রাজনীতি

আ.লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন

পদপ্রত্যাশীদের ‘আমলনামা’ প্রধানমন্ত্রীর কাছে

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য ও আমলনামা সংগ্রহ করেছেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও আস্থাভাজন কয়েক নেতার মাধ্যমে ইতোমধ্যে দলীয় প্রধানের কাছে এসেছে পদপ্রত্যাশীদের সম্পর্কে বিশেষ প্রতিবেদন। এগুলোর ভিত্তিতে বেশ কয়েক শীর্ষ নেতা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছেন। পদ পেয়েও গত তিন বছর নিষ্ক্রিয় থাকা, নানা কারণে বিতর্কের জন্ম দেওয়া, চাঁদাবাজদের প্রশ্রয়দাতা ও অভিযুক্তরা আগামী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দল থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় ২১তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলে বিতর্কমুক্ত, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকে জায়গা করে দিতে দলীয় প্রধান পদপ্রত্যাশীদের বিস্তারিত আরো খোঁজ নিচ্ছেন বলে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সূত্র বাংলাদেশের খবরকে জানায়।

সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য যে কোনো পদে আগামীতে পরিবর্তন আসতে পারে। সাধারণ সম্পাদক পদেও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা বাড়ছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদ থেকেও বিতর্কের কারণে বাদ পড়ছেন কয়েকজন। কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নতুন মুখকে ঠাঁই করে দিয়ে চমক দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকারি দল। বার্ধক্যজনিত কারণেও কয়েকজন এবার বাদ পড়ছেন। শীর্ষ কয়েক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজ দলেরও যে কারো বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে আরো কঠোর অবস্থানে থাকার বার্তা দেওয়ার পর থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের মধ্যে বাদ পড়ার আতঙ্ক জন্ম নেয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও শীর্ষ নেতাদের প্রতিবেদন নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের আতঙ্ক আরো বেড়েছে। মাঠে তাদের রাজনৈতিক অর্জন, নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয়তা, গত প্রায় এগারো বছর ধরে আওয়ামী লীগ টানা সরকারে থাকা অবস্থায় তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত আছে প্রতিবেদনে।

আওয়ামী লীগ সভাপতির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েক নেতা কারণে ও অকারণে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত। তারা টিভিতে ও পত্রিকায় নিজের ছবি ও বক্তব্য প্রচারে যত আগ্রহী, দলের সাংগঠনিক কাজে গতি ফেরাতে ও নানাভাবে কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তত আগ্রহী নন বলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরিচালিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত প্রায় এগারো বছর ধরে দলের নেতৃত্বের সরকার দেশের নানা খাতে উন্নতির স্বাক্ষর রাখলেও দলীয় কার্যক্রম সেভাবে গোছালো রাখতে পারেননি তারা। আগামী সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে তাদের বাদ পড়ার গুঞ্জন আছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় দলের সভাপতি শেখ হাসিনা গত তিন বছরের মধ্যে তৃণমূলে কমিটি না হওয়া নিয়ে তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ‘দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিত’ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার নাম উঠে এসেছে। দলের চার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে অবৈধ ক্যাসিনো-কাণ্ডে দুজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্যের নামও এসেছে ক্যাসিনো বাণিজ্যে প্রশ্রয়দাতা হিসেবে। তারা আগামী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়তে পারেন। তবে দলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজনের দক্ষতায় প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্ট। তারা সরকার ও দল- দুই জায়গাতেই দক্ষতা ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রাখছেন। তাদের মধ্যে যারা শুধু দলীয় পদে আছেন, আগামী সম্মেলনের পর তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ মন্ত্রিসভায়ও ঠাঁই পেতে পারেন। দল পরিচালনায় তাদের বর্তমান কার্যক্রম বিবেচনা করে দলের শীর্ষ পদও দেওয়া হবে সম্মেলনের সময়।

সূত্র জানায়, সভাপতি হিসেবে শুধু দলেই শেখ হাসিনার বিকল্প নেই, এমন নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তার মতো দক্ষ, দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতা দেশে নেই বলে মনে করেন নীতিনির্ধারকরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগকে চান দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সমর্থকরা। কয়েকবার অবসরের ঘোষণা দিলেও নেতাকর্মীদের দাবির মুখে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা। এবারো তিনিই দলের সভাপতি থাকছেন তা প্রায় নিশ্চিত। আগামী জাতীয় সম্মেলনে দলের সভাপতি ছাড়া তাই অন্যান্য যে কোনো পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা।

তাদের মতে, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শীর্ষ পদে (সাধারণ সম্পাদক) এবার নতুন কোনো মুখ আসতে পারে। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের দায়িত্ব কাউন্সিলরদের হলেও তারা বরাবরই এ দায়িত্ব তুলে দেন সভাপতি শেখ হাসিনার কাঁধে। দলের আগামী সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, তা নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ সভাপতির সিদ্ধান্তের ওপর। দল ও সরকার আলাদা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে সাধারণ সম্পাদক পদে রদবদল আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এ পদে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন একজনকে, যিনি সরকারে নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর নামও এবার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আলোচনায় আছে।

জানা যায়, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও আওয়ামী লীগ প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দিয়ে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিষয়ে একাধিক জরিপ করান। জরিপের ফল অনুযায়ী অনেক সংসদীয় আসনে দলের মনোনয়ন পান জনপ্রিয় ও নতুন মুখ। বিভিন্ন আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে পরিচালিত ওই জরিপের ভিত্তিতেই। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত দলের সহযোগী সংগঠনের (কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ) এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরিচালিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোর প্রতিফলন দেখা যায়। কেন্দ্রীয় সম্মেলনেও এ চিত্র দেখা যাবে।

সূত্রমতে, আগামী ২০২০ সালের আগে যথাসম্ভব শুদ্ধ রাজনৈতিক দল চায় আওয়ামী লীগ। আগামী বছরের প্রথমদিন থেকে উদ্যমী, পরিশ্রমী, সৎ এবং প্রবীণ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয়ে দলটি পথ চলতে চায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গড়া এ দলের নেতৃত্বের সরকার আগামী বছর তার জন্মশতবছর ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে রাষ্ট্রীয় বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবছর ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের পদে বিতর্কিতদের না রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব লক্ষ্যে শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু সারা দেশের তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযান চলছে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে নতুন মুখ আসছে কি না এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের গতকাল বুধবার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সম্মেলনেও নতুন নেতৃত্ব আসবে। শুদ্ধি অভিযান এখনো চলছে। আমি আপনাদের বারবার এ কথাই বলেছি যে, নতুন নেতৃত্বের বিষয়টি আওয়ামী লীগ সভাপতির এখতিয়ার। আমাদের সভাপতি যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই হবে। কারণ তিনি (শেখ হাসিনা) আমাদের কাউন্সিলরদের মাইন্ড সেটআপ ভালো করেই জানেন। আমাদের কাউন্সিলররাও সব সময় নেত্রীর ওপর আস্থা রাখেন। নেত্রী যেটা সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই সিদ্ধান্তে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই, এতে আমি সাধারণ সম্পাদক থাকি আর না থাকি সেটা প্রশ্ন নয়।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads