রহমত আলী খন্দকার:
প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে নতুন করে চালু হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর সাড়ে ৪ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। শ্রমিক পাঠানো প্রক্রিয়ায় ফের সিন্ডিকেটের থাবা বসে। কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, দেশটিতে গিয়ে কর্মীদের চাকরি না পাওয়া ও শ্রম শোষণের অভিযোগ করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। এ কারণে আবারও শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। তবে অনুমোদিরু কর্মীদের দেশটিতে যেতে ৩১ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। সে হিসেবে গতকাল ছিল মালয়েশিয়া প্রবেশের শেষ দিন। শেষ দিনেও সিন্ডিকেটের থাবা থেকে রক্ষা পায়নি শ্রমিকরা। বিমানের টিকিট নিয়ে তৈরি হয় ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট। ২৫ হাজার টাকার বিমান টিকিটের দাম উঠে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত যারা মালয়েশিয়া পৌঁছাতে পেরেছে তাদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে কুয়ালালামপুরের বিমানবন্দরে।
গতকাল শুক্রবার শেষ দিনে মালয়েশিয়া প্রবেশের জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ। যাদের অধিকাংশের ভিসা ও পাসপোর্ট হয়েছে। কিন্তু টিকিটের অভাবে যেতে পারেননি প্রায় ৩১ হাজার শ্রমিক। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, গতকাল শেষ দিনে মাত্র ১ হাজার ৫০০ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পেরেছেন। ৯টি নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুরগামী ২৭১ জন কর্মীর জন্য বিশেষ একটি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। এতে অনুমোদনকৃত ৩১ হাজার ৭০১ জন কর্মীরই যাত্রা বাতিল হয়ে যায়।
ডেডলাইনের সুযোগ নিয়ে একটি সিন্ডিকেট চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা মালয়েশিয়া রুটের টিকিট বিক্রি করছে কয়েকগুণ বেশি দামে। ২৫-৩০ হাজার টাকার টিকিটের দাম ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই নিয়ে কয়েক হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। জানা গেছে, কর্মীদের সুবিধার্থে চারটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করছে বাংলাদেশ বিমান। মালয়েশিয়া থেকে ফেরার সময় খালি ফ্লাইট আসবে বলে বাড়তি দাম ধরা হয়েছে। বিশেষ ফ্লাইটের টিকিট ৬৮ হাজার থেকে শুরু করেছে বিমান। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এটি অনলাইন থেকেও কেনার সুযোগ রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া আরও চারটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য গত রোববার মালয়েশিয়াকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর যেতে উড়োজাহাজের টিকিটের সর্বোচ্চ দাম থাকে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। চলতি মাসের শুরু থেকেই তা তিন গুণের বেশি হয়ে যায়। মাসের মাঝা-মাঝি সময়ে এটি ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা হয়। বিমানের বিশেষ ফ্লাইটের টিকিটের দামও ১ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। ৩১ মে পর্যন্ত সব টিকিট ‘সোল্ড আউট’ দেখাচ্ছে, মানে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।
এদিকে মালয়েশিয়া গমনের উদ্দেশ্যে গতকাল ভোরে বিমানবন্দরে আসে নাটোরের সিংড়া উপজেলার মো. সাইফুল্লাহ। নারায়ণগঞ্জের গ্রিন লাইন এজেন্সিকে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ওই এজেন্সির মালিক মো. আবু তাকে টিকিট দেওয়ার আশ্বাস দিলে সকাল থেকে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু ফোন দিলে মালিকের নম্বর বন্ধ পান। নিরুপায় সাইফুল্লাহ অসহায় অবস্থায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে টার্মিনাল-১ সামনে বসে থাকেন।
তিনি বলেন, আমি ঋণ করে ওই এজেন্সিকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়েছি। এখন আমার সঙ্গে প্রতারণা করল। আমার ভিসা, পাসপোর্টসহ ওয়ার্ক পারমিট আছে। কিন্তু টিকিট নেই। মালয়েশিয়া যেতে না পারলে আত্মহত্যা করব। তার মতো ২৪ জন মালয়েশিয়াগামী কর্মী প্রতারণার শিকার হয়ে বিমানবন্দরে বসে ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ গ্রিন লাইন এজেন্সি তাদের কাছ থেকে ৬ লাখ করে টাকা নিলেও টিকিট দেয়নি।
অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কুয়ালালামপুরের দুটি আন্তর্জাতিক টার্মিনালে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আটকা পড়ে আছেন, যারা দেশটিতে প্রবেশ করতে পারেননি। তারা অবস্থান করছেন বিমানবন্দরের ফ্লোরে। এতে দুর্ভোগ বাড়ে কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের। নিজেদের কর্মী শনাক্তেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নিয়োগকর্তাদের। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে কর্মীদের।
বিদেশে কর্মী পাঠানো রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) বলছে, সরকার-নির্ধারিত জনপ্রতি ব্যয় ৭৯ হাজার টাকা নির্ধারিত হলেও তাদের গুনতে হয়েছে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। উড়োজাহাজের টিকিট বিক্রির এজেন্সিগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ (আটাব) বলছে, উড়োজাহাজগুলো জ্বালানি খরচের কথা বলে টিকিটের বাড়তি দাম রাখে। বিভিন্ন উৎসবের সময় এটি আরও বাড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ সংস্থা বিমানের টিকিটের দাম বাড়লে তার সুযোগ নেয় সব বেসরকারি ও বিদেশি উড়োজাহাজ সংস্থা। চলতি মাসে মালয়েশিয়ায় কী পরিমাণ কর্মী যাবে, তা আগেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জানানোর দরকার ছিল। এতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো বাড়তি প্রস্তুতি নিতে পারত।
উল্লেখ্য মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়ার দুর্নীতি নিয়ে গত ২৮ মার্চ মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দেয় জাতিসংঘের চারজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ। তবে দুই দেশের সরকারই এই চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশি কর্মীদের জনপ্রতি সাড়ে চার থেকে ছয় হাজার ডলার পর্যন্ত নিয়োগ ফি দিতে হচ্ছে, যা ২০২১ সালে এই দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খেলাপ। ওই এমওইউ অনুযায়ী, এই ফি হবে ৭২০ ডলার পর্যন্ত।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা উভয় সরকারের কাছে এ বিষয়ে তদন্ত, অপরাধীদের বিচার এবং নৈতিক নিয়োগের নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। তবে ৬০ দিনের মধ্যে কোনো সরকার থেকে জবাব না আসায় এই চিঠি মানবাধিকার কাউন্সিলে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়।





