দুর্নীতির হাট ক্রীড়া পরিদপ্তর!

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

দুর্নীতির হাট ক্রীড়া পরিদপ্তর!

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ৯ মে, ২০২২

সরকারি প্রতিষ্ঠান ক্রীড়া পরিদপ্তরকে কুঁড়ে খাচ্ছে দুর্নীতির বড় ইঁদুর। কেনাকাটা থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের শিকড় অনেক গভীরে। অভিযোগ উঠেছে, ভুয়া ঠিকানা ও জাল কাগজপত্র দিয়ে সম্প্রতি পরিদপ্তরের ২৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা করে ঘুষ। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব দুর্নীতির পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন পরিদপ্তরের পরিচালকের একান্ত সহকারী বখতিয়ার খলজি। নিয়োগ ছাড়াও বখতিয়ারের বিরুদ্ধে নির্ধারিত বিভিন্ন টুর্নামেন্টের খরচ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ারও প্রমাণ রয়েছে। যার অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, মন্ত্রণালয় ও তার আওতাধীন কোনো সংস্থায় অনিয়ম-দুর্নীতি করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন বছরে মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি মুক্ত হয়নি। এমনকি অনিয়ম দুর্নীতির কারণে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়াও হয়নি। ফলে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থায় চলছে ঠান্ডা মাথায় অনিয়ম ও দুর্নীতি।   

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্রীড়া পরিদপ্তর মূলত দেশের তৃনমুল পর্যায়ে খেলাধুলার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বয়সভিত্তিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আয়োজন করে বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিদপ্তর। কিন্তু এই ক্রীড়া পরিদপ্তরের জিম্মিদশা নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালকের একান্ত সহকারীর একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও দেশের ক্রীড়া পরিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করছেন। যার পেছনে (অপ্রকাশ্যে) রয়েছেন পরিচালকসহ আরো কয়েকজন কর্মকর্তা। 

কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ক্রীড়া পরিদপ্তরে নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন পরিচালকের একান্ত সহকারী বখতিয়ার খলজি। তার এসব অনিয়ম নিয়ে কথা বললে বিভিন্ন জেলার ক্রীড়া কর্মকর্তাদের ধমকের সুরে কথা বলেন তিনি। গত ১৭ অক্টোবর পরিদপ্তরের ২৫ কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই নিয়োগে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করে আপন ভাইসহ ১০ জনকে নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

জানা গেছে, কোটা নেই কিন্তু সেই সকল জেলার প্রার্থীদের ১৫/২০লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে চাকরিতে নিয়োগের ববস্থা করেছেন। এ কাজে তিনি ওই সকল প্রার্থীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের জেলার ঠিকানা জালিয়াতি করেছেন। সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে যোগদানকৃত মনজুরুল হাসানের ভোটার আইডি তথ্য অনুযায়ী স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয় রংপুর জেলার কাউনিয়া থানাধীন সারাই ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের তালেবটারী গ্রামের মনের উদ্দিনের বাড়ি।

বাস্তবেও এর সত্যতা পাওয়া যায়। কিন্তু চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রে বখতিয়ার খলজী গ্রুপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পিতা ও মাতার নাম ঠিক রেখে ঠিকানা পরিবর্তন করে সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার খাষপুখুরিয়া ইউনিয়নের খাসদেলদারপুর গ্রাম স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়। বিষয়টি অনুসন্ধান করে সত্যতা পাওয়া যায়, মনজুরুলের বিষয়ে খাষপুকুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তদন্ত করে একটি লিখিত দেন যে, খাসদেলদারপুর গ্রামে এই নামে কেউ থাকে না এবং তিনি উক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের চিনেন না। বখতিয়ার খলজি পরিচালকের দপ্তরে চাকরি করার সুবাদে সব অর্থ ছাড় ও চাকরির বিষয়ে সারা দেশে যোগাযোগ করেন। আর এই সূত্র ধরে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি সিন্ডিকেট।

এর আগে ২০২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ক্রীড়া পরিদপ্তরের ৯টি পদে ২০ জনকে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। যাতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রংপুরের ২০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ জেলা কোটা অনুসারে এই জেলার কারো চাকরি হওয়ার কথা নয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এর পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন পরিদপ্তরের পরিচালকের একান্ত সহকারী বখতিয়ার খলজি। রংপুরে পোস্টিং নেওয়া তার ছোট ভাই মনিরুজ্জামান চাকরি নিয়েছেন বগুড়ায় স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে। যদিও তারা রংপুরের স্থায়ী বাসিন্দা।

ঝিনাইদহে কর্মরত লিটন মিয়া রংপুরের বাসিন্দা হয়েও গাইবান্ধার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি নেন। ঢাকার মোহাম্মদপুরে কর্মরত আবু বকর সিদ্দিক রংপুরের বাসিন্দা হয়েও পাবনা জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি নিয়েছেন।

বাগেরহাটে কর্মরত রজবুল ইসলাম রংপুরের বাসিন্দা হয়েও বগুড়া জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি নেন। একই জেলায় কর্মরত এম. এইচ মুন্না রংপুরের বাসিন্দা হয়েও কুড়িগ্রাম জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি নেন। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী মনজুরুল হাসানের স্থায়ী ঠিকানা রংপুরে। কিন্তু, নিয়োগে তার স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়েছে সিরাজগঞ্জের।

এসব অনিয়ম করতে গিয়ে বখতিয়ার বিভিন্ন জেলায় দায়িত্বরতদের চাপ দিতেন বলে দাবি করেন বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তারা। এছাড়া বখতিয়ারের বিরুদ্ধে দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, পরিদপ্তরের সব কাজে প্রভাব খাটান এই বখতিয়ার। অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে সবাইকে বাধ্য করেন তিনি। দপ্তরটির নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন উপপরিচালক নুরুল ইসলাম। কিন্তু, এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

এসব বিষয়ে বখতিয়ার খলজির বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি জানান তার সব বিষয়ে পরিচালক সাহেব বক্তব্য দিবেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন পরিচালক কিভাবে বক্তব্য দিবে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন স্যার সব জানেন। এছাড়া আর কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।

আর ক্রীড়া পরিধদপ্তরের সদ্য নিয়োগ পাওয়া পরিচালক মোহম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী (যুগ্মসচিব) জানান এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তৎকালীন পরিচালকের সঙ্গে আলাপ করে বিষয়টি জানার অনুরোধ করেন তিনি। 

এ বিষয়ে সাবেক পরিচালক কে এম আলী রেজা জানান, নিয়মকানুন মেনেই সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগের বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কোনো অনিয়ম হলে সেটাতো পরিচালকের জানার কথা নয়। এর সব কিছু মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই জানেন। 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads