প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ঘর পেয়ে খুশি প্রতিবন্ধী মনির ও বিধবা সূর্যবানু

ছবি: বাংলাদেশের খবর

সারা দেশ

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ঘর পেয়ে খুশি প্রতিবন্ধী মনির ও বিধবা সূর্যবানু

  • কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
  • প্রকাশিত ২৭ এপ্রিল, ২০২২

চল্লিশোর্ধ শারীরিক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. মনির হোসেন। তার সংসারে ২ ছেলে ২ মেয়েসহ ৬ জন সদস্য রয়েছে। পরিবারে বিকল্প কোন অর্থ উপার্জনক্ষম লোক না থাকায় এই সামান্য আয় দিয়ে তার অতিকষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযাপন তার করতে হচ্ছে। নেই নিজের কোন জায়গা জমিও। অন্যের ভাঙ্গাচোরা ভাড়া বাড়িতে খেয়ে না খেয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে কোন রকম দিনানিপাত করতে হয়েছে তার। তাছাড়া ভাড়া ঘরটি খুবই জরাজীর্ণ, সামান্য বৃষ্টিতেই টিনের ছিদ্র দিয়ে ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ায় আর শীতের সময় থাকতে খুবই কষ্ট করতে হয়। কখনো কল্পনা ও করতে পারেনি তার পাকা ঘর হবে । পাকা ঘরে থাকতে পারবে। সব কিছু যেন এখন তার স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। এসব কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের হীরাপুর বড় কুড়ি পাইকা গ্রামের মৃত আব্দুল হাকিমের ছেলে মো: মনির হোসেন। মনির বলেন দীর্ঘ বছর পর তার স্বপ্ন পুরণ হয়েছে। নিজ নামে হয়েছে থাকার ঘর। দুই শতক জমি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, সুন্দর বারান্দাসহ বসবাসের নিরাপদ সুবিধা।

তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের পাকাঘর তৈরি করে দিয়ে দীর্ঘদিনের কষ্ট দুর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলে সে কথা রাখে। কথা অনুযায়ী তিনি আমাদের মতো অসহায় গরিবদের দিকে তাকিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, আল্লাহ যেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সুস্থ ও ভালো রাখে। আমরা মন থেকে দোয়া করি তিনি যেন অনেক দিন বেঁচে থাকেন।

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন ও গৃহহীন ৪৩টি পরিবারের হাতে বাড়ির দলিলপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মাঝে গৃহ প্রদান কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্ধোধন করা হয়। এরপর এ উপজেলার ৪৩ জন উপকারভোগীদের হাতে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাড়ির দলিলপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন ঘর পাওয়া এসব ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষগুলোর চোখে মুখে এখন অনাবিল স্বপ্ন। স্বপ্নের ঘর পেয়ে উপকারভোগীরা খুবই খুশি। যে স্বপ্ন দীর্ঘ বছর তারা পুরণ করতে পারেনি সেই স্বপ্ন সরকার এগিয়ে এসে পূরন করে দেওয়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি উপকারভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর সুস্থ্যতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।

উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের বিধবা সূর্যবানু বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগে তার স্বামী অসুস্থ হয়ে মারা যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারে ১ ছেলে ১ মেয়ে নিয়ে তার অনেকটাই বিপাকে পড়তে হয়। জায়গা জমি না থাকায় অন্যের ভাড়া বাড়িতে খেয়ে না খেয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে কোন রকম দিনানিপাত করতে হয়েছে। জীবন বাঁচাতে করতে হয়েছে অন্যের বাড়িতে দৈনিক কাজ। তাছাড়া ভাড়া ঘরটি খুবই ছিল জরাজীর্ন, সামান্য বৃষ্টিতেই টিনের ছিদ্র দিয়ে ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ায় আর শীতের সময় এই ভাঙ্গা ঘরে ছেলে সন্তান নিয়ে তাদের থাকতে খুবই কষ্ট করতে হয়। অন্যের বাড়িতে থাকায় প্রতিনিয়ত শুনতে হতো মানুষের কথাও।

জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি পাকা ঘরে থাকতে পারবে কখনো কল্পনাও করেনি। সব কিছু যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে । কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার স্বপ্ন পুরন করেছে। তিনি আরো বলেন আমার মাথায় যত চুল আছে আল্লাহ যেন তাকে নেক হায়াত দান করে এবং সুস্থ্যতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।

একই গ্রামের মো. আব্দুল হাসিম বলেন আমরা নিতান্তই অসহায় ভূমিহীন গরিব মানুষ। পরিবারে স্ত্রী,১ ছেলে ২ মেয়ে রয়েছে। রিকশা বা দৈনিক মজুরিতে কাজ করে চলে তার সংসার। নিজের জায়গা জমি বলতে কিছুই নেই । ভাড়া করা অন্যের বাড়িতে ভাঙ্গাচুরা ঘরে খেয়ে না খেয়ে কোন রকম দিনানিপাত করছি। ভাড়া বাড়িতে থাকায় তাদের কোন স্বাধীনতা ছিল না। সবাই তাকে তিরস্কার করতো। তার ছেলে মেয়ের সাথে অন্য কারোর সন্তান খেলা ধুলা করতো না। সব কিছু চোখ বুঝে সহ্য করেছি। বর্তমান সরকার আমাদের মতো গরিবের দিকে তাকানোর ফলে থাকার জায়গা পেয়েছি। আমরা কি কখনো আয় রোজগার করে বাড়িঘর করতে পারতাম। তাছাড়া কোনদিন স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে একটা পাকা ঘর দেবেন। আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যেন ভালো ও সুস্থ রাখে। তিনি যেন অনেক দিন বেঁচে থাকেন।

আনোয়ারপুর গ্রামের মো: ভাষানী বলেন, অনেক বছর ধরে তিনি শ্রমিকের কাজ করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। নিজের জায়গা না থাকায় ভাঙ্গাচুরা একটি বাড়িতে কষ্ট করে থাকছেন। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরে পানি পড়ে সব কিছু ভিজে যেতো। কষ্টের কোন সীমা ছিল না। কিন্তু সাধ্য না থাকায় কষ্ট করে থাকা হয়েছিল। নিজের সামান্য জায়গা হবে পাকা ঘর হবে এটা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের দিকে তাকিয়েছেন বলে ওইসব কিছু হয়েছে। উপহারের সেমিপাকা ঘর বরাদ্দ পেয়ে তার মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠেছে । ঘর পেয়ে কেমন লাগছে, জিজ্ঞেস করায় নাছিমা আক্তার বলেন, আজ থেকে ৭ বছর আগে তার স্বামী মারা যায়। এরপর ছেলে মেয়েকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে ভাঙ্গা কুঁড়েঘরে কষ্ট করে থাকতে হয়েছে। স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি যে, আমি জমিসহ ইটের একখানা নতুন ঘর পাবো। শেখ হাসিনার সরকার আমাকে ইটের ঘর দিবেন। এই বয়সে ইটের ঘরে থাকতে পারবো। অন্তত নিজের বলে তো কিছু একটা আছে এটা বলতে পারছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছেন। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি ঘর পেয়ে। দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা যেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সব সময় ভালো রাখে।

এ উপলক্ষে আখাউড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ ভূমিহীন পরিবারের লোকজন স্বত:স্ফুর্ত ভাবে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: রুহুল আমীন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আক্তারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন অফিসার ইনচার্জ মো. মিজানুর রহমান, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাডতি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মো. সেলিম ভূইয়া, মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ জামদে শাহ, প্রকল্প বাস্তবায়ক কর্মকর্তা তাপস চক্রবর্তী, সহকারী কমিশনার ভূমি মো. সাইফুল ইসলাম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানা বেগম, জেলা পরিষদ সদস্য আতাউর রহমান নাজিম, উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক মো. আব্দুল মমিন বাবুল, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন বেগ শাপলু প্রমূখ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আক্তার বলেন আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় এ উপজেলায় মোট ৬৫৩টি ঘর নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে প্রথম ধাপে ৪৫ টি ও দ্বিতীয় ধাপে ৫০টি উপকারভোগী পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তৃতীয় ধাপে ৪৩ টি ঘর নির্মাণ করে তবে উপকারভোগীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। এরমধ্যে প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, রিকশাচালক, দিনমজুর, বিধবা, কাজের মহিলাসহ গৃহহীন পরিবার রয়েছে।
প্রতিটি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের জন্য থাকছে দুই কক্ষ বিশিষ্ট আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এসব ঘর। চৌচালা বিশিষ্ট রঙিন টিনের ঘর , প্লেন শিটের জানালা, ও দরজা, ইটের দেয়াল,এবং পাকা মেজ রয়েছে। সবগুলো বাড়ি সরকার নির্ধারিত একই নকশায় করা হচ্ছে। রান্নাঘর, সংযুক্ত টয়লেট, টিউবওয়েল, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সুবিধা থাকছে এসব বাড়িতে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ভূমি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা দফায় দফায় গৃহ নির্মাণ কাজ পরিদর্শনসহ নিয়মিত খোঁজ খবর রাখেন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসহায় পরিবারের জন্য উপহার স্বরূপ এসব নির্মাণ করে দেওয়া হয় । সরকারের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং কোনো মানুষ যেন গৃহহীন না থাকেন। তিনি আরো বলেন তৃতীয় ধাপে এই উপজেলায় ৪৩টি ঘর ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ উপজেলার সব ভূমি ও গৃহহীনদের এ কর্মসুচির আওতায় আনা হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads