পাহাড়ে নতুন আতঙ্ক ’কেসিএনএ’

পাহাড়ে ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ ও তাদের নানা তৎপরতার ছবি ফেসবুকে আপলোড করছে কেসিএনএ

সংগৃহীত ছবি

অপরাধ

পাহাড়ে নতুন আতঙ্ক ’কেসিএনএ’

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ১৮ জুলাই, ২০২২

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেসিএনএ) এর সশস্ত্র কার্যক্রমে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু হয়েছে। ফেসবুকে ভারী অস্ত্র আর প্রশিক্ষণের ছবি দিয়ে ইতিমধ্যে এ অঞ্চলে নতুন করে শক্তি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা সংগঠনটি। কেসিএনএর এমন কার্যক্রমে পাহাড়ে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কেসিএনএর ফেসবুকের কার্যক্রম নজর এড়ায়নি। ইতিমধ্যে এ বিষয় কাজ শুরু হয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দেশের পার্বত্য ভূখণ্ডে পৃথক রাজ্য গড়ার প্রত্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) নিয়ে আবারো নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার শান্তিপ্রিয় হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র ৬টি নৃ-গোষ্ঠী (বম, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং)’র সমন্বয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)’র আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাদের আত্মপ্রকাশের বিষয়টি সামনে আনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে খুন, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), পিসিজেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), মগ পার্টি। সদ্য আত্মপ্রকাশ করা কেএনএফসহ পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত সংগঠনের সংখ্যা দাঁড়ালো সর্বমোট ৬ টিতে।

জানা যায়, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সক্রিয় সশস্ত্র ক্যাডারও গড়ে তুলেছে। তাদের সশস্ত্র সংগঠনের নাম কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি। সমপ্রতি স্বনামে ফেইসবুকে পেইজ খুলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি, বিলাইছড়ি উপজেলা এবং বান্দরবানের রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলিকদম উপজেলাসহ সর্বমোট নয়টি উপজেলা নিয়ে কেএনএফর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের একটি মানচিত্র প্রকাশ করছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করে এর অস্তিত্বের প্রমাণও পেয়েছে।

একাধিক সূত্র ও সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেছে, পাহাড়ে বসবাসরত বম, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং হলো কথিত এই কুকি-চিন জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীও এরা। শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে অনগ্রসর হলেও নিকট অতীতে তারা শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী হিসেবেই পরিচিত ছিল। তারাই গড়ে তুলেছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। তাদের দাবি, পাহাড়ের সন্ত্রাসী দলগুলো তাদের এলাকা ব্যবহার করে অবলিলায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, গুমসহ নানা অপরাধ করছে।

পার্বত্যাঞ্চলের কুকি-চিন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে হাতে আঁকা মানচিত্র প্রদর্শন করছে। তাদের দাবি, পূর্ণ স্ব-শাসনের ব্যবস্থা প্রদানের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ অঞ্চল সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু তাদের পতাকা তৈরির কারণে উদ্দেশ্য এবং বক্তব্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের মিজোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এ সংগঠনের সশস্ত্র ও নিরস্ত্র সক্রিয় সদস্য সংখ্যা রয়েছে কমবেশি ৪ হাজার। এই কেএনএফ তাদের সশস্ত্র শাখার কার্যক্রম কয়েক বছর ধরে অতি গোপনীয়তার সাথে পরিচালনা করে আসছে। পরবর্তীতে ভারতের মনিপুর রাজ্যের এবং বার্মার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে সক্ষম হয়। গোপন আঁতাত করে কয়েকশ সদস্যকে মনিপুর রাজ্যে সামরিক প্রশিক্ষণে পাঠায়। একইভাবে শতাধিক সক্রিয় সদস্য কাচিন, কারেন প্রদেশ এবং মনিপুর রাজ্য থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। সশস্ত্র শাখার ক্যাডাররা ২০১৯ সালে ইনফেন্ট্রি কমান্ডো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে মর্মে গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ৬টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলে খ্রিস্টান বাফার রাষ্ট্র তৈরির জন্য নতুনভাবে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে এমন অভিমত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একাধিক বিশ্লেষকের।

সূত্র জানায়, পার্বত্যাঞ্চলের ৯টি উপজেলা নিয়ে কেএনএফর অঙ্কিত মানচিত্রের সীমানায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত একটি পৃথক রাজ্যের দাবিতে সংগঠনটি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৭ সালে সশস্ত্র শাখায় রূপ নেয়। কিন্তু প্রকাশ্যে আসে অতিসমপ্রতি। অথচ সংগঠনটি প্রাথমিক পর্যায়ে কে.এন.ডি.ও নামে একটি সেবা মূলক এনজিও’র খোলসে যাত্রা শুরু করে।

জানা যায়, দেশ স্বাধীনের ৫১বছর পরে এসে কুকি-চিন জনগোষ্ঠী তাদের বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছে। তবে তাদের বঞ্চনার মূলে সরকার নয়, স্থানীয় বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ। বর্তমানে তাই তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯টি উপজেলা নিয়ে ‘কুকি-চিন স্ট্যাট’ বা ‘কুকি-চিন রাজ্য’ নামে পৃথক রাজ্য প্রতিষ্ঠার বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি করছে। এই দাবির সাথে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এবং এর সশস্ত্র শাখা কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) সরাসরি জড়িত। তাদেরকে পৃথক রাজ্য বা স্বায়ত্তশাসন দিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাস দমন সম্ভব হতো বলে দাবি, কেএনএফর। কেএনএফর মতে, দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্বাঞ্চল তাদের পূর্ব-পুরুষদের অঞ্চল বা আদিম নিবাস ছিল। কালক্রমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীরা পাহাড়াঞ্চলে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে তাদের পূর্ব-পুরুষদের ভূমি জবরদখল করে নেয়। যে কারণে অনেকে ক্ষয়ক্ষতি সম্মুখীন অথবা ভয়ে দেশ ছেড়ে চিন, ভারত ও মায়ানমারে আশ্রয় গ্রহণ করে এখানে টিকে থাকা সামান্য অংশ আজ সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে এমন দাবি করেছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।

এদিকে কেসিএনর এমন কর্মকাণ্ডে পাহাড়ে আবারো আতঙ্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর শীর্ষ এক কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রধানের হুঁশিয়ারির পর বিচ্ছিন্ন সংগঠনগুলোর তৎপরতা কিছুটা কমে আসলেও এ সংগঠনটি নানা কর্মককাণ্ড পরিচালনা করছে। পাহাড়ে ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ ও তাদের নানা তৎপরতার ছবি ফেসবুকে আপলোড করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এগুলো আপলোড নিজেদের শক্তিমত্তা জানান দিতে চায় সংগঠনটি। এগুলোকে পুঁজি করে পুরো পার্বত্য এলাকায় একক শক্তি প্রদর্শন করে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।

তারা বলছেন, দ্রুত এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।   

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, সামপ্রতিক সময়ে পাহাড়ে কিছু সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতায় সেখানে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, পাহাড়ে এ সংগঠনের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads