কানাডায় পাচার করা প্রশান্ত কুমার হালদারের (পিকে হালদার) ৮১ কোটি টাকা ফেরাতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এটি হচ্ছে অভিযোগসংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পেতে এক ধরনের চিঠি বা আবেদন। একটি দেশের দায়িত্বশীল সংস্থা সুনির্দিষ্ট তথ্যের বিষয়ে জানতে ও সহায়তা পেতে অন্য দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাছে আইনি প্রক্রিয়ায় এমন অনুরোধ জানায়।
জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনে (আনকাক) সই করা দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে এমএলএআর বেশি ব্যবহৃত হয়। আগে বাংলাদেশ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে এমএলএআর পাঠানো হতো। বর্তমানে এটি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে।
দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক বলেন, আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি শুনেছি। তবে দুদক থেকে এমএলএআর পাঠানোর বিষয়টি জানা নেই। এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো ফাইল বা নথি পাইনি। তাই বিস্তারিত বলতে পারছি না।
আলোচিত পিকে হালদার তার ভাই প্রীতিশ কুমার হালদারের মাধ্যমে কানাডার বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮১ কোটি টাকা পাচার করেছেন। ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিকে হালদার তার ভাই প্রীতিশ কুমার ও একটি বেনামি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কানাডার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এসব অর্থ পাচার করেন। অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে রয়েছে।
অর্থপাচারের বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আলোচিত পি কে হালদার তার ভাই প্রীতিশের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৮০ কোটি ৯২ লাখ ৪১ হাজার ৫০২ টাকা অর্থাৎ এক কোটি ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৬৪ কানাডিয়ান ডলার পাচার করেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রীতিশ কুমার হালদারের হিসাব থেকে ৯৩ হাজার কানাডিয়ান ডলার ও পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার কানাডায় পাচার হয়।
২০১২ সালের ৫ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলেকট্রিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে তিন লাখ ২৪ হাজার ৯৮৫ কানাডিয়ান ডলার ও ১০ হাজার মার্কিন ডলার প্রীতিশ হালদারের হিসাব থেকে কানাডায় পাঠানো হয়। ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত সময়ে পিঅ্যান্ডএল হল হোল্ডিং ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পাঠানো হয় ৭২ হাজার কানাডিয়ান ডলার। ২০১৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কানাডার পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিংয়ের হিসাবে ২১ লাখ ৮২ হাজার ৪৩১ কানাডিয়ান ডলার ও ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৫৬৭ মার্কিন ডলার পাঠানো হয়। একই ভাবে ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত সময়ে পজ হোল্ডিং ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে দুই লাখ ৭৯ হাজার ৬৮৮ কানাডিয়ান ডলার এবং ২০১৩ সালের ৯ মে থেকে ২০২০ সালের ৫ মে পর্যন্ত আট লাখ ৫২ হাজার ৯২১ কানাডিয়ান ডলার কিউবিক ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে জমা করা হয়। ২০১২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত কিউবিক ইন্টারন্যাশনালের নামে ২৮ লাখ ৫৪ হাজার ৩৭৬ কানাডিয়ান ডলার, ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৭০৩ মার্কিন ডলার, ১০ লাখ ১ হাজার ৭৩০ ইউরো এবং ২৪ হাজার পাউন্ড পাঠানো হয়।
দুদক সূত্রে জানা যায়, পিকে হালদারের অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদক উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত কানাডার বিভিন্ন হিসাবে জমা করা অর্থ ফ্রিজ (লেনদেন স্থগিত) করতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। এখন মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পিকে হালদারের ঋণ কেলেঙ্কারি অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে পাওয়া বিভিন্ন নথিপত্রের সূত্র ধরে দুদক অর্থ পাচারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে। পি কে হালদার তার ভাই প্রীতিশ কুমার হালদারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অর্থ লেনদেন করেছেন। এর প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে।
প্রীতিশ কুমার হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কানাডায় এক কোটি ১৭ লাখ কানাডিয়ান ডলারের বেশি অর্থ জমা করেছেন, যা প্রকৃত অর্থে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত। কারণ, ওই টাকা পি কে হালদার অবৈধ প্রক্রিয়ায় পাঠিয়েছেন। এসবের প্রমাণও আমাদের হাতে রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা আদালতের রায়ের মাধ্যমে ফ্রিজ করার নির্দেশনা পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে এখন কানাডায় জমা করা অর্থ যত দ্রুত সম্ভব ফ্রিজ করা প্রয়োজন। না হলে অর্থ বেহাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রায় ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রশান্ত কুমার হালদারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী। পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, প্রশান্ত কুমার হালদার বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৫ টাকার অবৈধ সম্পদ নিজ দখলে রেখেছেন, যা দুদক আইন, ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উক্ত অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, উৎস গোপন বা আড়াল করতে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর করে মানিলন্ডারিং-সংক্রান্ত অপরাধ করেছেন। এক্ষেত্রে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪ (২), ৪ (৩) ধারায় অপরাধ করেছেন তিনি।





