জাতীয়

নকল ওয়েবসাইট দিয়ে টিকা জালিয়াতি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

নতুন জালিয়াতির ফাঁদ হিসেবে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেটকে বেছে নিয়েছে একটি চক্র। প্রবাসী কর্মী ও বিদেশগামীদের টার্গেট করে করে চালাচ্ছে তাদের রমরমা অসাধু ব্যবসা। বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের নাকের ডগায় ভুয়া ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট বানিয়ে তা সরবরাহ করা হচ্ছে বিদেশগামীদের কাছে। অনেক চলেও যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। তবে ভোগান্তির শিকার লোকের সংখ্যাও কম না। এসব তথ্য উঠেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে।

আসল সার্টিফিকেটের মতো করে বানানো নকল সার্টিফিকেট যাচাই করতে বানানো হয়েছে সুরক্ষার নকল ওয়েবসাইট। দেশের করোনা সেবা নিয়ে জালিয়াতিতে জড়িত চক্রের সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত বলে জানা গেছে। 

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম বলেন, ওয়েবসাইট ক্লোন বা নকলের বিয়ষটি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব। তেমনটি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজ মুহাম্মদ হাসান বাবু বলেন, রাষ্ট্রীয় ওয়েবসাইট নকল করা বা ক্লোন করা নৈতিকভাবে সমর্থন যোগ্য নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা এভাবে ব্যবহার অসমর্থনযোগ্য। এ ভুয়া সাইটের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি যেখান থেকে এ সাইটের ডোমেইন হোস্টিং করা হয়েছে সেখান থেকেই বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।

জানা গেছে, বিমানবন্দরে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট যাচাইয়ের পাশাপাশি ভ্যাকসিন দেওয়ার সার্টিফিকেট যাচাই করেন বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কমীরা।

ভ্যাকসিন সার্টিফিকেটে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে দেখা হয় সার্টিফিকেটটি আসল কিনা। তবে বিমানবন্দরের কর্মীদের চোখ ফাঁকি দিতে অভিনব কৌশলে প্রতারণা করছে একটি চক্র। সরকার প্রদত্ত আসল সার্টিফিকেটের মতো বানানো হচ্ছে সার্টিফিকেট। একই সঙ্গে সেই সার্টিফিকেটের মধ্যে থাকছে কিউআর কোড, সেটি স্ক্যান করলে চলে যাচ্ছে একটি ওয়েবসাইটে, যেটি এক ঝলক দেখলে যেকারও মনে হচ্ছে আসল। তবে ইউআরএল চেক করলেই দেখা যাবে, সুরক্ষার আদলে নকল ওয়েব সাইট। বিমানবন্দরে যাত্রীদের লম্বা লাইনের চাপ, একই রকম দেখতে হওয়ায় অনেকেই এমন ভুয়া সার্টিফিকেটে চলে গেছেন বিভিন্ন দেশে।

টিকা নয়, টাকা দিলেও পাওয়া যেত ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট। প্রবাসী কর্মী ও বিদেশগামীদের টার্গেট করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মীদের যোগসাজশে ছিল রমরমা অসাধু কারবার। তথ্য-প্রমাণসহ বাংলা ট্রিবিউন গত অক্টোবরে এমন খবর প্রকাশ করলে মাঠে নামে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। ভ্যাকসিনের সার্টিফিকেট জালিয়াত চক্রের কমপক্ষে ২০ জন সদস্য আটকও হয়। তারপরও টিকার সার্টিফিকেট নিয়ে অবৈধ কারবার থেমে ছিল না। তবে সরকারের নজরদারি বাড়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টরা সর্তক হওয়ায় বেকায়দায় পড়ে প্রতারকচক্র। তারা হাতে নেয় নতুন নতুন কৌশল।

এরকম একটি জাল সনদ দেখতে অবিকল আসল ভ্যাকসিন সনদের মতো। সেই সার্টিফিকেটে ফন্ট, কালার, সবকিছু আসল সনদের মতো। এমনকি সেই সনদের গায়ে সুরক্ষার আসল ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া। সেই সার্টিফিকেটটি স্ক্যান করতে চলে গেল একটি ওয়েবসাইটে। সেটি হচ্ছে সুরক্ষা ডট অর্গ (https://surukkha.org)। জালিয়াত চক্র তাদের নিরাপত্তায় ওয়েব হোস্টি, ডোমেইন রেস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য লক করে রেখেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে এই ওয়েবের নেপথ্য চক্রের তথ্য জানা যাচ্ছে না।

তবে জালিয়াতচক্র নকল ওয়েবসাইট বানালেও আসল ওয়েবসাইটের সঙ্গে রিডাইরেক্ট করা হয়েছে। সরাসরি সুরুক্ষা ডট অর্গ (https://surukkha.org) লিংক দিয়ে ব্রাউজ করলে কোনো কিছুই পাওয়া যায় না। শুধু চক্রের সার্টিফিকেটের কিউআর কোড স্ক্যান করলে ভ্যারিফিকেশন পেজ আসে। এছাড়া সেই পেজের অন্যান্য ট্যাবে ক্লিক করলে আসল ওয়েবসাইট উন্মুক্ত হয়। ফলে খুব ভালো করে খেয়াল না করলে এই প্রতারণা হুট করে যে কেউ ধরতে পারবেন না।

শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘বিমানবন্দরে যাত্রীদের করোনা পরীক্ষার সনদ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় শতভাগ যাচাই করা হয়। প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে ৫-৬ যাত্রী ভুয়া সনদ নিয়ে আসেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জানা গেছে, ট্রাভেল এজেন্সি, টিকেটিং এজেন্সিদের সহায়তায় এসব কাজে সক্রিয় প্রতারকচক্র। জাল সার্টিফিকেট বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। যাত্রী প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লেনদেনটা হচ্ছে মোবাইল ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে।

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এখন ভ্যাকসিন ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। আবার কোনো দেশে ভ্যাকসিন ছাড়া গেলে লাখ টাকা খরচ করে হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়। আবার দেশভেদে অনুমোদিত ভ্যাকসিনও ভিন্ন। এতে বিদেশগামী প্রবাসীদের কাজে ফিরতে হলে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেটের বিকল্প নেই। এ কারণে অনেক প্রবাসী এসব প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছেন নিজের বিদেশ যাত্রা নিশ্চিত করতে।

জানা গেছে, একটি প্রতারকচক্র ফেসবুকে এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সম্প্রতি ‘বিএমইটি ভ্যাকসিন’ নামে একটি ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, শতভাগ সফল নিবন্ধন ও সুরক্ষায় সঙ্গে সঙ্গে তথ্য আপডেট পেতে সহযোগিতা করছি। এনআইডি অথবা পাসপোর্ট দিয়ে টিকার নিবন্ধন ও টিকা সনদের আর্জেন্ট ব্যবস্থায় সহযোগিতা করছি। টিকা কার্ড বা টিকা সনদের ভুল তথ্য সংশোধন ও সংযোজনের সর্বাধিক সহযোগিতা রয়েছে। প্রবাসী ভাইদের টিকা, ভিসা, টিকিট অথবা যেকোনো সমস্যা শতভাগ সমাধানেও তারা সর্বদা প্রস্তুত। 

০১৮৭৬১৯৯২৭৯ নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতির জন্যই এমন ক্লোন সাইট তৈরি করতে পারে প্রতারকরা। এর মাধ্যমে তারা টিকাগ্রহণের এসএমএস প্রদান থেকে শুরু করে টিকার নাম পরিবর্তন, টিকা না নিয়েও নিয়েছে মর্মে তথ্য আপডেট করা, ইচ্ছামতো বুস্টার ডোজ প্রদান, পজিটিভ রিপোর্টকে নেগেটিভ করছে। কারণ এর আগেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে ধরা পড়েছে জালিয়াতরা।

বিশেষজ্ঞ ওয়েব ডেভেলপাররা বলছেন, বিটিসিএল ওয়েবসাইট তৈরির জন্য যে ডোমেইন ব্যবহার করা হয় সেটির জন্য ‘ডট গভ ডট বিডি’ নির্দিষ্ট করা আছে। অর্থাৎ এ ঠিকানার পরিবর্তন মানে সেটি সরকারি ওয়েবসাইট নয়। বিকল্প ডোমেইন ব্যবহার করে ওয়েবসাইট ক্লোন করার সুয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে যেসব বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট লাভজনক সেগুলোর ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে থাকে। এমনকি জনপ্রিয় পত্রিকা বা টেলিভিশনের ওয়েবসাইটও ক্লোন করা হয়। এ ক্ষেত্রে ক্লোন করা বা নকল ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সেটি বন্ধ করা যেতে পারে।

অনুসন্ধান বলেছে, দেশের করোনা সেবা নিয়ে জালিয়াতিতে জড়িত চক্রের সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত। তারা এতটাই গোপনীয়তা অবলম্বন করে এ অপকর্ম করছে যে, এর উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। মূলত বিদেশগামী যাত্রীদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত। বিদেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা অনেকাংশে রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিদেশে যেতে কোভিড নেগেটিভ সনদ ও টিকা পেয়েছেন এমন কার্ড থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখানেই শুরু জটিলতার। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব বিদেশগামী যাত্রীরা যথাসময়ে তাদের টিকা সনদ এবং কোভিড সনদ হাতে পান না। ফলে তারা জটিলতা নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগে এবং সেখান থেকে আইসিটি বিভাগে ধরনা দেয়। এসব জায়গায় ঘুরে কোনো ফল না পেয়ে বা বিলম্বিত হওয়ায় তারা একপ্রকার দিশেহারা হয়ে পড়েন। তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, কাকরাইলের শ্রম ও জনশক্তি উন্নয়ন ব্যুারো এবং ইস্কাটনের প্রবাসী কল্যাণ ভবনের সামনে অপেক্ষমাণ দালালরা তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।

এমনই একজন আবদুল খালেক (আসল নাম নয়) জানান, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করনে। তার ছুটির মেয়াদ শেষ এমনকি বিমানের টিকিটও কাটা হয়েছে। কিন্তু কোভিড টিকা নেওয়া হয়নি বলে জটিলতায় পড়েন। টিকিট করার পর জানতে পারেন টিকা ছাড়া ভ্রমণ করা যাবে না, এদিকে টিকা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময়ও নেই। এ পর্যায়ে সবাই যখন বলেছেন কোনোভাবেই তার এখন বিদেশে যাওয়া সম্ভব নয়, তখনই তিনি সমাধান খুঁজে পান। নিজের স্বার্থে প্রতারকদের নাম ঠিকানা গোপন রেখে আবদুল খালেক বলেন, রাজধানীর কাকরাইলের একটি চায়ের দোকানে অপরিচিত একজন বলেন, সমস্যার সমাধান তিনি করে দিতে পারবেন। এ জন্য দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। একপর্যায়ে ৩০ হাজার টাকায় রফা হয়। তাকে পুরানা পল্টনে কোনো একটি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নাম-ঠিকানা নিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে টিকা কার্ড সরবরাহ করা হয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads