নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ওপর দিয়ে বয়ে চলা নদ-নদী গুলোতে এক সময় বছর জুড়ে পানিতে থই থই করতো। এখন নদীর বুক চিড়ে হচ্ছে নানা জাতের ফসল। বেসরকারি সংগঠন রিভারাইন পিপল এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেলায় নদীর সংখ্যা ৩৪টি। তবে নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছেন, জেলা ২৪ টি নদ-নদী রয়েছে। যার পরিমাণ এক হাজার ৪৪০ কিলোমিটার।
এসব নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় প্রভাবশালীরা দখল করে চিনা বাদাম, কুমড়া, ভূট্টা ও ধান চাষ, মাছের পুকুর, দোকান পাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সেতুবিহীন কাঁচাপাকা সড়ক তৈরি করা হয়েছে। নদীকে নির্যাতন করা হচ্ছে। ফলে নদীর উপকারিতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকাবাসী। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না থাকায় দখল ও দূষণের কবলে পড়ে নাব্যতা হারিয়েছে। বিশেষ করে স্থাপনা নির্মাণ ও চাষাবাদের জন্য নদী দখলের চলছে প্রতিযোগিতা।
নদী গুলো হলো, তিস্তা নদী, বুড়ি তিস্তা, যমুনেশ্বরী, চাকলা নদী, খড়খড়িয়া, দেওনাই, চারালকাটা, চারানদী, বুড়িখোড়া, প্রমত্তা, ধুমনদী, বামনডাঙ্গা, পাঙ্গানদী, কুমলাই, নাউতারা, ইছামতি, কলমদার, বুল্লাই, শালকি, খেরকাটি, চারানদী, খেড়–য়ানদী, চিকলি, চেকাডারা, আউলিয়াখানা, সর্বমঙ্গলা,ধুমনদী, ধাইজান, দেওনাই শাখাসহ ৩৪ টি নদী।
জেলা সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালীপাড়া গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িখোড়া নদী। এর উৎপত্তিস্থল জেলার ডোমার উপজেলার কলামদার গ্রাম থেকে। দৈর্ঘ্য ৫০ কিলোমিটার এর প্রস্থ ২৬ ফুট। বহুল আলোচিত ওই নদীর, বুদারুর ঘাট, কদমতলী, হরহরিয়ার ঘাট ও সন্ন্যাসীর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদীতে চাষ হচ্ছে ভূট্টা ও বোরো ধান।
ওই গ্রামের বুড়িখোড়া নদীর বুদারুর ঘাটের কৃষক রমেশ চন্দ্র রায় (৬৮) ও বিশ্বনাথ রায় (৭০) বলেন, ‘সন্ন্যাসীর ঘাট, কদমতলী ও বুদারুর ঘাট দিয়ে এক সময় চলতো পাল তোলা নৌকা। নৌকায় বাণিজ্য করতে আসতো দেশ বিদেশ থেকে সওদাগররা। এখন আর সেসব দৃশ্য চোখে পড়েনা। নদী তলদেশ ভরাট হওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় অনেকে ভূট্টা, মিষ্টি কুমড়া ও বোরো ধানের চাষ করছে। আবার সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় বাড়ী ঘর। নদীতো নয় যেন ফসলি জমি।’
জেলার ডোমার উপজেলার কেতকি বাড়ী গ্রাম থেকে যমুনেশ্বরী নদী উৎপত্তি হয়ে গোমনাতি, বামনিয়া, বোড়াগাড়ী, মটুকপুর ও ধর্মপাল হয়ে চলে যায় দক্ষিণে। এর দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার ও প্রস্থ ছিল ৫৫ ফুট। বর্তমানে নদীর বুকে ধান মাড়াইয়ের চাতাল তৈরী করেছে স্থানীয় গৃহস্থবাড়ীর কৃষকরা।
ওই নদী পাড়ের কৃষক আজমিনুর রহমান (৬৭), মিজানুর রহমান (৬৮) জানান, এক সময় নদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ ছিল। গ্রামের ছেলেরা বৈশাখ জৈষ্ঠ মাসের গরমে নদীর পানিতে হাবুডুবু খেত, এখন পানী নাই সেই দৃশ্যও চোখে পড়ে না। এছাড়াও নদীর পানি দিয়ে চলতো চাষাবাদ। এখন নদীতে নেই জলজ প্রাণী। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র। দেখা দিয়েছে বন্যা, খড়া, গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষসহ পশুপাখি।
তিনি জানান, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে নদীগুলো খনন করা হলেও তা কৃষকের কাজে আসছে না। নদীগুলো শুকিয়ে মাটি চৌঁচির হয়েছে। এছাড়াও, নদীর দুই ধারে যাদের জমি, বসতবাড়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে তারাই গিলে খাচ্ছে এসব নদী।
জেলা শহরের নিউবাবু পাড়ার সিরাজুল ইসলাম (৬৮) বলেন, শহর ঘেঁষে বয়ে গেছে আরেকটি নদী বামনডাঙা। সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয় এটির। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৫০ কিলোমিটার এর প্রস্থ ২২ ফুট। এই নদীর তীরেই একসময় গড়ে উঠেছিল শাখামাছা বন্দর। দূরদূরান্ত থেকে নদীপথে চলাচল করতো বড় বড় মালবাহী নৌকা। ওই সময় জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান বন্দর ছিল এটি। এখন চাষ হচ্ছে নানা জাতের ফসল, পরিণত হয়েছে খেলার মাঠ ও সরকারি বেসরকারি নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
জেলার ডিমলা উপজেলার পুর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেশর নামক স্থানে উৎপত্তি হয় কুমলাই নদী। ওই নদী পারের বাসিন্দা শাহের আলী (৬৩) নদী ভরাট করে উপজেলার শুটিবাড়ী বাজারে পাঁচটি দোকান করার কথা শিকার করে বলেন,আমার দোকান গুলো কুমলাই নদীর ওপর। সামনে মহিলা মার্কেটও নদীর ওপর।
একই এলাকার ছাবের আলী (৬৮), আব্দুর রহমান (৭০) জানান, তারা বলেন, গয়াবাড়ী আদর্শ দ্ধিমুখি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি কুমলাই নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি অল্প কিছুদিন আগেই নির্মাণ করা হয়।
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান জানান, ‘ছোট বড় মিলে জেলায় ১ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার নদ-নদী রয়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থ বছরে এসব নদী শতকরা ৬৫-৭০ ভাগ খনন করা হয়েছে। একারণে গত বন্যায় প্রভাব পড়েনি মানুষের জানমালের ওপর। পরবর্তীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দেশে আলোচিত নদী নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন রিভারাইন পিপল এর পরিচালক ও রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ জানান, ‘বর্তমানের নদীখেকোদের কারণে নদী গুলো মরণাপন্ন।
২০১৯ সালে দেশের উচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। এতে নদীকে হত্যা করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও গণ্য করা হয়। তিস্তা নদীর আন্তশাখা এই নদীর দৈর্ঘ্য ২৫ কিলোমিটার। খালিশা চাপানি ও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব খড়িবাড়ী ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা নদীতে আবার মিলিত হতো।
তিনি বলেন, কুমলাই নদীতে ২৭০ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। তাদের স্থাপনা উচ্ছেদ, সীমানা চিহ্নিত করণ, নদীটির পুরোনো প্রবাহপথ সচল করা, নদীর উপর থেকে স্কুল কলেজ সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তর এবং নদীর অবৈধ দখল, খাজনা খারিজ, ক্রয় বিক্রয়, রেকর্ডভুক্ত করার কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন তিনি।





