থমকে গেছে টিপু হত্যার তদন্ত

জাহিদুল ইসলাম টিপু

ফাইল ছবি

সারা দেশ

থমকে গেছে টিপু হত্যার তদন্ত

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ১০ মে, ২০২২

মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত থমকে গেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মুসা বিদেশে আত্মগোপন করেছেন। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হবে বলে মনে করছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এছাড়া খুনের প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা যায়নি। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ধীরগতি চলে এসেছে বলেও অভিযোগ করেন টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি।

গত ২৪ মার্চ রাত সোয়া ১০টার দিকে মতিঝিল এজিবি কলোনি থেকে বাসায় যাওয়ার পথে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে মাইক্রোবাসে গুলি করলে টিপু (৫৪) ও রিকশাযাত্রী সামিয়া আফনান প্রীতি (২০) নিহত হন। এ ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয় শুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশ। ডিবি তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী যুবলীগ নেতা এরফান উল্লাহ দামালকে গ্রেপ্তার করে। খুনের এক সপ্তাহ পর র্যাব এ ঘটনায় মতিঝিলের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক (৫২), আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ (৩৮), নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির (৩৮) এবং মোরশেদুল আলম ওরফে কাইলা পলাশকেও (৫১) গ্রেপ্তার করেছে।

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এ হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মুসা। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যায় কারা জড়িত তার একটা তালিকা পাওয়া যেত। এ হত্যায় প্রধান মদদদাতাও শনাক্ত করা যাবে মুসার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে। কারণ এই হত্যাটি সংগঠিত হয়েছে একাধিক কারণ থেকে। এখানে আন্ডারওয়ার্ল্ড ও আন্ডারগ্রাউন্ড দুই স্তরের একাধিক ঘটনা জড়িত।

সূত্র জানায়, ঘটনার তিন থেকে চার মাস আগে টিপু হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এই হত্যাকা্লের মূল পরিকল্পনাকারী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ-প্রকাশের অন্যতম শুটার ও বোচা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সুমন শিকদার মুসার সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করে ওমর ফারুক। মুছা এক সময় বিকাশ-প্রকাশ গ্রুপে কাজ করলেও বর্তমানে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হয়ে কাজ করেন। এজন্য মুসা গত ১২ মার্চ দুবাইয়ে জিসানের কাছে চলে যান। এর জন্য যে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়, তার বেশির ভাগের জোগান দেন ওমর ফারুক।

জানা গেছে, পুরনো দুটি হত্যাকাণ্ডসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই টিপুকে হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে গুলশান-১ নম্বরে শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকীকে (৪৩) সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় মিল্কীর ছোট ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় জাহিদুল ইসলাম টিপু আসামি ছিলেন। র্যাবের হাতে টিপু গ্রেপ্তার হয়ে কয়েক মাস জেলেও ছিলেন। পরবর্তীতে র্যাবের দেওয়া চার্জশিটে টিপুর নাম বাদ দেওয়া হয়। মিল্কী হত্যার পর টিপুর সঙ্গে যুবলীগের ল্যাংড়া খালেদের প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

২০১৬ সালে রিজভী হাসান ওরফে বোচা বাবুকে হত্যার শিকার হয়। বাবুর বাবা আবুল কালাম টিপুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাবু হত্যা মামলায় পুলিশের দেওয়া চার্জশিটে টিপু হত্যায় র্যাবের গ্রেপ্তার হওয়া ওমর ফারুক, আবু সালেহ শিকদার ও নাসির উদ্দিনের নাম রয়েছে। সেই মামলাটি বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ের অপেক্ষায় আছে। সে মামলায় অভিযোগপত্রে থাকা ব্যক্তিরা মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্যা পলাশকে সুরতহাল সাক্ষী বানায় মামলার গতিপথ পালটানোর জন্য। বোচা বাবু হত্যাকাণ্ডের মামলার যাবতীয় খরচসহ সবকিছু দেখভাল করছিল জাহিদুল ইসলাম টিপু। আসামিরা ৫০ লাখ টাকা দিয়ে মামলার দফা-রফার জন্য টিপুকে প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু টিপু রাজি হননি।

আসামিদের আশঙ্কা ছিল, এ মামলায় তাদের কারও ফাঁসি হবে। তাই মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে প্রথমে মামলার বাদী আবুল কালামকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে আসামিরা ভেবে দেখলেন, বাদীর পরিবর্তে টিপুকে হত্যা করলে মামলার কার্যক্রম ব্যাহত করা যাবে। মূলত রিজভী হাসান ওরফে বোচা বাবু হত্যা মামলার রায় দীর্ঘায়িত করতেই টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে কিলার মুসা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার রিফাত বিন শামীম বলেন, টিপু হত্যাকাণ্ডে প্রধান শুটার আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া এই হত্যার সঙ্গে জড়িত মোল্লা শামীমসহ আরো বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করার কাজ চলছে।

হত্যায় একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, হত্যায় ব্যবহূত আগ্নেয়াস্ত্র থেকে উদ্ধার করা গুলির খোসার ফরেনসিক রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যেত যে এ হত্যায় একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি না। হত্যায় ব্যবহূত আগ্নেয়াস্ত্র আমরা উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।

এদিকে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস হতে চললেও কিলিং মিশনে অর্থ সরবরাহকারী, মূল পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতারা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশ নিহত টিপুর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম ডলি। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমার স্বামী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতাদের কেউ ধরা পড়েনি। কারা কেন আমার স্বামীকে হত্যা করল, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। অন্যথায় এই অপরাধীরা এই ধরনের জঘন্য অপরাধ করেই যাবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেছেন, টিপু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ হওয়ায় তারা সবাই আত্মগোপনে চলে গেছে। তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া অনেক ব্যক্তিকে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। অস্ত্র ও মোটরসাইকেল সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা সহজ হবে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, টিপু হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী ছিলেন সুমন শিকদার ওরফে মুসা। যিনি দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বাকি সব আসামি এখনো দেশেই আছে।

রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠভাজনরা জানান, মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু ২০১৯ সাল থেকে ওই এলাকায় রাজনৈতিক জনসংযোগ বাড়িয়ে দেন। এতে তার জনপ্রিয়তাও বাড়ছিল। আওয়ামী লীগের পরবর্তী কমিটিতে মতিঝিল থানার সভাপতি পদে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তিনি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads