প্রকল্পের ব্যয় না বাড়িয়ে গণহারে বৃদ্ধি করা হচ্ছে প্রকল্পের মেয়াদ। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়। অন্যদিকে জনসাধারণও বঞ্চিত হচ্ছে উন্নয়ন সুবিধা থেকে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সামর্থের চেয়ে বেশি প্রকল্প হাতে নেওয়ার কারণেই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সমাপ্ত হচ্ছে না। আবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়া মানেই ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া। এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে পরামর্শ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সম্প্রতি তিন শতাধিক প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন জমা পড়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে সকল মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে চুরি বেশি হচ্ছে, সেই সকল মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের মেয়াদই বেশি বাড়ছে। উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, যথাসময়ে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে জনগণ যেমন সুবিধা পেত, সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রকল্পের সময় বাড়ানোর কারণে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। তাদের মতে, কিছু যৌক্তিক কারণে দুই একটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। বর্তমানের মতো এভাবে প্রকল্পের গণমেয়াদ বৃদ্ধি অতীতে দেখা যায়নি। এখানে ছোট-বড় প্রকল্পের কোনো ভেদাভেদ নেই। আর এই প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের করের টাকার এমন অপচয়ের নজির পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। জানা যায়, বর্তমানে চলমান ১ হাজার ৪২৬টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ৬৭৮টির মেয়াদ ২০২০ সালের জুনে শেষ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩০০টিরও বেশি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়া মানেই ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া। কারন যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পৃক্ত থাকা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতার জন্য ব্যয় করতে হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। সাধারণত একটি প্রকল্পে রাজস্ব ব্যয়ের মধ্যে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের বাইরেও থাকে প্রায় ১১ ধরনের ভাতা। এগুলো হলো বাড়িভাড়া, বিনোদন, উৎসব, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, টিফিন, যাতায়াত, শিক্ষা, মোবাইল ফোন, ভ্রমণ ও অন্যান্য ভাতা। সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খরচের মধ্যে থাকে টেলিফোন বিল, গাড়ি পরিচালনা, ড্রাইভারের বেতন, গ্যাস ও জ্বালানি বিল, পেট্রোল-অয়েল ও লুব্রিক্যান্ট বিল, অফিস ব্যয়সহ নানামুখী ব্যয়। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে এ ধরনের ব্যয় চলমান থাকে। অর্থাৎ যতদিন প্রকল্প চলবে ততদিন এই ব্যয়গুলো হতেই থাকবে। ফলে প্রকল্পে মেয়াদ বাড়ানো হলে নির্ঘাত ব্যয় বাড়বে। প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের পকেট ভারি হবে।
আবার প্রকল্পের ব্যয় যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে এই ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে প্রকল্পের ওপর। প্রকল্পের বাস্তব উন্নয়ন কাজ থেকে টাকা কাটছাট করে বেতন-ভাতা খাতে টাকা স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়া মেয়াদ বাড়ার কারণে অনেক প্রকল্পের কেনাকাটা খাতে ব্যয় বাড়ে। কেননা পণ্য, যন্ত্রপাতির দাম ক্রমেই বাড়ে। বলা হয়, ব্যয় বাড়বে না, কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির সংশোধনী প্রস্তাবের ভেতরে কায়দা করে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। অথচ প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবের সময় সেটি আমলে নেওয়া হচ্ছে না। প্রকল্প সংশোধন মানেই চুরির মেয়াদও বেড়ে যাওয়া। প্রকল্প মানেই হলো ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ অতি মূল্যায়ন। অর্থাৎ প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় যখন হিসাব (এস্টিমেট) করা হয়, তখন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে হিসাব করা হয়। এই অর্থ প্রকল্প শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায়। তার পর শুরু হয় মূল প্রকল্পের কাজ। এরপর যতবার প্রকল্প সংশোধন হবে ততবারই এই ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ বেশি ধরে সংশোধনী প্রস্তাব আনা হবে। আবার সেই টাকাও যথারীতি ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যাবে। বাকি যে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ অর্থ থাকে প্রকল্পের ব্যয়ের জন্য। সেই টাকাও বেশিরভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয় হয় না। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্পর ব্যয়ের ৩০ থেকে ৪০ ভাগ টাকা খরচ হয় মূল প্রকল্পে।
সাম্প্রতিক সময়ে নতুন প্রকল্পের অনুমোদনের চেয়ে পুরনো প্রকল্পের সংশোধনের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাস হওয়া ১০টি প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটি ছিল সংশোধিত প্রকল্প। ওই দিনও সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এভাবে বার বার সংশোধিত প্রকল্প একনেক সভায় আসছে বলে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ বৃদ্ধি কথাটিই একটি ভুয়া কথা। কেননা মেয়াদ বাড়লে অবশ্যই ব্যয় বাড়বে। কন্টিনজেন্সি খাতসহ বিভিন্ন খাতে মোটা অঙ্কের টাকা ধরা থাকে। বর্ধিত মেয়াদে এগুলো খেয়ে ফেলা হয়। এছাড়া সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেটি থেকে সুফল না আসার যে আর্থিক ক্ষতি, সেটিও মূল্যায়ন করা হয় না। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি বিষয় থাকে। শ্রমের মজুরি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সংশোধনী প্রস্তাব একনেকে অনুমোদনের জন্যই এমন প্রতারণামূলক কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। যাতে কেউ আপত্তি না তোলে।
প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে, সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ সামর্থের চেয়ে বেশি প্রকল্প হাতে নেওয়া। যথাযথ পরিকল্পনা, প্রস্তুতি শেষ না করেই প্রকল্প নেওয়া। সে জন্য বড় বড় প্রকল্পে মাঝপথে এসে নকশায় ত্রুটি দেখা গেছে। তিনি বলেন, প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারলে কারো বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমন নজির নেই। আবার নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করলে পুরস্কৃতও করা উচিত। কিন্তু এর কোনোটিই হয় না।
প্রকল্পের এই দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ে খোদ পরিকল্পনা মন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, দুর্নীতি ও অপচয় আমাকে পীড়া দেয়। তিনি বলেন, আমার রুমে দুটি টেলিভিশন কেনা। সোফা সেটও অনেক দামি। এগুলো আমাকে পীড়া দেয়। অপচয় ও দুর্নীতিগুলো বেশি তুলে ধরা দরকার। পাবলিক আমাদের আসল প্রভু। তথ্য প্রকাশ হলে অপচয় ও দুর্নীতিতে লিপ্ত হতে অনেকে ভয় পাবেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমও একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, অপচয় ও দুর্নীতির উৎস প্রকল্পগুলো। অনেকে আমার এলাকায় মুজিব কেল্লা বানাতে চায়। নানা কারণে আমি না করেছি। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা উন্নত হতে হবে। যেন-তেন প্রকল্প নেয়া যাবে না।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ বৃদ্ধির তালিকায় এগিয়ে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ৪২টি প্রকল্প। এর পরেই রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের ৩৩টি প্রকল্প। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের রয়েছে ৩২টি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২৯টি, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২৭টি, বিদ্যুৎ বিভাগের ২৬টি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ১৪টি এবং বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের রয়েছে ১১টি প্রকল্প।
২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোট ৯৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সর্বশেষ সভায় এই প্রকল্পগুলো নিয়ে মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপন করে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তাতে দেখা যায়, এই ৯৬টি প্রকল্পের মধ্যে ৪৮টির সময় এক বা একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। ২৮টি প্রকল্পের সময়সীমা নিয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি। মাত্র ১৬টি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়েছে। চারটি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যয়ও বেড়েছে।
ঢাকার কাছের জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্দিষ্ট ছিল তিন বছর। তিন দফায় এক বছর করে তিন বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সময়ের পাশাপাশি এই প্রকল্পে খরচ বেড়েছে (কস্ট ওভাররান) ২০০ শতাংশ। আর সাত বছর ধরে এই পথে মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেছে। প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
এদিকে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর ওপর তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল ২০০২ সালের জুলাই মাসে। ২০০৬ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একাধিকবার প্রকল্পের সময় বাড়িয়ে বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর। চার বছরের প্রকল্প শেষ হয় ১৭ বছরে। শুরুতে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৩৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ সংশোধিত ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ৭৯৭ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ বেড়েছে ৮১ শতাংশ, আর সময় বেড়েছে ৩৩৭ শতাংশ। সময় ও ব্যয় বাড়ার বড় কারণ ছিল বৈদেশিক ঋণের জটিলতা।
এ ছাড়া হবিগঞ্জের বানিয়াচং-নবীগঞ্জ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি চার বছরে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে প্রকৃতপক্ষে সময় লেগেছে আট বছর। তিনবার এই প্রকল্পের পরিচালক বদল হয়েছে। একইভাবে ভোলার চরফ্যাশন-চরমানিকা-বাবুহাট লঞ্চঘাট সড়ক নির্মাণ, গাজীপুর-আজমতপুর-ইটাখোলা সড়ক নির্মাণ প্রকল্পসহ অনেক প্রকল্পেই দ্বিগুণ সময় লেগেছে। বেড়েছে খরচও।
২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৪টি প্রকল্প শেষ হয়। এগুলোর মধ্যে অন্তত ১৩টি প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়। সংসদীয় কমিটি সূত্র জানায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ৩০টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। এর মধ্যে ১৩টি প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) পায়নি আইএমইডি। বাকি ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন (এলডিডি) প্রকল্প’ শুরু হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ।
বস্ত্র অধিদপ্তরের সাতটি প্রকল্প চলমান আছে। সাতটি প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটি ইতোমধ্যে দুই থেকে তিনবার সংশোধন করা হয়েছে। সব কয়টিতেই সম্ভাব্য ব্যয় বেড়েছে।





