সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
নারায়ণগগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে এবারই প্রথম তাদের স্থান দেয়া হয়েছে। তুলার দুষ্প্রাপ্যতা, লোকবলের অভাব উন্নত প্রযুক্তির মেশিনারিজের প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে হারিয়ে যেতে বসেছে কুমিল্লা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড়। দেশের লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের মধ্যে এটিও একটি। পা চালিত খাদের তাঁতে হাতে তৈরি খাদি কাপড়ের চাহিদা কিছুটা থাকলেও মজুরি তেমন না পাওয়ায় খাদি কাপড় তৈরি থেকে সরে যাচ্ছে কারিগরেরা। আরও নানাবিধ কারণে এটি অস্তিত্ব হারাচ্ছে।
অখণ্ড ভারতে ব্রিটিশবিরোধী মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে দ্রুত বিস্তার ও জনপ্রিয়তা অর্জন করা চরকায় সুতা কাটা স্বহস্তে তৈরি স্বদেশী সেই খাদি শিল্প এখন হারিয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহ্যের পরিচিতি প্রসারে নারায়ণগগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে এবারই প্রথম তাদের স্থান দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে কারুপণ্য প্রদর্শনী গ্যালারির পূর্বদিকে গেলে দেখা যায় কুমিল্লা থেকে আসা খাদি কাপড়ের স্টল। সেখানে বসে খাদি কাপড় বুননের কাজ করছেন চিন্তাহরণ দেবনাথ। পাশে বসে সহযোগিতা করছেন মেয়ে ববিতা রানী বিশ্বাস ও নাতনী অনন্যা বিশ্বাস। স্টলে সাজানো রয়েছে পায়ে চালিত খাদের তাঁতে তৈরি গায়ের চাদর, ওড়না, ফতুয়া, পাঞ্জাবি ও বিছানার চাদর। ঐতিহ্যবাহী খাদির এই স্টলে পর্যটক আসলেও ক্রেতা তেমন নেই বললেই চলে। লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে ঢাকা, কুমিল্লা ও রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক, সাংবাদিক সাহিত্যিক শাহ জালাল, কন্ঠশিল্পী মনিরা আক্তার, বর্ষা ইসলাম, শিক্ষার্থী রাজন, সৌমেন ও রাজশ্রীসহ কয়েকজন জানান, প্রাচীনকাল থেকে এই উপ-মহাদেশে হস্তচালিত তাঁতশিল্প ছিল জনবিখ্যাত।
মহাত্মা গান্ধী যখন ১৯২০ সালে স্বদেশী আন্দোলনে বিলেতী পণ্য বর্জনের ডাক দেন মূলত সেই সময়ে খাদি কাপরের জনপ্রিয়তা ও বিস্তার লাভ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী কুমিল্লায় আসেন এবং সেখানে স্বহস্তে চরকায় সূতা কাটা ও তাঁতে খাদি কাপর বুননের দিকনির্দেশনা দেন। তখন থেকে কুমিল্লার চান্দিনা, ময়নামতি, গৌরীপুর, দেবীদ্বার ও বুড়িচংসহ কয়েকটি এলাকার দেবনাথ (যুগী) পরিবার পুরোদমে শুরু করেন খাদি কাপর বুননের কাজ। তারা তৈরি করেন লুঙ্গি, গামছা, শাড়ি, ওড়না ইত্যাদি। তখন থেকে দেশে কুমিল্লার খাদি কাপড় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে খাদের তাঁতে বুনন করা মোটা খাদি কাপড় পাওয়া যায় না।
মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে কুমিল্লার চান্দিনা থেকে খাদি কাপড়ের প্রদর্শনী নিয়ে আসা ববিতা রানী বিশ্বাস জানান, বংশ পরম্পরায় খাদি কাপড় বুননের কাজ করেন তারা। বাবা চিন্তাহরণ দেবনাথ খাদি কাপড় বুনেই সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে পাওয়ারলুম আর উন্নত যন্ত্রপাতির তৈরি চিকন সুতার কাপড়ে বাজার হারিয়েছে খাদি কাপড়। তার স্বামী অমর বিশ্বাস ও মেয়ে অনন্যা বিশ্বাস জানান, রাঙামাটির তুলা থেকে চরকায় সুতা কেটে মাটিতে খোঁড়া খাদে বা গর্তে পায়ে প্যাডেল চালিয়ে হাতে বুনন করা হয় খাদি কাপড়। বর্তমানে তুলার দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে। এছাড়া সারাদিন খাদি বুননের কাজ করে কারিগরেরা মজুরি পান ৩শ' থেকে ৪শ' টাকা, যা দিয়ে তাদের সংসার চালানো সম্ভব হয় না। তাছাড়া মেশিনে তৈরি নকল খাদি বাজার দখল করায় খাদের খাদি কাপড় বাজার পাচ্ছে না। চিকন সুতার চেয়ে মোটা সুতার খাদি কাপড়ের দাম বেশি। চরকায় কাটা সুতায় হাতের তাঁতে তৈরি কুমিল্লার খাদি এখন দুর্লভ।
BK-MA





