কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই। এর পরও যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে তুলেছেন অপরাধ সিন্ডিকেট। রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকার তিনটি মার্কেট নিয়ন্ত্রণে রেখে আয় করেছেন কয়েকশ কোটি টাকা। দেশে অনলাইন ক্যাসিনোর সূত্রপাতও তার হাত ধরেই। তার নাম দেলোয়ার হোসেন হলেও তাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবাই চেনে ক্যাসিনো দেলু নামে।
আর গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া এলাকা ও দক্ষিণ সিটির নগর ভবনে তার পরিচিতি ‘মার্কেট খেকো দেলু’ নামে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় দেশের টাকা পাচার করে গড়ে তুলেছেন নানা ব্যবসা-বাণিজ্য। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর দেশ ছেড়ে পালালেও বর্তমানে সে মার্কেট বন্ধে নানা কলকাঠি নাড়ছেন। মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে এক প্রকার মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
২০১৭ সালে দেলোয়ার হোসেন দেলুর হাত ধরে দেশে অনলাইন ক্যাসিনোর যাত্রা। বিদেশ থেকে অনলাইন ক্যাসিনোর সরঞ্জাম আমদানি করে ব্যবসা শুরু করেন রাজধানীর পল্টন এলাকার প্রিতম-জামান টাওয়ারের ১৩ ও ১৪ তলায়। এ ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য লোকও আনা হয় নেপাল থেকে।
সূত্র জানায়, প্রিতম-জামান টাওয়ারে অনলাইন ক্যাসিনো চালুর পরে এটি জনপ্রিয় করতে নানা উদ্যোগ নেন দেলু। খাদ্য ও পানীয় ফ্রি সরবরাহ করা হতো এখানে। এ ছাড়া ছিল নানা লোভনীয় অফার। এভাবে কেবল অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমেই দেলু আয় করেন কয়েকশ কোটি টাকার ওপরে। দেলুর কয়েক ঘনিষ্ঠজন জানান, মালয়শিয়ায় সেকেন্ড হোম রয়েছে দেলুর। সেখানকার কেপাং শহরে রয়েছে তার নিজস্ব অফিস। রয়েছে ব্যবসাও। তিনি প্রায় প্রতিমাসেই সিঙ্গাপুর ও মালয়শিয়ায় হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করেন।
জানা যায়, দেলোয়ার হোসেন দেলু নিজেকে একজন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিতেন। রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকার নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা ও জাকের মার্কেটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক থাকায় তার সব অপরাধ নিয়ন্ত্রিত হতো এ স্থান থেকেই। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মার্কেটে না থাকলেও তার নিয়ন্ত্রণ একটুও কমেনি। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কয়েক জন অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন।
নগর ভবন সূত্র জানায়, ২০১২ সালে ফুলবাড়িয়া এলাকার নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা ও জাকের প্লাজা এই তিন মার্কেটের প্রতিবর্গফুট ২০ টাকা দামে ১ লাখ ৩৬ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সম্পত্তি বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে হাত করে অবৈধভাবে এসব বরাদ্দ নেন দেলু। এই তিন মার্কেট বরাদ্দের নামে পুরোটাই দখল করেন তিনি। তার পছন্দসই লোকজন দিয়ে মার্কেট তিনটিতে সমিতিও করেন। তারাই এখন এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন।
দেলু দক্ষিণ সিটির কাছ থেকে লিজ নিয়ে বরাদ্দকৃত দোকান ছাড়াও আরো দোকান নির্মাণ করেন। এসব মার্কেটে নকশার বাইরে গিয়ে অবৈধভাবে গড়ে তোলেন বারোশ দোকান। বাথরুম, বাথরুমের সামনের খোলা জায়গা, লিফটের জায়গা, ফ্লোর স্পেস, বারান্দা, বেজমেন্ট, ক্রেতাদের হাঁটাচলার জন্য রাখা খোলা জায়গা দখল করে এসব দোকান বানানো হয়। তিনটি মার্কেটে বারোশ দোকান তৈরি করে প্রতিটি দোকান থেকে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন দেলু। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় একটি জিডিও করা হয়। কিন্তু জিডি করেই দায় সারেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কেবল দোকান বিক্রিই নয়, বিভিন্ন সময় এসব দোকান মালিকদের কাছ থেকে নানা ছুতোয় আদায় করেন লাখ লাখ টাকা। চার মাস আগে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে এমন দাবি করে প্রতিটি দোকান থেকে আকারভেদে ৫ লাখ থেকে দশ লাখ টাকা আদায় করেন দেলোয়ার হোসেন।
এদিকে অবাক হলেও সত্য এই তিনটি মার্কেটে আলাদা আলাদা সাধারণ সম্পাদক থাকলেও সভাপতি একজনই দেলোয়ার হোসেন দেলু। এ ছাড়া স্থানীয় তিনজন কাউন্সিলরকে ব্যবহার করেও বিভিন্ন সময় টাকা আদায় করেন দেলু। বংশাল থানায় এ সংক্রান্ত একটি মামলাও করা হয়।
মার্কেটের দোকান বিক্রি করে দিলেও অদ্ভুত এক নিয়ম করে সব দোকানের কর্তৃত্ব রাখা হয়েছে দেলুর হাতে। সিটি করপোরেশন মালিক হলেও এসব দোকান বিক্রি, ব্যাংক লোনসহ সব কার্যক্রমে স্বাক্ষর নিতে হয় দেলুর। এসব কাজের জন্যও দিতে হয় আলাদা আলাদা অর্থ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদারের কাছে মার্কেটে দেলুর কর্তৃত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। তবে বলেন, তিনি যা করেছেন খুব একটা ভালো করেননি।
জানা যায়, দেলুর উত্থান হয় ওয়ার্ড কমিশনার সাহাবুদ্দিন হত্যার মধ্য দিয়ে। এর পর শুরু হয় দখল ও চাঁদাবাজি। গড়ে তোলেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী। মার্কেটের সর্বত্র গড়ে তোলা হয়েছে অপরাধের আখড়া। মাদক আর ক্যাসিনো বাণিজ্যের কেন্দ্রও গড়ে তুলেছিলেন মার্কেটে। আর এসবের মাধ্যমে বিদেশে গড়ে তোলেন ব্যবসা। এর বাইরে দেলুর নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি বহুতল ভবন, সেগুনবাগিচায় ১৫টি ফ্ল্যাট, পল্টনের আজাদ প্রোডাক্টস বিল্ডিংয়ে নিজস্ব বাণিজ্যিক অফিস রয়েছে।
এদিকে ফুলবাড়িয়া জাকির সুপার মার্কেট-২-এ দেলুর বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়ার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বেশ কয়েকদিন বিক্ষোভ করলেও সরানো যায়নি তাকে। দেলু প্রভাব খাটিয়ে মার্কেটের উচ্ছেদ করা দোকানগুলো ফের ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেলুর সহযোগী জামাল হোসেন প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়ে মার্কেটের উন্নয়নের নামে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেলুর একদল সন্ত্রাসী বাহিনী মার্কেটে প্রবেশ করে উচ্ছেদ হওয়া স্থানগুলো ফের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় মার্কেট সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীরা বাধা দেন। এর আগেও দেলুর লোকজন এসে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রস্তাব দেন, সিটি করপোরেশনের ভেঙে দেওয়া দোকানগুলো তারা আবার নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেবেন। এ জন্য তারা মেয়রের অনুমোদন নিয়ে আসবেন বলেও ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দেন।
ব্যবসায়ীরা বলেন, দেলুর অনুসারীদের এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন মার্কেটের অন্যান্য বৈধ ও উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, এই মার্কেট নিয়ে অনেক হয়েছে। তারা আর বদনাম নিতে চান না। ভেঙে দেওয়া দোকান দখল বা পুনর্নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তাতে আবার মার্কেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত দেলু।
তবে এ ব্যাপারে দেলোয়ার হোসেন দেলুর সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।





