অতিরিক্ত গতি, ভুল ওভারটেকিংসহ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় গড়ে সারা দেশে প্রতিদিন ১১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এভাবে গত পাঁচ বছরে ১৫ হাজার ২৯৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ১৪ হাজার ৯৬৮ জন। আহতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৪৭ জন। তবে এসব দুর্ঘটনার দায় নিতে চায়না সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও বিআরটিএসহ পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট সমাধানে পরিবহন মালিকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। পরিবহন মালিক সংগঠন বলছে, বছরের পর বছর বিআরটিএ কয়েক লাখ লাইসেন্স বরাদ্দ করতে পারছে না, ফলে বাড়ছে দক্ষ চালক সংকট। অন্যদিকে বিআরটিএ বলছে এককভাবে কাউকে দোষারোপ না করে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
প্রতি বছরই সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে হাজারো প্রাণ। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই শিশু, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। এই দুই শ্রেণিকে দেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির মূলশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা অনুসারে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মানুষের ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। আর দুর্ঘটনায় নিহত লোকদের সাড়ে ১৮ শতাংশ শিশু, এদের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
এআরআইয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি ও দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট যানজট অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দফায় দফায় বৈঠকে বসেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। সংকট সমাধানে নেওয়া হয়েছে নানাবিধ পরিকল্পনা। কিন্তু এতেও থামেনি সড়কে মৃত্যুর মিছিল। চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪১২টি। এতে গড়ে প্রতি মাসে ৩৪১টি এবং প্রতিদিন ১১টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সারা দেশে ১৫ হাজার ২৯৬ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরইমধ্যে ২০১৬ সালে সংঘটিত ২ হাজার ৫৬৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৬৩ জন, আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৩৪ জন। ২০১৭ সালে সংঘটিত ২ হাজার ৫৬২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৫১৩ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৯৮ জন। ২০১৮ সালে সংঘটিত ২ হাজার ৬০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৫ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯২০ জন। ২০১৯ সালে সংঘটিত ৪ হাজার ১৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ১৩৮ জন, আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪১১ জন। ২০২০ সালে সংঘটিত ৩ হাজার ৪১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ২১৯ জন, আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৮৪ জন।
পুলিশের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ৮৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালকের বেপরোয়া গতি, ভুল ওভারটেকিং ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ আর অন্যান্য কারণ ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এলাকাভিত্তিক সড়ক দুর্ঘটনার হার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ন্যাশনাল হাইওয়েতে সবচেয়ে বেশি ৬৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। রিজিওনাল সড়কে ১৮ দশমিক ৪, রুরাল রোডে ৫ দশমিক ৪, ফিডার রোড ৪ দশমিক ২, সিটি রোডে ১ দশমিক ৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। আর দুর্ঘটনাস্থলের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভিত্তিতে, সবচেয়ে বেশি ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় অনিয়ন্ত্রিত এলাকায়। ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ১৩ দশমিক ৮, রোড ডিভাইডার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ৮ দশমিক ২, পথচারী পারাপারে ২ দশমিক ৩, পুলিশ ও ট্রাফিক বাতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার হার ১ শতাংশ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪২০। ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে ৪২ লাখ ৪৩ হাজার ৯০২ জনের আর ২ লাখ ৫০ হাজার ৫১৮টি যানবাহনের কোনো বৈধ চালক নেই। নিবন্ধিত ভারী গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৪টি, এর বিপরীতে লাইসেন্স রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ জনের। অর্থাৎ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৮ টি গাড়ি পরিচালিত হচ্ছে ভিন্ন ক্যাটাগরির লাইসেন্স প্রাপ্ত কিংবা বৈধ চালকের দ্বারা। ৩০ লাখ ৬২ হাজার ৫৩৪টি মোটর সাইকেল নিবন্ধিত থাকলেও লাইসেন্স রয়েছে ১৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪০৬ জনের। বাকি ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ১২৮ টি মোটর সাইকেলের কোনো বৈধ চালক নেই।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, সার্বিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারছে না এই খাত। ফলে পরিবহন নিয়ে অনেক পরিকল্পনা হলেও এর বাস্তবায়ন হয় না। ছাত্র আন্দোলনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যার একটিরও কাজ হয়নি। ফলে সড়কে দুর্ঘটনা কমছে না।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সবার আগে দরকার সঠিক তথ্য। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত, ধরন ও কারণ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় পরিকল্পনা প্রণয়নে ঘাটতি থেকে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৯৯৭ সাল থেকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা করে আসছে। এর মধ্যে সাতটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনার যে হিসাব প্রকাশ করছে, তাতে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাই সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হকের মতে, সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। ফলে শুধু যে নিরাপত্তার বিষয়টি ঝুঁকির মুখে তা নয়, এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যানজটও। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বৈধ চালকের পরিসংখ্যান অপর্যাপ্ত জেনেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ কেন নতুন গাড়িকে ছাড়পত্র দিচ্ছে। তাই সংকট সমাধানে দক্ষ চালক গড়ে তোলার পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে নিবিড় নজরদারি ও আইন প্রয়োগের বিষয়ে।
বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, এই দায় কারো একার নয়। বছরের পর বছর বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) কয়েক লাখ লাইসেন্স বরাদ্দ করতে পারছে না ফলে বাড়ছে চালক সংকট। সড়ক দুর্ঘটনারোধে দক্ষ চালক তৈরির বিকল্প নেই বলে এ বিষয়টি উন্নয়নে আমরা কাজ করছি।
পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, সংকট সমাধানে ১১১টি সুপারিশমালা আর পরামর্শ আবদ্ধ রয়েছে কেবলই বৈঠকে। চিহ্নিত ব্ল্যাক স্পটসমূহ, চালকদের জন্য কর্মশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বৃদ্ধির পাশাপাশি নজর দিতে হবে চালকদের ভর্তুকির বিষয়েও। আইনি জটিলতা ও লাইসেন্স বরাদ্দের সমস্যা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমাধান না হলে পরিবহন শ্রমিকদের আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে জানান তিনি।
অব্যবস্থপনার দায় শুধু বিআরটিএ’র একার নয় উল্লেখ করে বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, লাইসেন্স বরাদ্দজনিত সমস্যা সমাধানে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে, অচিরেই হাতে লাইসেন্স পাবেন চালকরা। এছাড়া জটিলতা কমিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভিন্ন ক্যাটাগরির লাইসেন্স প্রাপ্তির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন বিধিমালায়। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।





