কাজী ফিরোজ রশিদ
উন্নত জাতি গঠনে জাতির স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের তরুণ দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। আমরা সবাই জানি, তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আর স্বাস্থ্যরক্ষায় তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বর্জনের বিকল্প নেই। কিন্তু ই-সিগারেট আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের কারণে তরুণ প্রজন্মের এর শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি, যা জাতির জন্য সমূহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হিট-নট-বার্ন বা ই-সিগারেট যে নামেই অবহিত করা হোক না কেন, এ ধরনের পণ্যকে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইউএস সার্জন জেনারেল রিপোর্ট অনুযায়ী, ই-সিগারেট ব্যবহারে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে। ই-সিগারেটে যে উপাদানগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন সেল বিকল করাসহ ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। ই-সিগারেটের তরল মিশ্রণের (ই-লিকুইড) মধ্যে থাকে প্রোপেলিন গ্লাইসল, গ্লিসারিন, পলিইথিলিন গ্লাইসল, নানাবিধ ফ্লেভার ও নিকোটিন। এই রাসায়নিকগুলো গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়ার সমপরিমাণ ফরমালডিহাইড উৎপন্ন হয়, যা মানব শরীরের রক্ত সঞ্চালনকে অসম্ভব ক্ষতি করে। ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় জানা যায়, ই-সিগারেট ক্ষতিকর। তরুণেরা এটি ফ্যাশনের জন্য ব্যবহার করলেও এ থেকে অধূমপায়ী ব্যক্তিদের ধূমপানের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।
প্রত্যক্ষ ধূমপানের ফলে পরোক্ষভাবে ধূমপানের স্বাস্থ্য ক্ষতির শিকার হয় বহু মানুষ। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সারা বিশ্ব বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, তামাককে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাধিক গবেষণা পর্যালোচনা করে ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের কোভিড-১৯ সংক্রমণে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ই-সিগারেট ব্যবহারকারীরাও এর বাইরে নয়।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ই-সিগারেট। বিশ্বের অনেক দেশে ই-সিগারেটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এর ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছে এবং ইতোমধ্যে ৪২ দেশ ই-সিগারেটকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে এবং আরো ৫৬ দেশ ই-সিগারেট ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ০.২ শতাংশ মানুষ ই-সিগারেট ব্যবহার করে, যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমাদের নতুন প্রজন্ম রক্ষার স্বার্থে এ মুহূর্তে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে ই-সিগারেট/হিটেড টোব্যাকো/ভ্যাপিং টোব্যাকো বা এ ধরনের পণ্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট আইন নেই। যেহেতু বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক সিগারেট এবং এর সাথে সম্পর্কিত সমস্ত উপাদান আমদানির ওপর নির্ভর করে এবং এখন পর্যন্ত এটি তৈরি বা উৎপন্ন শুরু হয়নি। তাই এটি এদেশে নিষিদ্ধ করা সহজ হবে এবং এখনই নিষিদ্ধ করার উপযুক্ত সময়। সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র উদাহরণ— ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্ন দেখেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করবেন।’ কিন্তু তার এই স্বপ্ন বা ঘোষণা বাস্তবায়নের পথে বাধা হতে বৃদ্ধি পাচ্ছে ই-সিগারেট বা এ ধরনের পণ্যের ব্যবহার। তাই সংসদ সদস্য হিসেবে আমি এই বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং তামাকের এই করাল গ্রাস থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ই-সিগারেট বা এ ধরনের পণ্য নিষিদ্ধ করা একান্ত প্রয়োজন।
আমাদের একটু সতর্কতা এবং সঠিক পদক্ষেপ তামাকের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করবে দেশের অমূল্য সম্পদ— আমাদের তরুণ সমাজকে।
লেখক : রাজনীতিক এবং সংসদ সদস্য, ঢাকা-৬





