ধর্ম

তাওবা মুমিনের জন্য বিশেষ অনুগ্রহ

  • প্রকাশিত ১৩ মার্চ, ২০২১

মোহাম্মদ শরীফ

 

 

 

মহান আল্লাহতায়ালা বান্দার প্রতি মহাদয়াবান। আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ ও দয়ালাভের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে তাওবা। গুনাহমুক্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনলাভের জন্য তাওবার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তাওবা শব্দের অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা। শরিয়তের পরিভাষায় তাওবা বলা হয় বান্দার কৃত অন্যায় অপরাধের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া। সে অন্যায় সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা। ভবিষ্যতে এমন অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা। এমন প্রতিজ্ঞার নাম হচ্ছে তাওবা। আল্লাহতায়ালার দরবারে বান্দার তাওবা অধিক পছন্দনীয়। কোনো মানুষ অপরাধ করার পর যখন লজ্জিত হয়ে আল্লাহতায়ালার কাছে আন্তরিকতার সাথে তাওবা করে এবং তার দ্বারা কৃত সংঘটিত পাপ কাজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহর কাছে আকুতি মিনতি করে, এমন গুনাহগার বান্দাকে আল্লাহ অধিক পছন্দ করেন এবং তার তাওবা কবুল করেন। বান্দাকে স্বীয় অপরাধ থেকে পবিত্র করেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ ! তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তাওবা কর। নিশ্চয়ই তোমরা সফলকাম হবে। (সূরা নূর) যারা প্রতিনিয়ত আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করে গুনাহের কাজে লিপ্ত রয়েছে। কখনো কৃত অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত হয় না এবং তাওবা করে না। তাদেরকে আল্লাহতায়ালা জালিম আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-‘যারা তাওবা করে না তারাই অত্যাচারী।’

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মহান প্রভু থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পুণ্য ও পাপসমূহ লিখে দিয়েছেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ তার ব্যাখ্যাও করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি কোনো নেকী করার সংকল্প করে কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত করতে পারে না। আল্লাহতায়ালা তার জন্য কেবল নিয়তের বিনিময়ে একটি পূর্ণ নেকি লিখে দেন। আর যদি সে সংকল্প করার পর কাজটি বাস্তবায়ন করে ফেলে, তাহলে তার বিনিময়ে দশ থেকে সাতশতগুণ, বরং তার চেয়েও অনেকগুণ বেশি নেকি লিখে দেন। পক্ষান্তরে যদি সে একটি পাপ করার সংকল্প করে কিন্তু সে তা কর্মে বাস্তবায়িত না করে, তাহলে আল্লাহতায়ালা তাঁর নিকট একটি পরিপূর্ণ নেকি লিখে দেন! আর যদি সে সংকল্প করার পর ওই পাপ কাজ করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ মাত্র একটি পাপ লিপিবদ্ধ করেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা স্বীয়  বান্দার তাওবায় ওই ব্যক্তির চেয়েও অধিক খুশি হন, যে ব্যক্তি তার বাহন সাওয়ারি নিয়ে কোনো জনমানব শূন্য প্রান্তরে অবস্থান করেছিল, হঠাৎ তার সাওয়ারিটি পালিয়ে গেল। সাওয়ারিটির সাথে ছিল তার খাদ্য ও পানীয় বস্তু। লোকটি সাওয়ারিটি খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে তার ব্যাপারে হতাশ হয়ে একটি গাছের নিকট এসে ছায়াতলে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠে সে দেখে তার হারিয়ে যাওয়া সাওয়ারিটি  তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে অধিক খুশি হয়ে তার সাওয়ারির লাগাম চেপে ধরে বলল, ‘হে আল্লাহ  তুমি আমার বান্দা আমি তোমার রব! লোকটি অধিক খুশিতে উল্টাপাল্টা বলে ফেলল।’

প্রিয় মুসলিম উম্মাহ! রোজ হাশরে আল্লাহ আমাদের হিসাব নেওয়ার পূর্বে আমরা নিজেদের আমলের ব্যাপারে হিসাব করে নেওয়া উচিত। দিন শেষে বিছানায় যাওয়ার পূর্বে সারাদিনের কৃতকর্মের মুহাসাবা করা জরুরি। আজ নামাজ সঠিকভাবে আদায় করেছি কিনা? আজ আকিদা পরিপন্থি কোনো কাজ করেছি কিনা? ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে আদায় করেছি কিনা? আজ কোন কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়েছি কিনা? যদি কোনো একটি অন্যায় কাজ আমার দ্বারা হয়ে থাকে তাহলে দৃঢ় সংকল্প করা যে, আমি আর কখনো এমন কাজ করব না। রাব্বে কারীমের দরবারে তাওবা করে ঘুমানো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকট তাওবা করতে থাকো। কেননা আমি দৈনিক একশতবার তাওবা করি। অন্য হাদিসে এসেছে হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর কসম! আমি প্রত্যহ সত্তরের অধিক আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবা করি।’ (সহিহ বুখারি)

প্রত্যেক পাপ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। যদি কৃত গুনাহের সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে থাকে তাহলে এধরনের তাওবা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। এক. গুনাহের কাজ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা। দুই. পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়া। তিন. ওই পাপ কাজ আগামীতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা। এই তিনটি শর্ত পাওয়া না গেলে তাওবা বিশুদ্ধ হবে না। পক্ষান্তরে পাপ যদি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে উপরিউল্লিখিত তিন শর্তের সাথে আরেকটি শর্ত যোগ হবে। তা হচ্ছে বান্দার হক নষ্ট বা আত্মসাত করে থাকলে সেই হক ফিরিয়ে দিতে হবে। কারো উপর মিথ্যা অপবাদ দিলে বা অনুরূপ কোনো দোষ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে। তবেই তার তাওবা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে। তাওবা-ইস্তেগফার মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। তাই আমাদের এ নিয়ামতের ব্যাপারে উদাসীন থাকা মোটেও উচিত হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা নিজ হাত রাতে প্রসারিত করেন। যেন দিনের গোনাহগার (রাতে) তাওবা করে। আর দিনে আল্লাহর হাত প্রসারিত করেন, যেন রাতের গোনাহগার (দিনে) তাওবা করে। যে পর্যন্ত পশ্চিম দিগন্তে সূর্যোদয় না হবে, সে পর্যন্ত এই রীতি চালু থাকবে। (সহিহ মুসলিম)

 

লেখক : শিক্ষার্থী, আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মেখল মাদরাসা, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads