অপরাধ

থামছে না রেলের দুর্নীতি

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

দুর্নীতিমুক্ত সেবা খাত বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ নিলেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না রেলের দুর্নীতি। কেনাকাটা, টেন্ডার, নিয়োগ-সর্বত্রই লুটপাটে বেহাল দশা বাংলাদেশ রেলওয়ের। এবার ইঞ্জিন মেরামতের যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দামে। আর ২০ হাজার টাকার সালফিউরিক এসিডের ক্রয় মূল্য দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। আর রাষ্ট্রীয় অর্থ নয়ছয় করার অপরাধে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে রেলওয়ে অডিটর অধিদপ্তর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নানা অনিয়মের তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়েও তারা থাকছেন বহাল তবিয়তে। আবার দুর্নীতির মামলায় জেল খেটেও আবার আসীন হয়েছেন রেলের স্বপদে, এমন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। সঠিক বিচার না হওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকে নথি গায়েব করার মতো দুঃসাস দেখিয়েছেন কেউ। তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের অপরাধে মাঝে-মধ্যে দুয়েকজনের হালকা-পাতলা শাস্তি হলেও এটাকে আইওয়াশ হিসেবেই দেখছেন বিশিষ্টজনরা। অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় অনিয়ম বন্ধের সকল প্রচেষ্টাই যেন ভেস্তে যাচ্ছে। তবে দোষীদের ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারিকে গতানুগতিকও বলছেন তারা। 

দেশের গণপরিবহন মাধ্যমগুলোর মধ্যে রেলওয়ে সরকারের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রীয় পরিবহন খাত। দেশে প্রথম রেলওয়ের সূচনা হয় ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালের পূর্বে অবিভক্ত ভারতবর্ষে রেলওয়ে বোর্ডের মাধ্যমে তৎকালীন রেলওয়ে পরিচালিত হতো। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেনি রেল খাত। সংস্থাটিকে লাভ জনক সেবা খাত হিসাবে তৈরি করতে সরকার ১৯৭৩ সালে বোর্ডের কার্যক্রম বিলুপ্ত করে একে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে রেলপথ বিভাগ গঠন করা হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটি (বিআরএ) গঠন করা হয়। তবে গঠিত বিআরএর কার্যক্রম পরবর্তীতে অব্যাহত থাকেনি। ১৯৯৬-২০০৩ সময়কালে এডিবি এর অর্থায়নে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও রেলপথ বিভাগ হতে বাংলাদেশ রেলওয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। গণমানুষের চাহিদা ও রেলওয়ের উন্নয়নের দাবিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল সরকার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতায় রেলপথ বিভাগ নামে নতুন বিভাগ সৃষ্টি করে। ওই বছর ৪ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা রেলওয়ে মন্ত্রণালয় করা হলেও এতে বিশেষ কোনো লাভ হয়নি। লাগামহীন চুরি ও দুর্নীতি ছাড়াও নানা ধরনের অব্যবস্থাপনায় নিমজ্জিত রেলওয়ে।

অনিয়ম দুর্নীতি প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নিয়েও এবার রাজধানীর কমলাপুর ওয়ার্কশপে ইঞ্জিন মেরামতের যন্ত্রাংশ কেনায় বড় ধরনের লুটপাট হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত রেলের অডিট বলছে, ২০২১ সালে কমলাপুর ওয়ার্কশপের ডিজেল বিভাগের কর্ম ব্যবস্থাপক রাশেদুল ইসলাম ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ কিনেছেন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে। অডিটের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, রেলের জন্য ক্রয়কৃত গ্যাজব্রেক সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ২ হাজার ৮৬০ টাকা কিন্তু রেলওয়ে সেটির দাম ধরেছে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা, গ্যাজ ভ্যাকুয়ামের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ১ হাজার ৮২০ টাকা কিন্তু রেলওয়ে সেটির দাম দেখিয়েছে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা। এ ছাড়া একটি সানবার রিংয়ের সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ৫৮৫ টাকা কিন্তু রেলওয়ে সেটির জন্য খরচ দেখিয়েছে দুই হাজার ৬৮৫ টাকা। অন্যদিকে, একটি সানবার স্প্রিংয়ের দাম মাত্র ৪৫ টাকা অথচ রেলওয়ে এটি কিনতে খরচ দেখিয়েছে ৯১৮ টাকা। এভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র দেড় লাখ টাকা মূল্যের মালামাল কিনতে দাম দেখানো হয়েছে ১২ লাখ টাকা।

দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রাশেদুল ইসলাম এখন কর্ম ব্যবস্থাপক প্রকল্প হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন রেল ভবনে। অনিয়মের বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে মন্তব্য করতে কোনোভাবেই রাজি হননি তিনি। বরং ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বরে রাশেদুল ইসলাম বলেন, আপনি আমার ঊর্ধ্বতনকে বলেন। অতিরিক্ত খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আপনার সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারব। এটাই আমার বক্তব্য।

এদিকে রেলের লোকমোটিভের ব্যাটারি সচল রাখতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রচুর সালফিউরিক এসিডের প্রয়োজন হয়। গত দুই বছরে ৮০০ লিটার সালফিউরিক এসিড কেনার দাবি করেছে রেলের ঢাকা বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী রেজাউল করিম। প্রতি লিটার সালফিউরিক এসিড কেনা হয়েছে ১৯৯৭ টাকা দরে। বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় সালিউরিক এসিডের কেজি মাত্র ২০-২৫ টাকা। অর্থাৎ বাজার দরের চেয়ে প্রায় ৮০০ গুণ বেশি দামে এসিড কিনেছে রেল।

অন্যদিকে এসিড ক্রয়ে গত অর্থ বছরে বাজারদরের চেয়ে ৮০০ গুণ বেশি দাম দেখানো হয়েছে। ২০ হাজার টাকার সালফিউরিক এসিড কিনে রেল কর্তৃপক্ষ দাম দেখিয়েছে ১৬ লাখ টাকা। রেলের লোকমোটিভের ব্যাটারি সচল রাখতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য প্রচুর সালফিউরিক এসিডের প্রয়োজন হয়। তাই প্রতি বছরই অতি প্রয়োজনীয় এই রাসায়নিকটি কেনে কমলাপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপ। গত দুই বছরে ৮০০ লিটার সালফিউরিক এসিড কিনেছেন রেলের ঢাকা বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী রেজাউল করিম।

সদ্য সমাপ্ত রেলের অডিট বলছে, প্রতি লিটার সালফিউরিক এসিড কেনা হয়েছে ১ হাজার ৯৯৭ টাকা দরে। বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় সালিউরিক এসিডের কেজি মাত্র ২০-২৫ টাকা। অর্থাৎ বাজার দরের চেয়ে প্রায় ৮০০ গুণ বেশি দামে এসিড কিনেছে রেল।

এ বিষয়ে একজন এসিড বিক্রেতা বলেন, দাম হয়তো একটু ওঠানামা করে। তবে সেটি খুব বেশি বাড়লেও বর্তমান বাজার দরের চেয়ে ১৭-১৮ টাকা বাড়তে পারে। এত বেশি হওয়ার কথা নয়। অপর এক বিক্রেতা জানান, বর্তমানে সবচেয়ে ভালো সালফিউরিক এসিড প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজি।

কেনাকাটায় অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত এই রেজাউল করিম এখন যান্ত্রিক বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে রেল ভবনে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ব্যাপারে কথা বলতে কিছুতেই রাজি হননি তিনি। ২৫ টাকার এসিড কীভাবে দুই হাজার টাকা কেজিতে কিনলেন এমন প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম বলেন, অডিট অনেক সময় অনেক কিছুই বলে। এসবের জবাব অফিশিয়ালি দেওয়া হয়। তাই আমি এখানে কিছু বলব না।

একই রকম অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে ইঞ্জিন মেরামতের ক্ষেত্রেও। ইঞ্জিন মেরামতের যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি দামে।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলপথ দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয় মাধ্যম। কোনো অবস্থাতেই রেলওয়েতে দুর্নীতি অনিয়ম সহ্য করা হবে না। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads