নৌদুর্ঘটনার কান্না আর কতদিন

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

নৌদুর্ঘটনার কান্না আর কতদিন

  • প্রকাশিত ১৮ এপ্রিল, ২০২১

এস এম শাহাদাত হোসেন অনু

ˆকোস্ট গার্ডের উদ্ধারকর্মী যখন বলেছিল, ‘মা এবং মেয়ে একসাথে জড়িয়ে আছে, আমরা তাদের লাশ উদ্ধার করেছি, তাদেরকে আলাদা করিনি, একই কাপড়ে রেখেছি এই দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’ ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাবিত আল হাসান জাহাজের দুর্ঘটনার কথা। দুর্ঘটনা মানুষের জীবন এমনভাবে বিপর্যস্ত করেছে যে, সেটি কাটিয়ে ওঠা কতটা কষ্টকর যে ব্যক্তি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে সে-ই একমাত্র বোঝে। প্রাণী মাত্রই জন্ম ও মৃত্যু অবধারিত। তবে স্বাভাবিক মৃত্যু ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর মাঝে কিছুটা হলেও পার্থক্য বিদ্যমান।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের ৩৫ ভাগ যাতায়াত সম্পন্ন হয় নৌপথে। এই নৌপথেই লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর মারা যায় শত শত মানুষ। এ ধরনের দুর্ঘটনা নিয়মিত হলেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে খুব সামান্যই। এখনো প্রচুর লঞ্চ রয়েছে ফিটনেসবিহীন, জীবন রক্ষাকারী যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই অধিকাংশ লঞ্চে। এছাড়া দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েও এসব লঞ্চে যাত্রী পরিবহন করার অভিযোগ তো আছেই। প্রতিবছরই লঞ্চ দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। বেশিরভাগ রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। কিছু কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। দেখা গেছে, নৌ-দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে, তদন্ত করছে। কিন্তু ফল শূন্য। নৌ-দুর্ঘটনা থামছে না। আবার ছোট ছোট দুর্ঘটনাগুলো কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি বলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু এই দুর্ঘটনাগুলো যখন সংঘটিত হয়, তখন প্রচারমাধ্যম এবং সরকারসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনার ঝড় ওঠে। দুর্ঘটনাটি কেন হলো, এর পেছনে দায় কার? দুর্ঘটনার শিকার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে কে? এর দায়ভার কে নেবে? প্রশ্নগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবে; কিন্তু উত্তরগুলো খুঁজতে দিন শেষ হয়ে যাবে, যথার্থ উত্তর পাওয়া যাবে না। দুর্ঘটনাগ্রস্ত পরিবারকে ‘নামমূল্যে’ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। প্রতিনিয়ত এতগুলো মানুষ মারা যাচ্ছে, কারো লাশ পাওয়া যাচ্ছে, কেউ-বা থাকছে নিখোঁজ। কত আর্তনাদ, আহাজারি প্রিয়জনের শেষ দেহাবশেষটুকু পাওয়ার জন্য। নৌ-দুর্ঘটনাগুলো বেশিরভাগই জাহাজডুবির ঘটনা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবমতে, ২০১৯ সালে সারাদেশে লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে ১১৬টি। এর মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাক্কার কারণে ডুবেছে ৪৪টি জলযান। ‘জাতীয় নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ-২০১৭’ উপলক্ষে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি ‘৫০ বছরে নৌ-দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশের আয়োজন করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫০ বছরে দেশে নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ হাজার ৫০৮ জন। এর মধ্যে গত ১২ বছরের মধ্যে ২০০৭ সালে নৌ-দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৭ জন। বড় লঞ্চ দুর্ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ ২০১৪ সালে আগস্টের ৪ তারিখে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে মাওয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে পিনাক-৬ লঞ্চ ডুবে যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। লঞ্চটি শরীয়তপুরের কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া লঞ্চঘাটে যাচ্ছিল। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং প্রবল স্রোতের কারণে লঞ্চটি ডুবে যায় বলে ধারণা করা হয়। ১৯৯১ সালে তৈরি এমএল পিনাক-৬ লঞ্চটি শান্ত পানিতে চলাচলের জন্য সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সনদ দেয়। এতে যাত্রী ওঠার কথা ছিল সর্বোচ্চ পঁচাশিজন। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন এতে তিন থেকে চারগুণ যাত্রী বেশি ওঠানো হয়।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীর কয়লাঘাট এলাকায় কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ সাবিত আল হাসান। দুর্ঘটনার পর ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রীদের উদ্ধার না করে পালিয়ে যায় কার্গো জাহাজটি। ওই দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবছর এ ধরনের ছোট-বড় নানারকম লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। নৌ-দুর্ঘটনায় প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। টাকার পরিমাণ ছাড়াও যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার কি কোনো তুলনা হয়? পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী যখন চলে যায়, তখন ভেসে ওঠে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ। হতাশা নেমে আসে পরিবারে।

বাংলাদেশের নৌ-দুর্ঘটনার কারণগুলো নিয়ে কাজ করছে সোসাইটি অব মাস্টার মেরিনার্স। তারা লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য ১০টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- ১. চৌত্রিশ শতাংশ লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে; ২. পনেরো শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে মাস্টার-চালকের গাফিলতিতে; ৩. পনেরো শতাংশ ঘটে মাস্টারবিহীন চালনার জন্য; ৪. আট শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে চরায় আটকানো ও প্রবল স্রোতের কারণে; ৫. সাত শতাংশ চরে ওঠার কারণে; ৬. সাত শতাংশ বিরূপ আবহাওয়ার জন্য; ৭. তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ নির্মাণজনিত ত্রুটির জন্য; ৮. আগুন লাগা; ৯. পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকা; ১০. দুটি লঞ্চে সংঘর্ষের কারণে। যতগুলো দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম বিষয় হিসেবে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানোর বিষয়টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপরে উল্লেখিত অনেক বিষয়েই বিআইডব্লিউটিএ’র আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে বেশিরভাগ অর্ডিন্যান্স, অ্যাক্ট বা রুলই অনেক পুরনো এবং সময়োপযোগী নয়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পুরনো আইন সংস্করণ ও নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন। ছোট লঞ্চকে বড় লঞ্চ ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দিল, এটা স্বেচ্ছাচারিতা। তার মানে যারা লঞ্চ চালাচ্ছেন তারা দায়িত্বশীল ও যোগ্য নন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষভাবে গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে এরকম দুর্ঘটনা কথা আরো শুনতে হবে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে নদীর পাড়ে স্বজনদের আর্তনাদ আর শুনতে চাই না। দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য জাহাজের চালকদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সময় বাঁচানোর জন্য গাদাগাদি করে লঞ্চে বা স্পিডবোটে নদী পারাপার না করে, বেশি সময় নিয়ে হলেও ফেরি ব্যবহার করা যেতে পারে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না বলে দুর্ঘটনাও বন্ধ হচ্ছে না। দুর্ঘটনা ঘটার পর চালককে শাস্তি দিলেই শেষ হয়ে যায় না। এটাকে ফলোআপ করার জন্য মনিটরিং গ্রুপ গঠন করলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। সর্বশেষ কথা হচ্ছে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। জীবন না থাকলে পর্যাপ্ত সময় থেকে লাভ কী হবে। নিয়ম মেনে চলাচল করি, আধুনিক নিরাপদ জীবন গড়ি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads