নৃশংস হয়ে উঠছে মানুষ

ছবি : সংগৃহীত

অপরাধ

নৃশংস হয়ে উঠছে মানুষ

  • আজাদ হোসেন সুমন
  • প্রকাশিত ২৮ জুলাই, ২০১৯

তুচ্ছ ঘটনায় নৃশংস হয়ে উঠছে মানুষ। সামান্য বিষয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে দেওয়া, নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যাসহ নানা ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা বাড়ছে। অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে একধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতার এসব ঘটনার বিস্তার ঘটছে।

সূত্র জানায়, প্রকাশ্যে চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতুকে তার সন্তানের সামনে হত্যার কোনো বিচার হয়নি। কুমিল্লায় ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী তনুর হত্যাকারীরা এবং চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকারীচক্রের সদস্যরাও রয়ে গেছে পর্দার আড়ালে। দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এসব ঘটনার নেপথ্য হোতাদের বিচার না হওয়ায় অন্যরাও অপরাধে উৎসাহিত হচ্ছে। এবং অপরাধ সংঘটনের পর এক ধরনের উন্মত্ত হোলি খেলায় মেতে উঠছে। এসব সংঘবদ্ধ অপরাধীর কারণে সমাজে অপরাধ এবং একই সঙ্গে সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। মানুষ প্রতিবাদ করতে ভুলে যাচ্ছে। এরও কারণ হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। এসব প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, সমাজে হিংস্রতা বেড়েছে। হিংস্রতা মানুষের তখনই বাড়ে, যখন মানুষের মধ্যে ইমোশন বা ভ্যালুজ কমতে থাকে। মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের সমাজ একসময় ঐতিহ্যবাহী আবেগপ্রবণ ছিল। কিন্তু সেই সমাজ এখন রুটলেস হয়ে গেছে। আমাদের এখন মায়া-মমতা কমে গেছে, আবেগ কমে গেছে। সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অসুস্থ মানসিকতায় যেকোনো মূল্যে যেকোনো কিছু পাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এসব কারণেই হিংস্রতা বা নৃশংস উপায় বেছে নিচ্ছে মানুষ।

সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, মানুষ যেখানে, অপরাধ সেখানে এটা রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু বর্তমানে অপরাধের ধরন বদলে গেছে। মানুষের জীবনের মূল্য এখন পশুপাখি, হাস-মুরগির জীবনের মতো। তুচ্ছ ঘটনায় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে প্রাণ। অথচ ১০ বছর আগেও এমনটা ছিল না বললেই চলে। এখন অহরহ ঘটছে নৃশংসতা। এর কারণ হচ্ছে হতাশা বেকারত্ব, মাদকের প্রসারসহ নানা কারণে মানুষ এখন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানায়, রমনা পার্ক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রেইন-এসব শব্দকে পর্নো ফুটেজের কোড নেম হিসেবে ব্যবহার করছে একশ্রেণির অর্থলোভী বিকৃত রুচির মানুষ। এসব ২০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। মেমোরি কার্ড, পেনড্রাইভ ইত্যাদি ডিভাইসে এগুলো হস্তান্তর হয়। এর প্রধান ক্রেতা স্কুল-কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীরা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে জব্দ করছে এ ধরনের ভিডিওসংবলিত বিপুল পরিমাণ মেমোরি কার্ড-পেনড্রাইভ। তবু থেমে নেই অসাধুচক্রের সদস্যরা। এসব ফুটেজের উৎস হচ্ছে তথাকথিত প্রেমিক-প্রেমিকারাই। এসব ভিডিও ফুটেজের একটিতেও জোর জবরদস্তি করে কেউ কাউকে এই ধরনের ভিডিও তৈরিতে বাধ্য করছে বলে অনুমিত হয় না। অর্থাৎ ফুটেজগুলোতে যাদের অংশগ্রহণ দেখা যায়, তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই এ ধরনের কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এগুলো পরবর্তী সময়ে কোনো এক পক্ষ জেদের বসে বা ব্যবসায়িক স্বার্থে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে, কখনো কখনো তৃতীয় কোনো পক্ষ এসব দৃশ্য গোপনে ক্যামেরা বন্দি করে বাজারে ছাড়ছে। যেসব পর্নো ভিডিও ফুটেজ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, তার চর্চা করে বর্তমান প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অংশ নিজেরাও বিকৃত রুচিসম্পন্ন হয়ে বেড়ে উঠছে এবং একপর্যায়ে এর প্রতি ফলন ঘটাচ্ছে নৃশংসতা ও ভয়াবহ অপরাধ সংঘটনের মধ্য দিয়ে।

গোয়েন্দা সংস্থাটির মতে, এ ছাড়া আরো একটি কারণ হচ্ছে মাদক—মাদক মানে ইয়াবা। ইয়াবা মুড়ি-মুড়কির মতো পাওয়া যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র। উদীয়মান তরুণ ও যুবসমাজের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক একটি অংশ ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এই মরণ নেশার টানে তারা যেকোনো ঘটনাকেও তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে করে। দু-চারটি ইয়াবা বড়ির কারণে নিজের বন্ধুকে খুন করা এবং ইয়াবার টাকা জোগাড় করতে বাবা-মাকে হত্যা করার ঘটনাও ঘটাতে তারা দ্বিধা করছে না। এ ছাড়াও মধ্যযুগীয় কায়দায় নৃশংস ঘটনা ঘটনোর পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক একটা যোগসাজশ থাকে। ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়া কোনো একজন ব্যক্তিকে ভয়ংকর করে তোলে। অতীতেও এ রকম ঘটনা দেখা গেছে। সেসবের পুনরাবৃত্তি চলছেই। এসবের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়া ও সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিকীকরণ সবচেয়ে বেশি দায়ী। প্রায় একযুগ আগে সূত্রাপুরে আওয়ামী লীগ নেত্রীর দুই ছেলে সুজন ও সুমন ডাবল মার্ডার করে সেই মৃতদেহ ১২ টুকরা করে বস্তাবন্দি করে ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল। এ ছাড়াও ক্ষমতার মোহে অন্ধ মহিলা আওয়ামী লীগের আরেক নেত্রী পিনুর ছেলে বখতিয়ার আলম রনি পাজেরো গাড়ি হাঁকিয়ে মদ্যপ অবস্থায় ফিরছিলেন। ইস্কাটন রোডে সিএনজি ও রিকশার গাড়ির সামনে পড়ে। এটাই তাদের অপরাধ। রনি আগ্নেয়াস্ত্র বের করে দুজনকেই গুলি করে হত্যা করে। সরকার এদের ছাড় দেয়নি। রনি, সুজন, সুমন কারাগারে আছে। তাদের মাতৃদ্বয় শত চেষ্টা করেও ছেলেদের আইনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেননি।

গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র আরো জানায়, কিশোর-কিশোরীরা তারা নিজেরাই নিছক আনন্দোচ্ছলে একে-অপরের এমনকি নিজেদের দেহের বিভিন্ন স্পর্শকাতর অংশের ছবি তুলে বন্ধুদের এমএমএস করছে। এসব ছবি একসময় বেহাত হয়ে তারাই আবার এর দ্বারা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের নির্মল আনন্দের স্থানগুলো দখল করে নিয়েছে এসব ভায়োলেন্স। আধুনিক হয়ে ওঠার নামে অনৈতিকতার প্রকাশ গভীর প্রভাব রেখে চলেছে। সদ্য ধনী পরিবারগুলোর জীবনাচরণের দিকে তাকালে অবস্থা কিছুটা বোঝা যায়। এ অবস্থার প্রভাব মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজেও কম নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বালাই নেই সমাজের কোথাও; এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটিও দখল করে নিয়েছে ঈর্ষা আর স্বার্থের দ্বন্দ্ব, যা আনন্দঘন একটি পরিবেশকেও করে তুলেছে রণক্ষেত্র। সেই সঙ্গে শিক্ষকের ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, সুশাসনের অভাব, পারস্পরিক দূরত্ব বৃদ্ধি, দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, সমাজে পেশিশক্তির প্রভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সর্বোপরি লাগামহীন অশ্লীলতাই আজকের তরুণ সমাজকে চরম অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী-অপরাধ বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads