পশুর দাম কমার অপেক্ষায় ক্রেতারা

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

পশুর দাম কমার অপেক্ষায় ক্রেতারা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৮ জুলাই, ২০২২

কোরবানির ঈদ যতই এগিয়ে আসছে ততই সরগরম হয়ে উঠছে সারা দেশের পশুর হাটগুলো। বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম। তবে ক্রেতাদের উপস্থিতির তুলনায় বিক্রি কম। কারণ এবার হাটে পর্যাপ্ত গরু থাকলেও গতবারের তুলনায় দাম অনেক বেশি। তাই ক্রেতারা অপেক্ষায় আছেন দাম কমার।

এদিকে রাজধানীতে পশু বিক্রিতে ধীরে ধীরে সাড়া মিলছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বেশকিছু ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তাদের জোর করে বিভিন্ন হাটে আনা হয়েছে। তাদের পছন্দমতো হাটে যেতে দেয়া হয়নি। জোর করে তাদের গরুবোঝাই ট্রাক হাটে ঢোকানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া থেকে আসা গরু বিক্রেতা আমিরুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন হাটে ব্যবসায়ীদের জোর করে হাটে ঢোকানো হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের লোকসান হচ্ছে। মূলত রাত ১০টা থেকে শুরু হয়ে ফজর পর্যন্ত মূল সড়ক থেকে গরুবোঝাই ট্রাক এলে এভাবে ঢুকিয়ে নেয় হাটে। আমাদের তো একটু লাভ দরকার। আমাদের স্বাধীনতা নেই।

উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন হাটেই জোর করে ব্যবসায়ীদের আনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গরু ব্যবসায়ী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পথে পথে এভাবে ধরে আনার কারণে পশুর দাম অনেকটাই বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। সে সঙ্গে সামপ্রতিক বন্যা এবং পশুখাদ্যের দর বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও যোগ হতে পারে। এ বিষয়ে জানার জন্য উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মাহে আলমকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

গতকাল রাজধানীর গাবতলী ও কাওলার শিয়ালডাঙ্গার হাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতারা হাটে আসছেন, তবে কিনছেন কম। তাদের দাবি, কিছু কিছু ব্যবসায়ী বেশি দাম হাঁকানোয় হতাশ ক্রেতারা। আর বিক্রেতারা চাহিদামতো দামে বিক্রি করতে না পারায় হতাশ।

গাবতলী হাটে আসা জুয়েল মোল্লা নামে এক ক্রেতা জানান, গরুর আকার ভেদে ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা বেশি দাম চাচ্ছেন বিক্রেতারা। তারপরও হাটে এসেছেন যদি সঠিক মূল্যে কিনতে পারেন তাহলে কিনবেন। না হয় শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন দাম কমার জন্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, বড় গরুর চেয়ে মাঝারি আর ছোট আকারের গরুর প্রতি আগ্রহ সবার। ঈমান নামে একজন বিক্রেতা বলেন, ২০টা গরু নিয়ে এসেছেন টাঙ্গাইল থেকে। এখনো ১টাও বিক্রি হয়নি। যে দাম দিয়ে এনেছি ক্রেতারা তো সে দামও হাঁকছেন না।

গতকাল সকালে আফতাব নগর ও মেরাদিয়া হাটে তেমন ভিড় দেখা না গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। বিকেলে ঢাকার অন্যতম বড় পশুর হাট আফতাবনগরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে খুঁটিতে বাঁধা রয়েছে গরু। দলে দলে হাটে প্রবেশ করছে শত শত মানুষ।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন থেকেও জানা যায়, ঢাকার বাইরের হাটগুলোতেও বাড়তে শুরু করেছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে জমে উঠেছে পশুর হাট। প্রতিদিন হাজার হাজার দেশীয় গরু-ছাগল নিয়ে বিক্রেতারা আসছেন এসব হাটে। পশুর হাট ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা, নির্বিঘ্নে যাতায়াত, জালনোট শনাক্তকরণ মেশিনসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট হাট কর্তৃপক্ষ।
পশুর হাটে ক্রেতা সমাগম করতে প্রচার চালাচ্ছেন ইজারাদাররা। মাইকিংয়ের প্রতিযোগিতা চলছে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের আনাচে-কানাচে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস দিয়ে যার যার মতো করে বাজার মাতানোর চেষ্টা করছে হাট কর্তৃপক্ষ।

নরসিংদীতে গরু-ছাগলের হাট জমে উঠেছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের ঢল নেমেছে হাটগুলোতে। জেলার শিবপুর উপজেলার পুটিয়া গরুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, হাটটিতে বিপুল পরিমাণ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উঠেছে। ক্রেতারা বিভিন্ন জায়গায় থেকে পশু কিনেত এই হাটে এসেছেন। সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানির পশুটি কিনতে হাটের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত ঘুরছেন তারা। হাট তদারকিতে মাঠে রয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া নির্বিঘ্নে যেন বেচাকেনার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে বিশেষ পদক্ষেপ।

সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাটে শুরু হয়েছে পশু বেচা-কেনা। ঈদের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমজমাট হয়ে উঠছে পশুর হাটগুলো। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাক, পিক-আপ, নছিমন, করিমন, ভ্যান ভর্তি করে আসছে গরু-ছাগল। ব্যস্ততা বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের। উল্লাপাড়া উপজেলার বোয়ালিয়া পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। ভোর থেকে সিরাজগঞ্জ জেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু, মহিষ, ছাগল আসতে শুরু করে। হাটের বিভিন্ন জায়গা থেকে পশু এসে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর হাটও জমে উঠেছে বলে জানিয়েছেন আমাদের জেলা প্রতিনিধি। নগরীর বিবিরহাট পশুর হাটে বৃহস্পতিবার ভিড় করেন ক্রেতারা। অনেকে ইতোমধ্যেই কিনে নিয়ে গেছেন পছন্দের গরু-ছাগল। নগরীর বিবিরহাট পশুর হাটে দেখা যায়, বাজারে পশুর কোনো কমতি নেই। চাহিদা মোতাবেক পশু রয়েছে হাটে। তবে দাম এখনো চড়া বলে জানান ক্রেতারা। ৬০-৭০ হাজার টাকার কমে কোনো গরু পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে অনেকে অপেক্ষা করে আছেন দাম কমার।

বগুড়াতেও জমে উঠছে কোরবানির পশুর হাট। ছোট বড় মিলিয়ে বগুড়ার মোট ৬৮টি হাট-বাজারেই উঠছে গরু-ছাগল। ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের চেয়ে এবার পশুর দাম বেশি। আর বিক্রেতারা বলছেন, গোখাদ্যের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় পশুর দাম কিছুটা বেড়েছে।

এসব হাট ছাড়াও বিভিন্ন খামার থেকেও বিক্রি হচ্ছে পশু। টিএমএস এগ্রো ফার্মে দেশীয় পদ্ধতিতে পালন করা বড় গরুর চাহিদাও বেশ।
রংপুরে জমজমাট ৭০টি পশুর হাট। পছন্দসই পশু কিনতে হাটে আসছেন ক্রেতারা। তবে বড় গরুর চেয়ে ছোট বা মাঝারি গরু বেশি কিনতে

আগ্রহী ক্রেতারা। জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাবুল হোসেন জানান, হাটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ভেটেনারি মেডিকেল টিমও কাজ করছে। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরে গরু, ছাগল, ভেড়া মিলিয়ে সাড়ে ৩ লাখের বেশি কোরবানির পশু রয়েছে। যা জেলার চাহিদার চেয়ে বেশি। আর বগুড়ায় কোরবানি যোগ্য গবাদিপশু রয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজারের বেশি। চাহিদা ৩ লাখ ৫৯ হাজার।

এদিকে কোরবানির পশুর ক্রেতারা যাতে প্রতারণার শিকার না হন, সে লক্ষ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটে গতকাল বৃহস্পতিবার এ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব হাটে কার্যক্রম চলবে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের। এর মাধ্যমে গরুকে ওষুধ খাইয়ে মোটাতাজা করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হবে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতে কর্মকর্তাদের সঙ্গে একজন পশু চিকিৎসক থাকছেন। তিনি সন্দেহ হলেই যেকোনো পশুকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন। ওই পশুর শরীরে ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া গেলে বিক্রেতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট পরিদর্শন শেষে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা চাই পশুর হাটে ক্রেতাদের ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত হোক। আগে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যে, কোরবানির পশু কিনতে এসে ক্রেতারা প্রতারিত হয়েছেন। র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বৃহস্পতিবার থেকে হাটগুলো মনিটর করা শুরু করেছে। প্রতিটি হাটে র্যাবের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান র্যাবের এ কর্মকর্তা। যেকোনো ধরনের সমস্যায় র্যাবের কন্ট্রোল নম্বরে ফোন করে সহযোগিতা চাওয়ারও অনুরোধ করেছেন খন্দকার আল-মঈন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads