জেলার ৫ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২৮ হাজার কৃষককে প্রণোদনার আওতায় এনেছে সরকার। এদিকে গত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তিস্তার বালুচরে ফসল ফলিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তিস্তার জেগে উঠা চরে বালু সরিয়ে নতুন করে ফসল বুনতে শুরু করেছে কৃষকরা।
প্রতিবছর বন্যা, নদীভাঙ্গন ও খরার সঙ্গে যুদ্ধ করে আসছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। এ বছরের গত ২০ অক্টোবরের আকস্মিক বন্যায় কোথাও উঠতি ফসলে বালুচাপা আবার কোথাও নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে আবাদি জমিসহ ফসল। এদিকে পৌষের শুরুতেই শুকিয়ে গেছে প্রমত্তা তিস্তা নদী। মরা তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর। আর সেই বালু উপরিভাগের বালু সরিয়ে সবুজ ফসল বুনতে শুরু করেছেন কৃষকেরা। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত সময় পাড় করছেন তারা। তিস্তার বুক চিরে উঁকি দিচ্ছে সবুজ সফল।
সরেজমিন লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ও আদিতমারি উপজেলার চর গোবর্ধন, বালাপাড়া, কুটিরপাড়, কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা, চর বৈরাতী, ভোটমারী, শৈইলমারী ও পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম তিস্তার চরসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেখা গেছে, তিস্তার আকস্মিক বন্যার পর পানি নামার ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠেছে। আশপাশে এখনো পড়ে আছে বিধ্বস্ত বাড়িঘর। তিস্তার বালুতে চাপা পড়ে আছে কৃষকের ফসলি খেত। কৃষকরা কাঁচি ও কোদাল দিয়ে সেই বালু সরানোর চেষ্টা করছেন। পানি সরে যাওয়ার পর বালি সরিয়ে চাষ করে নতুন করে ফসল বুনতে শুরু করছে কৃষকরা। শীতকালীন সবজির খেতসহ মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, পিয়াজ, আলুসহ নতুন ফসল রোপণ করছেন কিষান-কিষানিরা। এর মধ্যে তিস্তার চরে গজাতে শুরু করেছে ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল।
জানা গেছে, গত ২০ অক্টোবর উজানের ঢলে তিস্তা অববাহিকায় বিপৎসীমার সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙে ৬০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল। পানির স্রোতে তিস্তা-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা। এতে ধান, ভুট্টা, আলু, পিয়াজ, মরিচ ও চিনা বাদাম, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বন্যায় জেলার ৫উপজেলায় ২হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমির রোপা আমন, একশত হেক্টর জমির ভুট্টা, ৯০হেক্টর জমির কাঁচামরিচ, আলু, পিয়াজ, এবং একশত হেক্টর জমির চিনা বাদাম, কুমড়া, ডাল ক্ষেত পানিতে ডুবে যায়। এতে মোট ২০৪৫ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়।
সবজি ক্ষেতে পরিচর্যায় ব্যস্ত তিস্তা পাড়ের কৃষানী রহিমা বেওয়া জানান, ‘ বন্যা আর খড়ায় আমাদের কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে দেয় না। গেল বন্যায় সব ভেসে গেছে, এখন নতুন করে চরের মধ্যে আলু, পিয়াস, কুমড়া, ভুট্টা লাগিয়েছি। আলু তোলার পর বাদাম লাগামো’।
কালীগঞ্জ উপজেলার চর বৈরাতী, ভোটমারী, শৈইলমারী, কৃষকরা বলছেন, অসময়ে তিস্তার আকস্মিক বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেশী। তাদের ধান, আলু, সবজি, বাদামসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দেনায় পড়েছেন অনেক পরিবার। তার পরেও আবার নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। বালুচর এখন তাদের জন্য আশীর্বাদ। এই চরের বালু মাটিতেই ফলবে সোনার ফসল।
আদিতমারি উপজেলার তিস্তা চর গোবর্ধন এলাকার কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, গেল বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। ভুট্টা চাষ করার জন্য ৭বিঘা জমি তৈরি করছি। জমিতে বালু পড়েছে হাটু পর্যন্ত। বালু সরিয়ে জমি তৈরি করতে হচ্ছে। একই এলাকার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, আবাদি জমি সব পানিতে ডুবে গেছে। পানিতে পঁচে গেছে আলু, শাকসবজি, কুমড়ার ক্ষেত। কৃষি অফিস থেকে নাম লেখে নিয়ে গেছে।
জেলা কৃষি বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার চরাঞ্চলে ফসলের আবাদ ভালো হয়েছিল। আকস্মিক বন্যায় জেলার ৩০হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মোট ২০৪৫ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। জেলার ৫ উপজেলার মোট ২৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষককে প্রণোদনার আওতায় এনেছে সরকার। এর মধ্যে রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত তিস্তাবেষ্টিত জেলার ৫উপজেলার প্রায় ১৬ হাজার কৃষক প্রণোদনা পাবে। এছাড়াও কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন ফসলের সার ও বীজ সহায়তাও দেবে সরকার।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ বলেন, রবি মৌসুমে মোট ছয়টি ফসলের যে কোনো একটির জন্য ২৮হাজার কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে শুরুতে বন্যায় অতি ক্ষতিগ্রস্ত ৫উপজেলার প্রায় ১৬হাজার কৃষক এই প্রণোদনার আওতায় আসবে। এসব কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন ফসলের সার ও বীজ সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া তাদের কৃষি অধিদফতর থেকে নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।





