স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সেবা প্রদানের মাধ্যমে পরিণত ও উন্নত অবস্থানে উপনীত হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যত সমৃদ্ধির অভিযাত্রী হয়ে সরকারের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে গর্বিত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এমন মন্তব্য করেছেন বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আহমদ শামীম আল রাজী। বাংলাদেশের খবরকে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নৌপথ উন্নয়নে বাস্তবসম্মত প্রকল্প নেওয়া এবং দ্রুত অর্থছাড় করিয়ে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে বিআইডব্লিউটিসি কাজ করে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে বিআইডব্লিউটিসি প্রযুক্তির সাথে উন্নয়নের পথে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে
স্বাধীনতার ৫০ বছরে বিআইডব্লিউটিসির সফলতা সম্পর্কে আহমদ শামীম আল রাজী বলেন, বিআইডব্লিউটিসি সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বায়ত্তশায়িত সেবাধর্মী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে দেশের সার্বিক যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির ২৮নং আদেশ অনুযায়ী ১৯৭২ সালে তদানীন্তন ১টি সরকারি ও ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একীভূত করে ৬১১টি বাণিজ্যিক ও সহায়ক জাহাজ নিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বর্তমানে এ সংস্থা ১৬২টি নৌযানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সৃষ্টিলগ্নে বিআইডব্লিউটিসি সরকারি বেসরকারি যেসব ১০টি প্রতিষ্ঠানের জাহাজ, সম্পদ ও সম্পত্তিপ্রাপ্ত হয়েছিল সেগুলোর অধিকাংশই ছিল জরাজীর্ণ ও পুরনো।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিআইডব্লিউটিসি নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌ, রেল, সড়ক ও আকাশপথের সমন্বিত যোগাযোগ সমম্প্রসারণে মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের রোলমডেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। দেশের অভ্যন্তরীণ, উপকূলীয় ও উপ-আঞ্চলিক নৌরুটে যাত্রীবাহী, তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নদীসংযোগে ফেরি সার্ভিস পরিচালনার মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে কাজ করে আসছে। গত ৫০ বছরে উল্লিখিত সার্ভিস প্রদানের বর্ধিত কলেবরে সংস্থার বহরে বিআইডব্লিউটিসির পুরনো জাহাজের পরিবর্তে নতুন নতুন জাহাজ সংগ্রহ ও নির্মাণ করতে হয়েছে। যুগপোযোগী জাহাজ নির্মাণ, পরিচালনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিআইডব্লিউটিসি দিনে দিনে সমৃদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে বিআইডব্লিউটিসি সেবা প্রদানের মাধ্যমে পরিণত ও উন্নত অবস্থানে উপনীত হবার পাশাপাশি ভবিষ্যত সমৃদ্ধির অভিযাত্রী হয়ে সরকারের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে গর্বিত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর কি কি প্রকল্পের সফলতা লাভ করেছেন এবং বআইডব্লিউটিসির পরিকল্পনার বিষয়ে আহমদ শামীম আল রাজী জানান, এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় (১৯৪০১৭.২৯ লক্ষ টাকা) প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘Strengthening the Capacity of BIWTC’ শীর্ষক একটি পাইলট প্রকল্প বা পিডিপিপি গত ১৭ মে পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে। উল্লেখিত প্রকল্পের আওতায় ৪টি কোস্টাল কাম প্যাসেঞ্জার ফেরি, ৮টি ইমপ্রুফভড মিডিয়াম টাইপ ফেরি, ৬টি মিডিয়াম টাইপ ফেরি, ৬টি ইউটিলিটি টাইপ ফেরি, ৮টি ডাবল ফিঙ্গার রো রো পন্টুন, ২টি কনভেনশনাল পন্টুন, ১টি ১ হাজার ৮০০ মে. টন ক্যাপাসিটির ফ্লোটিং ডক, ৬টি ৪ হাজার D.W.T ক্যাপাসিটির মাল্টিপারপাস কার্গো ভেসেল ও ৪টি ২ হাজার ৫০০ D.W.T ক্যাপাসিটির মাল্টিপারপাস কার্গো ভেসেল নৌযান নির্মাণ করা হবে।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড নং-৩ এ একটি ড্রাই ডক এবং ডকইয়ার্ড নং-৪ এ একটি ওয়ার্কশপ স্থাপন, জাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নারায়ণগঞ্জে ২টি জেটি নির্মাণ, পাটুরিয়া ফেরিঘাট, মানিকগঞ্জে ওয়ার্কশপ, অপারেশন অফিস, স্টাফ ডরমেটরি ইত্যাদি নির্মাণ ও খুলনা অঞ্চলে কর্মরত ইঞ্জিন ও ডেক কর্মকর্তা, নাবিক, ফ্লোটিং স্টাফের জন্য অফিস-কাম-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনসহ অবকাঠামো উন্নয়ন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
চীন সরকারের অর্থায়নে ২৫৫৭৩.০০ লক্ষ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘Procurement of 10 Nos. Shallow Draft Utility Ferry and 6 Nos. of Sea-track for BIWTC’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। খসড়া পাইলট প্রকল্প বা পিডিপিপি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ৬টি সি-ট্রাক সংগ্রহ ও ১০টি শ্যালো ড্রাফট ইউটিলিটি টাইপ নৌযান ফেরি সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওয়াটার বাস সর্ম্পকে তিনি বলেন, সচল ওয়াটার বাসগুলো চার্টারের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থার মোট ওয়াটার বাসের সংখ্যা ১২ (বার)টি । এর মধ্যে সচল ৫টি ওয়াটার বাস চার্টারের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে । বাকি ৭টি ওয়াটারবাস সংস্থার নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন ডকে মেরামতাধীন আছে।
‘এম.ভি বাঙালি’ জাহাজসহ জাহাজ সেক্টরে লাভ না লোকসান বিষয়ে আহমদ শামীম আল রাজী বলেন, বিআইডব্লিউটিসি একটি সেবামূলক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। নিরাপদ নৌচলাচল ও উন্নত যাত্রীসেবা প্রদান করাই সংস্থার মূল লক্ষ্য। বিআইডব্লিউটিসি অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌরুটে যাত্রীবাহী জাহাজ ও সি-ট্রাক পরিচালনার মাধ্যমে যাত্রীসেবা পরিচালনা করে। সরকারের পিআরএসপি, এলডিসি ও এসডিজি বাস্তবায়নে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, ব্যবসা, বাণিজ্য ও যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক ভর্তুকি দিয়ে এ সার্ভিস পরিচালনার করা হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তাদের মধ্যে ওভারটাইম বিল প্রদানের সুযোগ নেই। কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত কাজ করলেও ওভারটাইম বিল প্রাপ্য হন না। ফলে বিষয়টি ভিত্তিহীন। তবে সংস্থায় বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত করণিক ও অকরণিক কর্মচারীরা ওভারটাইম বিল প্রাপ্য হয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী করপোরেশনের কাজের স্বার্থে তার স্ব-স্ব নিয়ামক কর্মকর্তার সুপারিশের ভিত্তিতে অতিরিক্ত কাজ করে থাকেন। আর এ অতিরিক্ত কাজের ফলে তারা নিয়ামক কর্মকর্তার সুপারিশের ভিত্তিতেই ওভারটাইম বিল প্রাপ্য হন। এক্ষেত্রে কাজ না করে ওভারটাইম বিল প্রদানের কোনো সুযোগ নাই।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, ‘গাড়ি ও বাঙ্কার গায়েব করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ’ বিষয়ে তিনি জানান, করপোরেশনের স্বতন্ত্র ফুয়েল সেল হতে বিভিন্ন সময়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জাহাজে জ্বালানি তেল সরবরাহের ফান্ড প্রধান কার্যালয় হিসাব বিভাগে চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ফান্ড প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়। উক্ত ফান্ড দিতে করপোরেশনের স্ব স্ব অঞ্চলের বাংকারিং কমিটি (তেল সরবরাহ কমিটি) সরকারি পেট্রোলিয়াম করপোরেশন হতে পে-অর্ডারের মাধ্যমে তেল ক্রয় করে পরিবহন ঠিকাদারের মাধ্যমে স্ব স্ব অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে কমিটির উপস্থিতিতে জলযানে তেল সরবরাহ করা হয়। হিসাব বিভাগ ফান্ড প্রেরণ এবং পে-অর্ডার করার কাজ সম্পন্ন করে থাকে জলযানে তেল সরবরাহের দায়িত্ব স্ব স্ব অঞ্চলে কমিটি সরেজমিনে উপস্থিত থেকে পতিপালন করে থাকেন।
প্রাইভেট ডকইয়ার্ডে জাহাজ মেরামত সম্পর্কে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান বলেন, বিআইডব্লিউটিসির ৩টি ডকইয়ার্ড আছে- ডকইয়ার্ড-১, ডকইয়ার্ড-২ ও ডকইয়ার্ড-৩ এবং ১টি ফ্লোটিং ডকইয়ার্ড আছে। ডকইয়ার্ড-১-এর স্লিপওয়ের লিফটিং ক্ষমতা-৫০০ মেট্রিক টন, ডকইয়ার্ড-২ এর স্লিপওয়ের লিফটিং ক্ষমতা-৭৫০ মেট্রিক টন, ডকইয়ার্ড-৩ এর স্লিপওয়ের লিফটিং ক্ষমতা-১০০ মেট্রিক টন, ফ্লোটিং ডকইয়ার্ড এর লিফটিং ক্ষমতা-৭৫০ মেট্রিক টন। যে সমস্ত নৌযান এর লাইট ওয়েট ৫০০ মেট্রিক টন এর নিচে সে সমস্ত নৌযান ডকইয়ার্ড-১ এ ডকিং করে মেরামত করা হয়। যে সমস্ত নৌযান এর লাইট ওয়েট ৭৫০ মেট্রিক টন এর নিচে সে সমস্ত নৌযান ডকইয়ার্ড-২/ ফ্লোটিং ডকইয়ার্ড এ ডকিং করে মেরামত করা হয়। যে সমস্ত নৌযান এর লাইট ওয়েট ১০০ মেট্রিক টন এর নিচে সে সমস্ত নৌযান ডকইয়ার্ড-৩ এ ডকিং করে মেরামত করা হয়।
ডকইয়ার্ড-১ এ সর্বোচ্চ ২টি নৌযান, ডকইয়ার্ড-২ এ সর্বোচ্চ ২টি নৌযান, ডকইয়ার্ড-৩ এ ১টি নৌযান, ফ্লোটিং ডকইয়ার্ড এ ১টি নৌযান ডকিং করা যায়। বিআইডব্লিউটিসির ডকইয়ার্ডগুলোতে একই সময়ে সর্বমোট-৬টি নৌযান ডকিং করে মেরামত করা সম্ভব। কিন্ত্ত একই সময়ে মেরামতের জন্য আসে ১০-১২ টি নৌযান। যে সমস্ত নৌযানের লাইট ওয়েট বেশি হওয়ায় বিআইডব্লিউটিসির ডকইয়ার্ডগুলোতে ডকিং করা সম্ভব হয় না সে সমস্ত নৌযান এবং বিআইডব্লিউটিসির ডকইয়ার্ডগুলোতে ৬টি নৌযান মেরামতাধীন থাকার পর মেরামতের জন্য আসা অবশিষ্ট নৌযানগুলো পিপিআর-২০০৮ মোতাবেক ওটিএম/ডিপিএম পদ্ধতিতে প্রাইভেট/সরকারি ডকইয়ার্ডগুলোতে মেরামতের নিমিত্ত দেওয়া হয়।
বিনা টিকিটে লুজ যাত্রী পারাপার সম্পর্কে তিনি জানান, যানবাহনের আরোহী যাত্রী ব্যতীত অন্যান্য যাত্রিসাধারণকে (লুজ যাত্রী) টিকিটের মাধ্যমে ফেরি পারাপার হন। এ সকল যাত্রী সাধারণের পারাপারের জন্য বিআইডব্লিউটিসি মনোনীত টিকিটিং এজেন্ট ঘাটে ফেরি পারাপারের টিকিট প্রদান করে থাকে। ঈদসহ জাতীয় দিবসসমূহ ও উৎসবে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের ২১ টি জেলার বিভিন্ন গন্তব্যের মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য ফেরি পারাপার হন। বিআইডব্লিউটিসি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যানবাহন পারাপারের পাশাপাশি জরুরি রোগী ও লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স, পচনশীল পণ্যবাহী গাড়ি পারাপারে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বিআইডব্লিউটিসির যাত্রীবাহী জাহাজ ও ফেরি সার্ভিসের ভাড়া শতকরা ২০ ভাগ পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৯ জুন সকাল ৬ টা হতে সবধরনের যানবাহনের জন্য এ ভাড়া কার্যকর করা হয়েছে।





