জাতীয়

নজরদারিতে কুরিয়ার সার্ভিস

  • সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
  • প্রকাশিত ২৪ অগাস্ট, ২০২১

দেশি-বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচার ও আমদানির ঘটনা বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ আর কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে পুরোপুরি সফলতা আসছে না।

অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে মাদক পাচারে সরকারি ডাক বিভাগ, রপ্তানি কার্গো শ্রমিক, দেশি ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এসব অপরাধে সংশ্লিষ্টতার কারণে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তারও হয়েছেন বেশ কয়েকজন। বর্তমানে নজরদারিতে আছেন কয়েকজন। ইতঃপূর্বে গ্রেপ্তারের পর ছাড়া পেয়ে অনেকেই আবারো একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে জানা যায়। জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদকের চালান আসা-যাওয়া করছে। লাগেজে, বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে, সরকারি ডাক বিভাগ, কুরিয়ার সার্ভিসসহ নানা মাধ্যমে দেশি-বিদেশি কারবারিরা আনা-নেওয়া করছে ভয়ংকর এসব মাদক।

সাম্প্রতিক সময়ে ভয়ংকর যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে তার সবগুলো আসছে বিদেশ থেকে, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে আনা হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা গলিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের মাধ্যমে ভয়ংকর মাদক আইস বা ক্রিস্টাল আসে উগান্ডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে। আরেক নতুন মাদক এলএসডি বাংলাদেশে আসছে নেদারল্যান্ডস ও কানাডা থেকে। এর আগে ২০১৮ সাল থেকে বিমানবন্দর হয়ে দেশে প্রবেশ করে নতুন মাদক খাত। নতুন মাদক শুধু দেশেই আসছে না, ঢাকার বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিদেশেও যাচ্ছে ইয়াবা ও মাদক তৈরির কাঁচামাল।

গত ডিসেম্বরে বিমানবন্দর ব্যবহার করে সোয়েটারের আড়ালে কার্টনে ইয়াবার একটি চালান যাচ্ছিল সৌদি আরবে। সেই পার্সেলটি কায়িক পরীক্ষা বা তল্লাশিতে ধরা পড়েনি। পরে কার্গোতে ওঠার আগে স্ক্যানিংয়ে চালানটি ধরা পড়ে। দুটি সোয়েটারের কার্টন খুলে তাতে পাওয়া যায় ৩৮ হাজার ৮৮৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট।

আবার সাধারণ পরীক্ষা ও স্ক্যানিং ভেদ করেও মাদকের চালান চলে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পাঠানো হচ্ছিল ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল সিডোঅ্যাফিড্রিন। চালানটি ধরা পড়ে মালয়েশিয়ায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দর হয়ে মাদকদ্রব্য পাচার হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া মাদকের চালান রপ্তানি কার্গো ভিলেজ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব নয়। কার্গো পর্যন্ত পৌঁছাতে কারো না কারো অবশ্যই সংশ্লিষ্টতা থাকতে হবে। আর এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই নজরদারি করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

জানা যায়, পণ্যের পার্সেল বা প্যাকেট রপ্তানি কার্গো পর্যন্ত যেতে কয়েক ধাপের মধ্যে একটি হচ্ছে হাতে পরীক্ষা বা তল্লাশি করা। কিন্তু কায়িক তল্লাশিতে অনেক সময় ধরা পড়ছে না। সেখানে ধরা না পড়লেও স্ক্যানারে গিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু চালান ধরা পড়ছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ কুরিয়ার সার্ভিস এবং আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের স্ক্যানার মেশিন নেই। দেশে শুধু দুটি আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে একটি করে এবং ডাক বিভাগের তিনটি স্ক্যানিং মেশিন থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল-আহসান বলেন, মাদক আসা-যাওয়া প্রতিরোধে সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে বিমানবন্দরে। বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি চালান ধরা পড়েছে, যাতে কোনোভাবেই মাদক পাচার কিংবা বিদেশ থেকে আসতে না পারে, সে জন্য কঠোর নজরদারি রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কীভাবে মাদক শনাক্ত করা যায় এবং যাত্রীদের গতিবিধি বোঝার বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ অব্যাহত আছে। রপ্তানি কার্গোতে ডুয়েলভিউ এক্স-রে মেশিন বসানো হয়েছে এবং আরো ১১টি বসানো হবে। সিসি ক্যামেরাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে মাদক পাচারের সময় বড় কয়েকটি চালান আটকের পর নড়েচড়ে বসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

এসব চোরাকারবারিকে ধরতে ইন্টারপোলেরও সহযোগিতা চেয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি যেসব কুরিয়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, কুরিয়ারে মালামাল পাঠাতে হলে ব্যাংকের মতো প্রাপক ও প্রেরকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক এমন সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া আর্ন্তজাতিকভাবে মাদক পাচার রোধে বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, বিমানবন্দরে পার্সেল কুরিয়ার স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার, এনআইডি কপি সংযুক্ত, লাইসেন্সবিহীন কুরিয়ার সার্ভিসগুলোকে আইনের আওতায় আনারও সিদ্ধান্ত হয়।

কুরিয়ার সর্ভিস ব্যবহার করে মাদক পাচারের সাথে ডাক বিভাগসহ দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে গোয়েন্দারা। এদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

গোয়েন্দারের করা এ ধরনের একটি তালিকায় নাম আসে ডাক বিভাগের ৬ কর্মকর্তার। এদের সঙ্গে পাকিস্তানি একটি সিন্ডিকেটেরও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ডিবি পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, দুটি আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের দুই কর্মকর্তারও নাম পাওয়া গেছে। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদকসামগ্রীর চালান দেশের বাইরে পাঠায়। এক্ষেত্রে চক্রটি ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে। এছাড়া দেশের শীর্ষ একটি কুরিয়ার সার্ভিসের সাবেক এক কর্মকর্তার সঙ্গে মাদক সিন্ডিকেটের একটি গ্রুপের সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। সিআইডির একটি সূত্র জানায়, যাদের নজরদারি করা হচ্ছে। এ তালিকায় আর্ন্তজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের সাবেক এক কর্মকর্তা আছেন। তিনি এখন নাম পাল্টিয়ে অন্য নামে চলাফেরা করছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর অব্যাহত নজরদারি করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে আর্ন্তজাতিক ৫ টি কুরিয়ার সার্ভিসের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বর্তমান দু-একজন কর্মকর্তাও জড়িত আছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, এ ধরনের অপরাধীরা নানা কৌশলে সক্রিয় রয়েছে। আগেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু ঘুরেফিরে এরা একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে সরকারি ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশ ডাকঘরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাদকদ্রব্য সম্পর্কে ততটা জ্ঞান নেই। পার্সেল স্ক্যানিং মেশিনে দেওয়ার পর কোন ধরনের সংকেত দিলে বোঝা যাবে মাদক আছে, সে সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণ নেই এই বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডাক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো পার্সেলে মাদকের অস্তিত্ব থাকলে স্ক্যানিংয়ের সময় কী ধরনের সংকেত আসে, সেসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দরকার। প্রশিক্ষণ করানোর জন্য সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কয়েকটি চালান ধরা পড়ায় আগে থেকেই ডাক বিভাগের সংশ্নিষ্ট শাখায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads