নজরবন্দি পল্লবীর গডফাদাররা

সংগৃহীত ছবি

অপরাধ

নজরবন্দি পল্লবীর গডফাদাররা

  • সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
  • প্রকাশিত ২৫ মে, ২০২১

পল্লবীতে ছেলের সামনে বাবাকে হত্যার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। পুলিশ রিমান্ডে এসব তথ্য জানাচ্ছে গ্রেপ্তারকৃতরা। ওইসব তথ্যে উঠে আসছে স্থানীয় প্রভাবশালী একাধিক ব্যক্তির নাম। প্রাপ্ত তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি ওইসব গডফাদারকে রাখা হয়েছে নজরদারিতে।

এদিকে পল্লবীতে জমি নিয়ে খুন, হামলা, আর মিথ্য মামলার ঘটনা দীর্ঘদিনের হলেও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের। ভূমিদস্যুদের লালসা চরিতার্থ করতে এখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী চক্র। এসব চক্রকে আবার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে রাজনৈতিক মহল। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী জিম্মি হয়ে আছে কয়েকটি চক্রের কাছে। তবে এবার এসব চক্রকে নিশ্চিহ্ন করতে মাঠে নামছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ প্রসঙ্গে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল মুহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বলেন, পল্লবীর এই দুষ্টচক্রকে ভেঙে দিতে সামনে আরো বড় অপারেশন চালানো হবে। অপরাধীর কোনো পরিচয় দেখা হবে না। অপরাধকর্মে জড়িত যেই হোক না কেন ছাড় দেওয়া হবে না কাউকে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য যা করার প্রয়োজন তা-ই করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক এমপি আউয়ালের নাম আসলেও এ ঘটনার সাথে আরেক আবাসন ব্যাবসায়ীর নামও এসেছে। এছাড়া পল্লবী এলাকায় বিভিন্ন অপকর্মের হোতাদের গডফাদার হিসেবে এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামও উঠে এসেছে। এই দুজন ছাড়াও আড্ডু নামে এক বিহারি যুবকের নামও এসেছে। নজরদারিতে রাখা হয়েছে এদের সবাইকেই। এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুমন। তিনি এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত। তবে এই সুমনের উপরে সাড়িতে আছে আড্ডু। পল্লবী এলাকায় আউয়ালের মতো ভূমিদস্যুদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করা সুমনকে শেল্টার দিত আড্ডু। আবার আড্ডুকে শেল্টার দিত স্থানীয় এক কাউন্সিলর। এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, বস্তি, অবৈধ দোকান, চাঁদাবাজিসহ সুমনের বিভিন্ন অবৈধ আয়ের একটি ভাগ দিতে হতো আড্ডু এবং ওই কাউন্সিলরকে। আড্ডুর সাথে স্থানীয় অসাধু কিছু পুলিশের বিশেষ সখ্য ছিল। আর সুমনকে প্রশাসনিক শেল্টার দিত আড্ডু। আউয়াল এবং আরেকটি আবাসন কোম্পানির পক্ষে পল্লবীর ওই এলাকায় জমি নিয়ে অনেকবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল সুমনের বাহিনী। এসব ঘটনায় মামলা হলেও কৌশলে সেসব মামলার ধারা দুর্বল করে দেওয়া হতো। অনেক সময় নির্যাতনকারীদের পক্ষে মামলা করে উল্টো ভুক্তভোগীদের করা হতো হয়রানি।

নিহত সাহিনুদ্দিন ও তার ভাই মাইনুদ্দিনের বিরুদ্ধে গত ঈদুল ফিতরের আগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে আউয়ালের আবাসন কোম্পানি হ্যাভেলির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। ওই মামলায় তাদের গ্রেপ্তারও করা হয়। কয়েকদিন জেল খেটে জামিনে ছাড়া পায় এই দুই ভাই। 

সাহিনুদ্দিনের মা আকলিমা জানান, এর আগেও আউয়াল তার বাহিনী দিয়ে সাহিনুদ্দিনকে খুন করতে চেয়েছিল। গুরুতর আহত অবস্থায় বেঁচে যায় সে। মামলা করলেও অপরাধীদের সাজা হবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা (আউয়াল) খুব প্রভাবশালী। টাকা দিয়ে সব ম্যানেজ করে নিবে তারা। ইতোমধ্যে সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আকলিমা আরো জানান, সাহিনুদ্দিনের দাদা মো. আলীর নামে ওই এলাকার নাম হয় আলীনগর। মো. আলীর ওই এলাকায় অনেক জমি ছিল। তিনি দুই বিয়ে করেছিলেন। দুই ঘরে ১৪ জন সন্তান আছে। সন্তানদের অনেকে তাদের জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। তারাও (সাহিনুদ্দিন) চাচ্ছিলেন কিছু জমি বিক্রি করতে। এজন্য হ্যাভেলির মালিক আউয়ালের সঙ্গে তাদের কাঠা প্রতি ৩০ লাখ করে কথাও হয়। কিন্তু আউয়াল পরবর্তীতে তার কথা রাখেননি। তিনি উল্টো তাদের জমি জোর করে দখল করে বিক্রি করতে থাকেন। এ নিয়ে অনেকবার সাহিনুদ্দিন ও তার ভাই বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আউয়ালের ক্যডার তার বাহিনী দিয়ে দুই ভাইয়ের ওপর হামলা করেছিল।

পল্লবীতে জমি নিয়ে খুন-গুমের ঘটনা অগেও ঘটেছিল বলে জানান স্থানীয়রা। এখানকার এক জমির মালিক জানান, ছয়-সাত বছর আগে মোমিন বকশ নামে একজনকে হত্যা করা হয়। সাহিনুদ্দিনের আরেক অংশীদার বানেছা বেগম রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ আছেন বছর চারেক আগে। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তার জমির ওপর এখন  আউয়ালের আবাসন কোম্পানি হ্যাভেলির সাইনবোর্ড ঝুলছে।

এদিকে এখন পর্যন্ত নৃশংস এ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক এমপি আউয়ালের পাশাপাশি তার ম্যানেজার আবু তাহের ও মো. টিটুর নাম উঠে এসেছে। তারা মিশন সম্পন্ন করার জন্য সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুমন ব্যাপারি ওরফে কিলার সুমনকে দায়িত্ব দেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাহিনুদ্দিনকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি ও হত্যাচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এবার তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে সেখানকার আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ত প্রভাবশালী দুটি গ্রুপের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছিলেন সুমন। হত্যা মিশন সফল করতে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা করে সুমন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত রোববার কৌশলে সাহিনুদ্দিনকে পল্লবীর ১২ নম্বরের ডি ব্লকে ৩১ নম্বর রোডে ডেকে নিয়ে তার ৭ বছর বয়সী ছেলের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে তারা।

ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলার পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়ালসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত অন্যতম দুই ঘাতক ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মানিক গত বৃহস্পতিবার এবং মনির গত শনিবার পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় বলে দাবি করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আউয়াল, হাসান, জহিরুল ইসলাম ওরফে বাবু, শরিফ, টিটু ও ইকবাল বর্তমানে পুলিশ রিমান্ডে আছেন। সাবেক এমপি আউয়াল তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব ছিলেন। মহাজোটের অংশ হিসেবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। পরে তাকে তরিকত ফেডারেশনের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে তিনি ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টি নামে নতুন একটি দল গঠন করেন।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads