সারা দেশ

ধুঁকে ধুঁকে মরছে সিলেটের সুরমা

  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সিলেট প্রতিনিধি:

দেশের অন্যতম দীর্ঘতম নদী সুরমার স্থানে স্থানে এখন বিশাল চর। কোথাও কোথাও সবজি ফলিয়েছেন স্থানীয়রা, কোথাও বিকেল হলে চরে বসে জমজমাট ফুটবল-ক্রিকেট ম্যাচ।  চরসহ বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকসহ আবর্জনার স্তূপ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।  ঐতিহ্যগতভাবে নদীমাতৃক বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রাণপ্রবাহের এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা।

হত্তর পরিকল্পনার আওতায় থমকে থাকা খননকাজ সম্পন্ন করার তাগিদ দিচ্ছেন তাঁরা।  উত্তর-পূর্ব ভারতের বরাক নদী আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার অমলশিদে সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।  তবে নদীটি সিলেটের সীমান্তবর্তী গ্রাম বদরপুর দিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি আলাদা শাখায়।  উত্তর দিকের শাখাটি সুরমা নামে প্রথমে পশ্চিম দিকে ও পরে দক্ষিণ-পশ্চিমে সিলেট শহর অভিমুখে বয়ে গেছে।

সিলেট অতিক্রম করে এটি প্রবাহিত হয়েছে পশ্চিমে সুনামগঞ্জ শহরের দিকে। শেষ পর্যায়ে দক্ষিণে এসে নদীটি কুলিয়ারচরের কাছে মেঘনায় মিলেছে।

সম্প্রতি সিলেট নগরের কুশিঘাট এলাকা থেকে কাজিরবাজার হয়ে টুকেরবাজার পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে সুরমা নদীর উল্লিখিত হতশ্রী চেহারা চোখে পড়েছে।  তবে সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ এলাকা থেকে সুনামগঞ্জের শেষ সীমা পর্যন্ত কমবেশি এমন চিত্রই দেখা যাবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্য মতে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশের পর নদীর প্রথম ৩২ কিলোমিটারে ১০০টির বেশি চর পড়েছে। আসামের অমলসিদেও পলি জমে অনেকটা ভরে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে উৎস বরাক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে সুরমা।  এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময়ের বহতা স্রোতস্বিনী সুরমা নদী একদিন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন নদী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

উদ্যোগ অনেক, বাস্তব কাজ কম

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সুরমা নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছে।  পানি উন্নয়ন বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক যুগে চার দফায় নদীটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব কাজ হয়েছে কমই।

২০১৯ ও ২০২১ সালে দুটি সমীক্ষা চালানো হয়।  তারও আগে ২০১৭ সালে একটি ধারণাপত্র ও ২০১২ সালে খননের একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায় পাউবো। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেটের ১১টি উপজেলা আক্রান্ত হয়।  ডুবে যায় খোদ সিলেট নগরের অর্ধেকের বেশি এলাকা। নদী খননের দাবি নতুন মাত্রা পায়।  এর পর ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুরমা নদীর ১৮ কিলোমিটার অংশে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কাজটি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে সে বছরেরই জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল।  কিন্তু তা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ প্রান্তে এসেও চলছে। খননকাজের ধীরগতি নিয়ে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।  ২০২৩ সালের ২১ জানুয়ারি খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন তিনিই।  দ্বিতীয় মেয়াদে চলতি বছরের জুনে খননকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।  তবে তা সময়মতো শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তা ছাড়া নদীর উৎসমুখ বন্ধ থাকলে মাঝখানে এই খনন কতটা ফল দেবে তা-ও অনিশ্চিত।

বৃহত্তর পরিকল্পনার তাগিদ

পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসামের বরাক ও সুরমার মিলনস্থল অমলসিদে পলি পড়ে সুরমার উৎসমুখ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।  ফলে শুষ্ক মৌসুমে মূল উৎস বরাক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে সুরমা নদী।  তখন লোভা, ডোনা নদীর মতো ছোট ছোট নদীর পানিই ভরসা সুরমার। ফলে এ সময় সুরমার গতি অনেকটাই স্থবির হয়ে যায়। কেবল বর্ষাতেই বরাকের পানি উৎসমুখের ভরাট অংশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুরমায় মেলে। তখন সাময়িকভাবে যৌবন ফেরে নদীটিতে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সমন্বয়ক আশরাফুল কবীর বলেন, ‘যথাসময়ে খনন শেষ না হলে বর্ষায় সিলেট নগরবাসী আবার ভোগান্তিতে পড়বে।’

নদী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়াটার কিপার অ্যালায়েন্স’-এর মনোনীত ‘সুরমা রিভার ওয়াটার কিপার’ পরিবেশ আন্দোলনকর্মী আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘খননের কাজ কবে শেষ হবে জানা নেই।  আর বিচ্ছিন্ন খনন নয়, বরং সুরমা নদীর মৃত্যু ঠেকাতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা দরকার। উৎসমুখে খনন না করে মাঝখানে কিছু অংশ খনন করে লাভ নেই।’

‘ওয়াটার কিপার অ্যালায়েন্স’ বাংলাদেশের সমন্বয়ক ও ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, ‘সুরমার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে অনেকগুলো খাল এবং ছড়ার।  এগুলো সব ভরে যাচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  এগুলো ধীরে ধীরে নদীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

কাজ শেষ করার আশ্বাস কর্তৃপক্ষের

সুরমায় চলমান খননকাজ জুনের মধ্যে শেষ হবে জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। জুনের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ হবে বলে আশা করি। ’ সিলেট নগরের কুশিঘাট এলাকা থেকে সদর উপজেলার জাঙ্গাইল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি প্যাকেজে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

১৮ কিলোমিটার অংশে খনন করে কী উপকার হবে এই প্রশ্নের জবাবে দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘এটা সাময়িক সমাধান।  এতে সুরমার এ অংশে পানির ধারণক্ষমতা একটু বাড়বে।’

পুরো সুরমা খননের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আরো বলেন, ‘উৎস মুখে খনন দরকার। কিন্তু বিষয়টি দুই দেশের ব্যাপার।  আমাদের লেভেল থেকে এটা হয়তো সম্ভব না।  আমরা পারব নিচের দিকে খনন করতে।  সুনামগঞ্জের নিচের দিকে সুরমায় প্রচুর পলি জমেছে।  পুরো নদী খনন হলে এর সুফল পাওয়া যাবে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads