অলোক আচার্য
অং সান সু চি গণতান্ত্রিক বিশ্বে একটি নন্দিত নাম। বহু বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা, সংগ্রাম করা এক মুখচ্ছবি, একজন আপসহীন নেত্রী অং সান সু চি। নিজ দেশের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অনবরত লড়াই করা এই নেত্রী সারা বিশ্বেই তার ভূমিকার জন্য ছিলেন প্রশংসিত। তার জন্য বিশ্বের প্রতিটি কোণেই ছিল সহমর্মিতা এবং সমর্থন। মাত্র কয়েকদিন আগে সেদেশের সেনাবাহিনী একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দেশটিতে আগামী এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ফের সেনাশাসনের সূচনা হলো। গণতন্ত্র ধরে রাখার জন্য লড়াই করা এ নেত্রী ১৯৮৯ সাল থেকে ২০১০ এই ২১ বছরের ১৫ বছরই গৃহবন্দি অবস্থায় কাটান। এ সময় তিনি ক্রমেই বিশ্বে গণতন্ত্রের একজন অনুসরণীয় মানুষ হয়ে ওঠেন, যা বিশ্বজুড়ে তার গ্রহণযোগ্যতাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে; সেই সঙ্গে নিজ দেশে তাকে মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে। তার এই জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় তিনি তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নোবেলসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনে সু চি’র দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলে টানা পাঁচ দশকের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনেও তার দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সেনাবাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নির্বাচনে প্রতারণা ও ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছিল শুরু থেকেই। তারপর থেকেই দেশটিতে এনএলডি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তিনি আবার গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, যে সময়টুকুতে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন সেই সময়ে তিনি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছেন বা কাজ করা সম্ভব হয়েছে? কারণ এই সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু বিশ্বের সামনে আসে এবং নন্দিত সু চি যিনি মানবতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এবং অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, তার ভূমিকা বিতর্কিত হতে থাকে।
গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রামের জন্য সারা বিশ্বেই অং সান সু চি প্রশংসিত ছিলেন। এখন যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা যাওয়ার ফলে গণতন্ত্র বিদায় নিয়েছে, তাহলে রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে আলোচনা বা তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি বা সে সম্পর্কিত কার্যক্রম চলে আসছে, তার কী হবে? ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়টি আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো। রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিয়ে অং সান সু চির ভূমিকা ছিল বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। কৌশলগত কারণেই হোক আর অন্য যে কোনো কারণেই হোক, সেদেশের সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এই নির্মমতায় তিনি কার্যকর কোনো ভূমিকা নেননি অথবা তিনি নিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত এই আপসের ফল কিছুই হলো না। অথচ একসময় ছিল গণতন্ত্রের জন্য লড়াই তা বহু প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও। এমনকি এই ইস্যু নিয়ে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমালোচিত ছিল। গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী বলে একসময় পরিচিত মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের গৃহবন্দি নেত্রী অং সান সু চির কার্যক্রমের জন্য, গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করার জন্য একসময় বিভিন্ন দেশ থেকে বহু পদক পেয়েছিলেন। এসব পদক দেওয়া কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার নেতিবাচক ভূমিকার জন্য এগুলো কেড়ে নেওয়া হয় এবং কিছু পুরস্কারও ফিরিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশ্বে তার ভূমিকা বিতর্কিত হতে শুরু করে যা কোনোদিন তার লক্ষ্যে প্রকাশ পায়নি। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য মিয়ানমারে সু চি ছিলেন জনপ্রিয় নেত্রী। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনার দীর্ঘদিন হয়ে গেছে। এত আলোচনার পরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন কার্যক্রম শুরুই করা যায়নি। রোহিঙ্গাদের জন্য কঠিন সময় বাংলাদেশ পার করছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়ংকর সহিংসতা শুরু করার পর থেকে রোহিঙ্গারা ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। মানবতার দিক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়। বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে এসব রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়। তারপর থেকেই এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের আশ্রয়ে রয়েছে। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও তা শুরু করা যাচ্ছে না। এ ঘটনা যখন শুরু হয়েছিল তখন সু চির দল ক্ষমতায়। যেহেতু তিনি ক্ষমতায়, তাই সেই পরিস্থিতির দায় তিনি এড়াতে পারেন না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশে বসবাসরত সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে সময় মিয়ানমার তা করেনি। তার পরিবর্তে রাখাইনে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এখন সু চি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তা সহসাই কাটবে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে আমদানি ও রপ্তানি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। মামলার নথি থেকে জানা গেছে, নেপিডোতে তার বাড়িতে তল্লাশি চালানোর সময় পাওয়া ওয়াকিটকি যা বিনা অনুমতিতে ও অবৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে।
অং সান সু চি আজীবন গণতন্ত্রের জন্যই লড়াই করে গেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বিতর্কিত হয়েছেন ব্যাপকভাবে, যা আন্তর্জাতিক মহলে সবসময়ই সমালোচিত হয়েছে। রোহিঙ্গারা আজ বাংলাদেশে আশ্রিত। তাদের ফেরানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সু চি আজ নিজেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। নন্দিত সু চি রোহিঙ্গাদের ওপর করা নির্যাতনের জন্যই সমালোচিত, নিন্দিত।
লেখক : সাংবাদিক
sopnil.roy@gmail.com





