পড়ালেখা ছেড়ে গেম খেলায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

সারা দেশ

পড়ালেখা ছেড়ে গেম খেলায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা

  • কাজী মফিকুল ইসলাম, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
  • প্রকাশিত ৫ জুন, ২০২১

এক সময় স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ালেখার বাইরে নিয়মিত ফুটবল, ক্রিকেট, বলি বলসহ নানা প্রকার খেলা ধুলায় খুবই মনোযোগী ছিল। পাশাপাশি কিশোর যুবকরাও খেলাধূলায় ব্যস্ত সময় কাটাতো। নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী পড়াশুনা গল্প আর খেলাধুলা তারা করতো। কিন্তু এসব করতে গিয়ে কেউ সারা রাত জাগেনি বা নাওয়া খাওয়া সব কিছু ভুলে যায়নি। তবে বর্তমানে প্রাণঘাতী করোনা মহামারির কারণে সারাদেশের ন্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তৃণমুল পর্যায়ে অনলাইন ভিত্তিক মোবাইল গেমসে আসক্ত হয়ে পড়ছেন স্কুল কলেজ শিক্ষার্থী, শিশু কিশোর , তরুণ যুবকরা। বিশেষ করে তারা ফ্রি ফায়ার বা পাবজি নামক গেমের আসক্তি হয়ে  দিন দিন বিপজ্জনক  অবস্থায়  পৌঁছে যাচ্ছে। এখন যেন তাদের কাছে  ব্যয়বহুল গেমসটি অবসর বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে যেন পরিণত হয়ে উঠেছে। স্থানীয় অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখে এসব তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষার্থী, তরুণ , কিশোর যুবকরা এ ভয়ংকর আসক্তিতে মেতে উঠায় অভিভাবকরা তাদের উঠতি বয়সের ছেলেদের নিয়ে এক প্রকার দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন। সরকার যদি ওই সব বন্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করে তাহলে বড় ধরনের মাশুল গুণতে হতে পারে।

একাধিক অভিভাবক  অভিযোগ করে বলেন, ফ্রি ফায়ার বা পাবজি নামক গেমের আসক্ত হয়ে তাদের সন্তানরা খাওয়া-ঘুমে অনেকটাই যেন অমনযোগী  হয়ে উঠছেন। যখন তাদের খাওয়ার দরকার তখন তারা ঘুমাচ্ছে। পড়ার সময় দরজা বন্ধ করে রাখছেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্য থেকে তারা অনেকটাই যেন আড়াল করে চলতে চেষ্টা করছে। এমন একটা পর্যায়ে চলে এসেছে তাদের সময় নেই কারোর সঙ্গে গল্প বা কথা বলার। বাড়িতে পড়া লেখা প্রাইভেট সব কিছু যেন ভেস্তে যেতে চলেছে।

এদিকে ফ্রি ফায়ার বা পাবজি নামক গেমের একাধিক আসক্ত থেকে জানা যায়, ফ্রি ফায়ারে ব্যবহৃত বিভিন্ন চরিত্র ও অস্ত্র ব্যবহৃত হয়, যা সম্পর্কে অনেক পেশাদার সন্ত্রাসীরাও ওয়াকিবহাল নয়। এই খেলার এক একটা চরিত্র কিনতে তাদের ভালো টাকা খরচ করতে হয়। 

সরেজমিনে পৌর শহরের তারাগন, দেবগ্রাম, খড়মপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী , কিশোর তরুণ ও যুবকরা মাঠে, রাস্তার পাশে গাছের নিচে, পুকুর পাড়ে দল বেঁধে বসে সবাই যেন কিছু একটা করছে। কৌতূহল নিয়ে তাদের কাছে গেলে দেখা যায়, অনেকের হাতেই স্মার্টফোন রয়েছে।  তারা যেন কিছু একটা করে ব্যস্ত রয়েছেন।  জিজ্ঞেস করা মাত্র কষ্টে  উত্তর দেয় তারা  গেম খেলছে।

এই গেম খেলার জন্য শুধু মোবাইল ইন্টারনেট কেনার জন্যই তাকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ব্যয় করতে হয়। অনেক সময় ফ্রি অফারে স্বল্প টাকায় কেনা হচ্ছে এমবি। পাশাপাশি গেমে প্রতিযোগীদের হারিয়ে ভালো অবস্থান তৈরিতে বিভিন্ন উপকরণ (যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, চরিত্র প্রভৃতি) কিনতেও অনেকে টাকা খরচ হয় তাদের। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, একটি অসাধু চক্র ফেসবুকে গ্রুপ ও পেজ খুলে বিকাশ এবং নগদের মাধ্যমে এসব উপকরণ বিক্রি করছে। তবে অনলাইন গেমিংয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম হচ্ছে 'পাবজি'। তবে পাবজির স্থান ধীরে ধীরে দখল করছে ফ্রি ফায়ার। মূলত স্কুল-কলেজ বন্ধের সুযোগে শিশু-কিশোররা এ ধরনের সহিংস গেমে আসক্ত হয়ে উঠছে।

পৌর শহরের শিক্ষার্থী মো. তাজুল ইসলাম, মো. রনি ও সোহরাব হোসেন বলেন, তারা তিনজনই স্থানীয় কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। করোনার কারণে কলেজ বন্ধ থাকায় তাদের পড়ালেখার চাপ নেই বলে জানায়। বাড়ি ওয়াইফাই থাকায় বন্ধুদের সাথে গেমস খেলে সময় কাটান বলে জানায়।

প্রবাসী মো. আবু তাহের মিয়া বলেন,তার একমাত্র ছেলে মো. শামস এবার নবম শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলেকে দেখে কথা বলতে ও সব সময় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাড়ির খবরাখবর নিতে একটি দামী মোবাইল ফোনসেট কেনা হয়।কিন্তু এই মোবাইল ফোনটি নিয়মিত তার ছেলে ব্যবহার করছে। স্কুল বন্ধ থাকায় সারাক্ষণ বাড়িতে থাকলেও বেশীরভাগ সময় তার মোবাইলে গেমস খেলে চলে যায়। আগে সে মানুষের সাথে কথা বলতো মিশতো এখন দেখছি অনেক কমে গেছে। এ অবস্থায় ছেলে নিয়ে খুবই দুঃশ্চিন্তায় রয়েছি।

মো. লিয়াকত হোসেন বলেন, করোনার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাস করা হবে বলে ছেলেকে একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন সেট কিনে দেওয়া হয়। কিন্তু অনলাইন ক্লাসে যেন তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। সবসময় মোবাইলে খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। করোনার আগে তার ছেলে নিয়মিত স্কুলে যেতো, পড়াশুনা করত, শরীরের প্রতি ভাল যত্ন ছিল। এখন যেন সব কিছুতেই তার অমনযোগী হয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষক মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক কিশোর-তরুণ-যুবক ও শিক্ষার্থীরা  গেম খেলায় আসক্তি হয়ে পড়ছেন।  যে ভাবে তারা আসক্ত হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে খুবই কষ্ট হবে। এখনই সময় অভিভাবকদের সচেতন হওয়া। তাদের সন্তানরা কি করছে কোথাই যায় রাত জেগে থাকে কি না এসব বিষয় তাদের লক্ষ্য না রাখলে এর মাশুল গুনতে হবে।

আখাউড়া সচেতন নাগরিক উন্নয়ন ফোরামের সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মুসলেহ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, করোনার এই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের সুযোগে অনেক শিক্ষার্থী  মোবাইলে গেম খেলায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন।  দিন রাতের বেশী ভাগ সময় তারা খেলায় থাকায় অমনযোগী হয়ে পড়ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শ্যামল চন্দ ভৌমিক বলেন, একটানা ধীর্ঘ সময় মোবাইলে গেমস খেললে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হতে পারে। দৃষ্টি শক্তি হ্রাস, মানষিক বিষন্নতাসহ নানা প্রকার রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিভাবকরা যদি সচেতন হয়ে  তাদের সন্তানদেরকে ওইসব গেমস থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads