ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছিল জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে। কিন্তু ফেনী ছেড়ে যাওয়ার সময় তিনি তার জেদ মিটিয়ে গেছেন সাংবাদিকদের ওপর।
তার অধীন বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) ডেকে কয়েকজন সাংবাদিককে মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। এমনকি প্রায় মীমাংসার পথে থাকা মামলার চার্জশিটেও সাংবাদিকদের নাম ঢুকিয়ে দিতে বাধ্য করেন তিনি। নুসরাত হত্যা রহস্য উদঘাটন ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা তুলে ধরার কারণেই সাংবাদিকদের ওপর এসপি জাহাঙ্গীর অনৈতিকভাবে খেদ মিটিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ওসি জানায়, এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও চার্জশিটে সাংবাদিকদের নাম ঢোকাতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের এসিআর আটকে রাখেন এসপি জাহাঙ্গীর সরকার। এসব মামলার চার্জশিটে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নাম বাদ দিয়ে সুকৌশলে সাংবাদিকদের নাম ঢোকানো হয়।
জানা যায়, এসপি জাহাঙ্গীর ফেনী ছাড়ার আগেই কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এ সময় তিনি এ ঘটনায় তাকে নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন সাংবাদিককে হেনস্তা করার পরিকল্পনা করেন। তাদের নামসংবলিত একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের ধরিয়ে দেন। বিভিন্ন তদন্তাধীন মামলায় সেই সাংবাদিকদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন।
কয়েকজন ওসি কৌশলে তা এড়িয়ে গেলেও অন্যদের এসিআর আটকে রাখার ভয় দেখিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিলের জন্য চাপ দেন এসপি জাহাঙ্গীর। ১২ মে সন্ধ্যায় তার বদলি আদেশ আসার পর তিনি রাতে জরুরি ভিত্তিতে ওসিদের ডেকে চাপ প্রয়োগ করে কয়েকটি চার্জশিট তৈরি করান এবং পরদিন তা দাখিলে বাধ্য করেন। এমনকি বিষয়টি গোপন রাখতেও কোর্ট পরিদর্শকসহ অন্যদের নির্দেশ দেন।
পরে বিভিন্ন সূত্রে এই ঘটনা জানতে পারেন সাংবাদিকরা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় ৩, সোনাগাজী মডেল থানায় ২, দাগনভূঞা থানায় ২ ও ছাগলনাইয়া থানায় ২টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা হয়ে যায়। এসব মামলার অধিকাংশই বাদী পুলিশ। জমা দেওয়া চার্জশিটে দৈনিক ফেনীর সময় ও সাপ্তাহিক আলোকিত ফেনীর সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, দৈনিক অধিকার প্রতিনিধি ও অনলাইন পোর্টাল ফেনী রিপোর্টর সম্পাদক এস এম ইউসুফ আলী, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সোলায়মান হাজারী ডালিম, দৈনিক সময়ের আলো প্রতিনিধি ও দৈনিক স্টার লাইনের স্টাফ রিপোর্টার মাঈন উদ্দিন পাটোয়ারীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলার এজাহারে এদের কারো নাম না থাকলেও বিস্ময়করভাবে চার্জশিটে তাদের নাম ঢোকানো হয়।
এ বিষয়ে ফেনী প্রেসক্লাবের সভাপতি আসাদুজ্জামান দারা বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক চার্জশিট দাখিল খুবই দুঃখজনক ঘটনা। পুলিশ-সাংবাদিক একে অপরের শত্রু নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা পুলিশ এবং সাংবাদিকদের মধ্যে বৈরিতার সৃষ্টি করবে। পেশাদার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশের এমন বিরূপ আচরণ কাম্য নয়।
ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক নুরুল করিম মজুমদার বলেন, এ ধরনের ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক চার্জশিট দেখে আমরা আশ্চর্য ও হতভম্ব হয়েছি। আমরা এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাই। ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আরিফুল আমিন রিজভী বলেন, কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ হয়রানি করার জন্য উদীয়মান তরুণ সাংবাদিকদের মামলায় জড়িয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করার চেষ্টা করে করেছে। এ ধরনের ঘটনা খুবই নিন্দনীয়। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হন ওই প্রতিষ্ঠানের আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত। সেদিনই স্থানীয় জনতা অধ্যক্ষকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় রাফির মা শিরীন আক্তার বাদী হয়ে থানায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা প্রত্যাহার করতে নুসরাত ও তার পরিবারকে হুমকি-ধমকি দেন অধ্যক্ষের সহযোগীরা। একপর্যায়ে ৬ এপ্রিল পরীক্ষার পূর্ব মুহূর্তে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মৃত্যু হয় তার।
ঘটনাটিকে প্রথমে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন সোনাগাজী মডেল থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি (বর্তমানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার) মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। তার পক্ষে অবস্থান নেন পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকার। ঘটনাটি নিয়ে যখন গণমাধ্যম সরব হয়, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নুসরাতের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন, তখনো বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা দেখান এসপি জাহাঙ্গীর।
মামলায় সিরাজ-উদ-দৌলাসহ কয়েকজনকে আসামি করতে এসপি-ওসি টালবাহানা করেন বলে নুসরাতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে। শুধু তাই নয়, পুলিশ সদর দপ্তরেও তিনি (এসপি) ওসির পক্ষে সাফাই গেয়ে চিঠি লেখেন। তাদের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা প্রকাশ পেলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরের পর ঘটনায় জড়িতরা গ্রেপ্তার হতে থাকেন। বেরিয়ে আসে মূল রহস্য।
একপর্যায়ে পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তে এসপি-ওসিসহ চার পুলিশ কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন। ওসি মোয়াজ্জেমকে বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। আর এসপি জাহাঙ্গীর সরকারকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। অপর দুজনকেও প্রত্যাহার করে পার্বত্য এলাকায় সংযুক্ত করা হয়।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দিতে গেলে নুসরাতের সঙ্গে অশোভনীয় আচরণ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করায় এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় বরখাস্ত হওয়া ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। ওই মামলায় কারাগারে রয়েছেন মোয়াজ্জেম। জানা যায়, প্রথমে জবানবন্দি রেকর্ডের বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে ওসি মোয়াজ্জেম তার মোবাইল থেকে ফুটেজটি চুরির অভিযোগ এনে সময় টিভির ফেনী ব্যুরোর রিপোর্টার আতিয়ার হাওলাদার সজলের বিরুদ্ধে জিডি করেন। পরে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সজলও পাল্টা জিডি করেন।





