দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সংসদ সদস্যসহ কমপক্ষে ৫০ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দেশের বাইরে গেলে তাদের ফেরা অনিশ্চিত, পাশাপাশি তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন আশঙ্কায় আদালত থেকে অনুমতি নিয়ে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র বলছে, প্রভাবশালী এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তে গতি এসেছে। যে-কোনো সময় চার্জশিটও দেওয়া হবে।
এদিকে গতকাল বুধবার জামিনে থাকা সিলেটের বরখাস্ত ডিআইজি প্রিজন্স আলোচিত পার্থ গোপাল বণিক ও কারাবন্দি যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়েছে দুদক। সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়। দুদকের গণমাধ্যম শাখা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার বিমান বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল মুনিম মোসাদ্দেক আহমেদ, ক্যাসিনোকাণ্ডে নাম আসা মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, যুবলীগের সাবেক নেতা জাকির হোসেনের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সোমার নামে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় দুদক। আদালতের অনুমতির কপি পাঠানো হয় ইমিগ্রেশনে।
আর গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখায় চিঠি দেয় দুদক।
সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বেআইনি ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এই পর্যায়ে তারা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন-এমন গোপন খবরের ভিত্তিতে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিল দুদক। এছাড়া অন্য তিনজন হলেন-গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম প্রধান সাজ্জাদুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল হাই ও ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ।
দুদক সূত্র জানায়, এর আগে ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শামসুল হক চৌধুরীসহ অভিযুক্তদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে। পরে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা আসে-এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে দুদকের আবেদনটি আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আদালত থেকে ওই আদেশ জারি করা হয় গত ৭ জুন। এটি কার্যকর করতে আদালত গত ১৩ জুন পুলিশের বিশেষ শাখায় আদেশের কপি পাঠায়। পরে বিশেষ শাখা থেকে আদেশটি দেশের সব বিমান ও স্থলবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে ক্যাসিনোকাণ্ডসহ অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনে হুইপ শামসুল হকের নাম উঠে এসেছে। তার সম্পদ এক হাজার ৫৪৬ শতাংশ বেড়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর শামসুল হকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল দুদক।
দুর্নীতির অভিযোগে শামসুল হক চৌধুরী ছাড়াও তার পরিবারের সদস্যদের নাম উঠে এসেছে। তার ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনসহ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।
দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের অনুমতি ছাড়া কাউকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে না দুদক। দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য তদন্ত কার্যক্রমের স্বার্থে ভূতাপেক্ষ অনুমোদনসাপেক্ষে যে কারো বিদেশযাত্রা ঠেকাতে পারবে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।
দুদক সচিব বলেন, ‘কমিশন চাইলেই কাউকে আর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে না। কারণ এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায় আছে। আমাদের আরো একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তদন্তের যে-কোনো পর্যায়ে যদি কারো বিদেশযাত্রা রহিত করা প্রয়োজন হয় দুদকের কার্যক্রমের স্বার্থে, তাহলে দুদক সেটা করতে পারবে। করার পরে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে আদালত থেকে ভূতাপেক্ষিক অনুমোদন নিতে হবে।’
আদালতের রায় ছাড়া দুদক কীভাবে বিদেশ যাত্রা রহিত করবে, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা করে দুদক সচিব বলেন, ‘দুদক আগে নিষেধাজ্ঞা দিতে হলে এই ক্ষেত্রে কী কারণে, কেন, বিদেশযাত্রা রহিত করা হলো, কী কারণে, কেন তার পাসপোর্ট জব্দ করা হলো কিংবা তাকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো; সেই কারণ উল্লেখ করে আদালতকে জানালে আদালত তিনটি বিষয়ে ভূতাপেক্ষিক অনুমোদন দেবেন। একটি হলো তার বিদেশযাত্রা, একটি তার পাসপোর্ট রহিত করা, আরেকটি পাসপোর্ট নিয়ে আসা বা জব্দ করা। এতে আর কোনো জটিলতা নেই।’
তিনি বলেন, ‘কোর্টের এ রায়ের আগে যেসব ব্যক্তিকে দুদক থেকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বা বারণ করা হয়েছে, সেই লোকদের ভূতাপেক্ষিক অনুমোদনের জন্য আদালতকে জানানো হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত তার ধারাবাহিকতায় অনেকগুলো বিষয়কে অনুমোদন করে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। গতকালও আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছয়জনকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আমরা আগেই তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলাম, এখন আদালত থেকে আবার অনুমোদন করা হলো।’
যাদের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাদের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুদক অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধান সম্পর্কে দুদক সচিব বলেন, ‘অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। শেষ হলে আপনারা জানতে পারবেন। মামলার অগ্রগতি তো আছেই, এই মুহূর্তে ঠিক কতখানি অগ্রগতি হয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা না বলে সেটা বলতে পারব না। এছাড়া আমরা যখন এগুলো চার্জশিট দেব, আপনাদের জানানো হবে।’
২০১৯ সালে ক্যাসিনোকাণ্ডের সময় যাদের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছিল কিংবা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তাদের অনেককেই পরে আর সংস্থাটি কেন ডাকেনি-এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, ‘আমরা না ডেকে সেখানে গিয়েও কিন্তু তদন্ত করতে পারি। ডাকতে হবে সেটা কথা নয়। তদন্তগুলো কোন প্রক্রিয়ায় আছে সেটা বলতে পারবেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তদন্ত কিন্তু থেমে নেই।’





