক সেচপাম্প দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। তাছাড়া অনেক এলাকায় বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে স্যালো ইঞ্জিন দিয়ে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকদের অতিরিক্ত টাকা গুণতে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম বলেন, বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী উদ্যোগের কারণে কৃষি যেমন যান্ত্রীকরণ হচ্ছে পাশাপাশি তার সুবিধা পাচ্ছেন কৃষকরা। চাষে এখন ফলন বৃদ্ধি হওয়ায় কৃষকদের অনেক লাভ হয়। সরকারি ভূর্তুকিতে যাদেরকে কমভাইন্ড হারভেস্টার দেওয়া হয়েছে তাদের সাথে আলোচনা করে ধান কাটা মাড়াইয়ে মূল্যে নির্ধারণ করা হলে কৃষকদের ভালো হবে বলে জানায়।





