ফিচার

নিভৃতচারী শিল্পগুরু

  • সালেহীন বাবু
  • প্রকাশিত ২৭ জুন, ২০২১

এদেশে শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ প্রচারবিমুখ, প্রচ্ছন্নে থাকা একজন মানুষ। সফিউদ্দীন আহমেদ চল্লিশ দশকের মধ্যপর্যায়ে ভারতবর্ষের চিত্রকলা জগতের উদীয়মান উজ্জ্বল পরিচিত নাম। তেলরং, উড এনগ্রেভিং, এচিং, একুয়াটিন্ট, ড্রাই পয়েন্ট সব মাধ্যমেই তাঁর সাফল্য চোখে পড়ার মতো। তিনি শিল্পকলা রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন সহজেই।

কোলকাতা ভবানীপুরের সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে শিল্পীর জন্ম। ১৯২২ সালের ২৩ জুন। ১৯৩৬ সালে কোলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। ভর্তি হয়ে কাজে মন বসাতে পারছিলেন না। শিক্ষক আব্দুল মঈন এগিয়ে এলেন। কাজে উৎসাহ দিলেন, সাহায্য করলেন। এইভাবে সহযোগিতা পেয়ে ছবি আঁকায় উৎসাহ বাড়লো। এরপর সফিউদ্দীনকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। ১৯৪২ সালে শিক্ষাজীবন শেষ হয়। এরপর ১৯৪৪ সালে টিচারশিপ পড়ার জন্যে ভর্তি হন একই স্কুলে। শিক্ষক হিসাবে পান রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে। শিক্ষক রমেন চক্রবর্তীর উৎসাহে ছাপচিত্রে উৎসাহী হয়ে উঠেন শিল্পী সফিউদ্দীন। এই সময়েই আমরা উড এনগ্রেভিং, এচিং, ড্রাই পয়েন্ট এই তিন মাধ্যমে তাঁর করা অসাধারণ কিছু কাজ দেখতে পাই। আব্দুল মঈন ও রমেন্দ্রনাথ ছাড়াও অসাধারণ আরো কিছু শিক্ষককে তিনি পেয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন পশ্চিমের শিক্ষায় শিক্ষিত এবং দীর্ঘদিন বিলেতে থাকা শিক্ষক ও অধ্যক্ষ মুকুল দেসহ বসন্তকুমার গাঙ্গুলী, অতুল বসু, প্রহ্লাদ কর্মকার প্রমুখ। কোলকাতা আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ পদে যোগ দিয়ে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিলেবাসে বিরাট এক পরিবর্তন আনেন, করেন সময় উপযোগী। সফিউদ্দীনের স্মৃতিচারণে এই সব শিক্ষকের কথা ঘুরেফিরে বারবার আসে।

আর্ট স্কুলে শিক্ষাগ্রহণকালে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন অগ্রজদের কাজ আর বেঙ্গল স্কুলের প্রভাবসঞ্চারী স্বতন্ত্র চিত্রভাষা। এদের পদচারণা প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে। সে সময়ে ভারতবর্ষে ও পাশ্চাত্যে শিল্প ও সাহিত্যে স্বকীয় ভাষা ও মেজাজ নির্মাণের ভাঙাগড়া চলছিল, যা তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। আর নিজেকে গড়ার কাজে সবসময়েই সচেষ্ট থেকেছেন। ছাত্র অবস্থায় ছুটি পেলেই বন্ধুদের নিয়ে চলে গেছেন মধুপুর, দুমকা, গিরিডি, জেসিডি, চাইবাসা, সাঁওতাল এলাকায়। বিস্তৃত উঁচু-নিচু মাঠ, পাহাড়, বৃক্ষশোভিত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য তাঁকে আন্দোলিত করত। সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন, ছন্দময় প্রকৃতি তাঁকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল, যার জন্যে হয়তো সেই ছাত্র অবস্থা থেকে ১৯৪৬-৪৭ পর্যন্ত বারবার তাঁকে ওই সব অঞ্চলে চলে যেতে হতো। এই সময়ে এবং পরবর্তী কিছু সময়েও তাঁর আঁকা তেল রং, উড এনগ্রেভিং, এচিং, ড্রাই পয়েন্টে এসব অঞ্চল ঘুরে-ফিরে এসেছে।

শিল্পী সফিউদ্দীন সার্থক চিত্রকর ও প্রিন্ট মেকার তো অবশ্যই, সেই সাথে অসাধারণ সংবেদনশীল একজন সার্থক শিক্ষকও। তাঁর সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি প্রত্যেক ছাত্রই ক্লাসে তাঁর কাছে ছিল সমান। ক্লাস বা পরীক্ষার নম্বর দেবার সময় জানতেও চাইতেন না এটা কার কাজ। একবার দেখেও তৃপ্ত হতেন না। পরের দিন আবার কাজগুলো বিছাতে হতো, আবার দেখতেন। তাঁর সব কিছুই নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা ছিল।

১৯৪৬ সাল তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় দিন। কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে শিক্ষক হিসাবে যোগ দিলেন। জীবনের নতুন একটি ধাপে পা রাখলেন। সেখানেও তাঁর একাগ্রতার স্বাক্ষর রাখলেন। সেই ছেচল্লিশ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সোমনাথ হোর থেকে শুরু করে এ বাংলার সব নামি-দামি শিল্পীই তাঁর ছাত্র ছিলেন।

শিল্পী সফিউদ্দীন উড এনগ্রেভিং ও এচিং-এর জন্যে বিখ্যাত হলেও তিনি কিন্তু প্রথম কাজের সম্মান পেয়েছিলেন তেলচিত্রে। ছাপচিত্রের পাশাপাশি তেল রং-এও কাজ করে যাচ্ছিলেন। তেল রং-এ ইমেপ্রশনিস্টদের ছাপ পাওয়া যায়। ‘শালবন’, ‘দুমকা’, ‘সূর্যালোকে কুটির’, ‘দুমকা-১’, ‘দুমকা-২’, ‘জড় জীবন’, ‘দিলীপ দাশগুপ্তের প্রতিকৃতি’ এই কাজগুলো সবই ছেচল্লিশের দিকের করা। বাহান্নর ‘ধানঝাড়া’ বা ছাপ্পান্নর ‘সূর্যমূখী’ও এই ধারার। দুমকার অসংখ্য স্কেচে ওদের সরল সাচ্ছন্দ্য জীবন, আকাশ ছোঁয়া প্রান্তর আর অপরূপ সাজের ছন্দময় প্রকৃতি এত আলোড়িত করেছিল যে স্কেচগুলো তাঁর শিল্পীজীবনে সৃষ্টিশীলতায় নবজোয়ার এনে দিয়েছিল। যার প্রতিফলন তাঁর একুয়াটিন্ট ড্রাই পয়েন্টে দেখতে পাওয়া যায়। উড এনগ্রেভিং-এও সেই একই বিষয় আছে, কিন্তু মাধ্যমের কিছু ব্যবধানের কারণে, বাধ্যবাধকতায় কিছুটা ভিন্ন রূপ পেয়েছে। কিছু আছে আলোছায়ার খেলা।

১৯৪৫-এ ‘কবুতর’ (একুয়াটিন্ট মাধ্যমে) ছবির জন্যে পেয়েছিলেন একাডেমি প্রেসিডেন্টের স্বর্ণপদক। একাডেমি অব ফাইন আর্টস থেকে ১৯৪৬ সালে একুয়াটিন্টের জন্যে আরো একটি পুরস্কার। ১৯৪৬ সালে বিহার শিল্পকলা পরিষদ আয়োজিত প্রদর্শনীতে তখনকার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। দ্বারভাঙ্গা মহারাজা এ পুরস্কারটি প্রবর্তন করেছিলেন। দুই বছরে এতগুলো পুরস্কার তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। এই অর্জনের কারণে তাঁকে ১৯৪৬-৪৭ সালে অল ইন্ডিয়া আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস সোসাইটির কাউন্সিলর সদস্য করা হয়। দিল্লীতে সোসাইটির মূল কেন্দ্র ছিল। এটাও তাঁর জীবনের একটা বিরল অর্জন।

প্যারিসের মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামে বিশ্বের ৪৪টি দেশের বাছাই করা শিল্পীদের কাজ নিয়ে ইউনেস্কো আয়োজন করেছিল এক প্রদর্শনীর, ১৯৪৬ সালে। ভারতে প্রথিতযশা শিল্পীদের মধ্য থেকে তাঁর তিনটি বা চারটি কাজও প্রদর্শিত হয়েছিল এই প্রদর্শনীতে। পিকাসো, ব্রাক, মাতিস, শাগাল এই সব মাস্টার শিল্পীদের কাজও এই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছিল। ভারতবর্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, গগণেন্দ্রনাথ, রামকিংকর, যামিনী রায়, অমৃতা শেরগীলসহ জয়নুল আবেদিন ও সফিউদ্দীন আহমেদের কাজ প্রদর্শিত হয়েছিল। এই সময় অধ্যক্ষ অতুল বসু লেখায় এক অংশে উল্লেখ করলেন ‘নবীন শিল্পীদের মধ্যে সফিউদ্দীন আহমেদ ইতিমধ্যেই ভারত ও বহির্বিশ্বে নিজের জন্যে এক মর্যাদার আসন করে নিয়েছেন।’ ১৯৪৮ সালে লন্ডনের রয়েল একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হলো খৃস্টপূর্ব ২৪০০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের শিল্পকলার প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে সফিউদ্দীনের উড এনগ্রেভিং ‘সাঁওতাল রমণী’ দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকায় সফিউদ্দীনের উড এনগ্রেভিং ‘সাওতাল রমণী’ সম্পর্কে লেখা হলো-‘শুধু একটি রসপুষ্ট চিত্রই নয়, মহৎ শিল্পসম্পদের রূপবান নিদর্শন।’

দেশবিভাগের পর ঢাকায় চলে এলেন। কোলকাতা আর্ট স্কুলের আরো দুইজন শিক্ষক জয়নুল আবেদিন ও আনোয়ারুল হক চলে এসেছেন। সেদেশের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে। এসেছেন কোলকাতা আর্ট স্কুলের উড এনগ্রেভিং-এর শিক্ষক হাবিবুর রহমান, আর্ট স্কুলের শিক্ষা শেষ করে কামরুল হাসান, ড্রাফটসম্যান আলী আহসান। শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সবার সহযোগিতায় ও উদ্যমে ১৯৪৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হলো ‘গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্ট’। এদেশে চিত্রকলাচর্চার আন্দোলনের শুরু হলো। সবাই ব্রত হিসাবে নিলেন শিক্ষকতাকে। সফিউদ্দীন আহমেদ ছাপচিত্র বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলেন। এই তো ২০০৩ সালেও একাশি বছর বয়সে ছাপচিত্র (প্রিন্ট মেকিং) বিভাগে তাঁকে দেখা যেতো। তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে নিবিষ্ট মনে ছাত্রদের কাজ শেখাচ্ছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন, কাজ নিয়ে আলোচনা করছেন। এদেশে যারা এখন শিল্পকলার চর্চা করছেন তাদের সবারই শিক্ষক তিনি।

উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের জন্যে ১৯৫৬ সালে প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর পড়তে লন্ডন গেলেন। এতদিন উড এনগ্রেভিং করেছেন, সেখানে শুরু করলেন মেটাল এনগ্রেভিং। লন্ডনেও ছাপচিত্রের শিক্ষকের কাছে পেয়েছিলেন যথেষ্ট সহযোগিতা, ভালোবাসা। এই শিক্ষকের নাম মেলিন ইভান্স। তিনি ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত প্রিন্ট মেকার স্টেনলি হেটারের ছাত্র। এচিং একুয়াটিন্টের সাথে যোগ হলো মেটাল এনগ্রেভিং।

১৯৫৪ সালের ভয়াবহ বন্যার দুঃসহ অভিজ্ঞতা তাঁর হূদয় মনে গভীর ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। বন্যার কারণে জলবন্দি হয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। খাটের ওপর বসে দেখেছেন পানির প্রবাহ। পানির ঢেউ। সেই পানিতে মাছের আনাগোনা, ঘরের বাইরে দেখেছেন নৌকা, এসব কিছুই তাঁকে আলোড়িত করেছে। কাজেও এর প্রভাব পড়েছে ধীরে ধীরে। বন্যার অভিজ্ঞতা, পানির ঢেউয়ে মাছের বিচরণ এসব কিছু মিলে তাঁর কাজে এলো বিরাট পরিবর্তন।

১৯৫৬-৫৭ থেকে কাজের এই পরিবর্তন ১৯৬৫-৬৬ পর্যন্ত লক্ষ করা যায়। এ সময়ে ক্রমান্বয়ে তাঁর কাজে বদল এসেছে ঠিকই, কিন্তু বিষয় সেই বন্যায় দেখা মাছ, বহমান পানি, নৌকা এসবই ছিল। এনগ্রেভিং ছাড়াও এচিং একুয়াটিন্টের ব্যবহারও দেখতে পাই তাঁর এ সময়ের ছাপচিত্রে। এ সময়ে তাঁর করা পেইন্টিংয়েও একই স্টাইলের প্রভাব। বিষয় নির্বাচনও মোটামুটি একই রকম ছিল। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এ তাঁর কাজের কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ৯০-এ করা কালো সিরিজের কালি, চারকোল, জলরঙে আঁকা ছবিগুলোয় বিরাট এক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ভাবতে অবাক লাগে এ বয়সেও তিনি তাঁর কাজে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন এনে চলেছেন। ১৯৬৩ তে চারুকলায় অবদানের জন্যে পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত ‘প্রেসিডেন্ট পদক’, ‘একুশে পদক’, ‘বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা’, ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন। কিন্তু শুধু এসব অর্জন দিয়ে মানুষটির বিচার করা ঠিক হবে না। উনি এর চেয়েও অনেক উঁচুমাপের একজন মানুষ, একজন শিল্পী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads