বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ফিরিয়ে আনা যায়নি বিদেশে পালিয়ে থাকা পাঁচ খুনিকে। এমনকি কবে নাগাদ তাদের ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) বরাবরের মতোই বলছে, পলাতক খুনিদের আনতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, ইন্টাপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি খুনিদের আশ্রয়স্থল সম্ভব্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনা সদস্য। এ ঘটনার ৩৫ বছর পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ছয় খুনির ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। কিন্তু বিদেশে পলাতক রয়েছেন আরো পাঁচ খুনি। তারা হলেন- আব্দুর রশীদ, শরীফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন, রাশেদ চৌধুরী ও এবিএমএইচ নূর চৌধুরী। এই পাঁচ খুনিকে এখনো ফিরিয়ে আন যায় নি। তাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব আইন। তবে খুনিরা যেসব দেশে রয়েছে সেসব দেশের সঙ্গে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বিশেষ টাস্কফোর্সের প্রধান ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, পালিয়ে থাকা খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা অব্যাহত আছে। খুনিরা যে দেশেই থাকুক তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী। বিদেশ পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনায় কোনো ঘাটতি আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে খুনের দায়ে সর্বোচ্চ আদালত থেকে যারা সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে এর মধ্যে যারা পলাতক রয়েছে, তাদেরকে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকার নয়, আওয়ামী লীগ যতক্ষণ থাকবে, আমার মনে হয় বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর অনুসারী একজন থাকলেও এই হত্যাকারীদের ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের যে চলমান প্রক্রিয়া তাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য সেটা অব্যাহত আছে। এই চলমান প্রক্রিয়ার ব্যাপারে যদি বিশদ কিছু বলতে যাই তাহলে চলমান প্রক্রিয়া ব্যাঘাতপ্রাপ্ত হবে। সেজন্য আমি শুধু এইটুকু বলব, এই ব্যপারে কোনো শিথিলতা নাই, তাদেরকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
বঙ্গবন্ধকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয় পরবর্তী সরকার। শুধু তাই নয়, খুনিদের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়। সামরিক সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে খুনিরা রাজনৈতিক দল গঠন করে অনেক অপকর্ম করে।
কোনো কোনো খুনি এমপিও হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে করা ইমডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া। দীর্ঘ আইনি-প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালে ১২ খুনির মধ্যে ছয় খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তারা হলো-কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ, মেজর (অব.) একে বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) একেএম মহিউদ্দিন (আর্টিলারি)। এছাড়া গত বছরের ১১ এপ্রিল রাতে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। বাকি ছয়জনের মধ্যে আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে।
বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) এসএইচএমবি নূর চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান। গ্রেপ্তার বা প্রত্যর্পণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পাকিস্তান, লিবিয়াসহ আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বারবার অবস্থান বদল করেছে খুনিরা।
সূত্র জানায়, এসএইচএমবি নূর চৌধুরী কানাডায় ও এএম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। অন্য তিনজন খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেম উদ্দিনের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
কানাডায় অবস্থানকারী নূর চৌধুরী দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিল। কিন্তু তা খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির আদালত। এ ব্যাপারে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে কথা বলেছেন স্বয়ং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া কোনো আসামিকে হস্তান্তর করা কানাডার আইন অনুযায়ী বৈধ নয়। সে কারণে আইনি জটিলতায় আটকে আছে নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনা। ২০০৪ সালে খুনি নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দিয়েছিলেন দেশটির আদালত। তবে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নূর চৌধুরীর অন্য এক আবেদনে ওই আদেশ ঝুলে থাকায় নূর চৌধুরী কানাডায় বসবাসের সুযোগ পাচ্ছে।
পলাতক খুনিদের আরেকজন মোসলেম উদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে বলে তথ্য রয়েছে। এর আগে তার ভারত ও জার্মানিতে অবস্থানের তথ্যও ছিল গোয়েন্দাদের কাছে। মোসলেমও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে। তবে তা খারিজ হয়ে যাওয়ার পর সে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তার সঠিক অবস্থান নিশ্চিত হতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার।
রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন খান ওরফে মোসলেম উদ্দিন খানের বীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করেছে সরকার। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৭০তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই সদস্য রাষ্ট্র জার্মানি ও স্পেনে এক সময় মৃত্যুদণ্ড থাকলেও এখন আর মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। তাই এ দু-দেশও মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে।
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ না থাকায় রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনতে ২০১৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি পরামর্শক সংস্থা স্কাডেন এলএলপিকে যুক্ত করে বাংলাদেশ সরকার। সংস্থাটি এ বিষয়ে মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাশেদ চৌধুরীকে ফেরতের বিষয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ২০১৬ সালে মার্কিন আইন দপ্তরে চিঠি পাঠান।
স্কাডেন এলএলপি ২০১৭ সালে জানায়, রাশেদ চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্র ফেরত দিতে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তারপর যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
খুনি রাশেদ চৌধুরীর মামলার রিভিউ করার জন্য নথি পাঠাতে অভিবাসন বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার। এমন নির্দেশের পর রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এ আইনি প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শেষ হবে সে বিষয়ে কেউ স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না।
বাকি দুই খুনি শরিফুল হক ডালিম ও আবদুর রশিদের অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, লিবিয়া, সেনেগালসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করলেও তারা স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে বসবাস করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের কাছে জানতে চাওয়া হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা দু-জন সম্পর্কে জানি। একজন কানাডায়, একজন আমেরিকায়। বাকি তিনজনের কোনো খবর জানি না। রাশেদ চৌধুরীর বিষয়টা কোর্টে আছে। আমাদের প্রত্যাশা, একটা রেজাল্ট পাব। আর নূর চৌধুরীর বিষয়ে কানাডা কোনো উত্তর দেয় না, তারা একই কথা বারবার বলে, তাদের আইন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ফেরত দেয় না। তাদের এটা সাংবিধানিক আইন, এটার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা কিছুই করতে পারবে না। আমরা সবসময় আশাবাদী, এদের ফেরত আনতে পারব। আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে এরা নাম-পরিচয় পাল্টে পালিয়ে রয়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের ইন্টারপোল শাখা বঙ্গবন্ধুর যে ৫ খুনি বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে রয়েছে তাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ১৯৩টি দেশের ইন্টারপোল শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে জারি করা রেড নোটিশ রিভিও করা হয়েছে। তবে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকায় আত্মস্বীকৃত খুনিরদের ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। ৫ খুনির সর্বশেষ অবস্থানের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অসহযোগিতার কারণে ৪ খুনির অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে ৫ খুনির মধ্যে দু-জনের অবস্থান পাকিস্তানে থাকতে পারে।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের আইনি সহায়তা করা হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। গতকাল শনিবার জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব। এক্ষেত্রে আমাদের যতটুকু ভূমিকা রাখা যায়, তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ সুগম ছিল না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বাধায় থমকে যায় বিচার প্রক্রিয়া। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমণ্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।
১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেন।
২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এরপর ১২ আসামির মধ্যে প্রথমে চারজন ও পরে এক আসামি আপিল করেন।
২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করেন।
ফলে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাইকোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকে। এর মধ্য দিয়ে ১৩ বছর ধরে চলা এ মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়।





