প্রায় দুই বছর পর ফের চালু হচ্ছে আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচল। ২০২০ সালে মার্চে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ট্রেন পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে কলকাতা স্টেশন থেকে গেদে-দর্শনা হয়ে ঢাকাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস। কলকাতা স্টেশন থেকে পেট্রাপোল বেনাপোল হয়ে খুলনাগামী বন্ধন এক্সপ্রেস ও নিউ জলপাউগুড়ি থেকে চ্যাংরাবান্ধা হয়ে ঢাকাগামী মিতালি এক্সপ্রেস।
বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের রেল মন্ত্রীদের আলোচনার ভিত্তিতে অবশেষে চালু হতে যাচ্ছে মৈত্রী এক্সপ্রেস ও বন্ধন এক্সপ্রেস। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আগামী বুধবার (২০ এপ্রিল) বা এক-দুদিন আগে-পরে এই পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষ বাংলা নববর্ষেই এই ট্রেনটি চালু করতে চেয়েছিল, তবে ভারতের দিকে জটিলতা রয়ে গেছে বলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো কিছুটা সময় লাগছে।
এ বিষয়ে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ না জানালেও দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহম্মদ ইমরান গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, শিগগিরই আবার এই ট্রেন চলাচল শুরু হবে। আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আবার মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়ে যাবে।
এদিকে বাংলাদেশে রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার বলেছেন, দুই দেশ এক মত হয়েছে মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেস চালু করার। কিন্তু সঠিক দিন চূড়ান্ত না হলেও শিগগিরই আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচলের দিন ঠিক হবে। সম্ভবত চলতি মাসের মধ্যে দিন ক্ষণ ঠিক হবে বলে ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদার জানান।
ঢাকা-কলকাতার মধ্যে চলাচলরত ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ এর বাংলাদেশি রেক . ঢাকা-কলকাতা নং-৩১০৭, কলকাতা - ঢাকা নং ৩১০৮। ভারতীয় রেক. কলকাতা-ঢাকা নং-৩১০৯, ঢাকা-কলকাতা নং-৩১১০। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট হতে কলকাতার প্রকৃত দূরত্ব ৩৯৬ কিলোমিটার এবং আদায়যোগ্য ভাড়ার দূরত্ব ৫৩৮ কিলোমিটার। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-দর্শনার দূরত্ব ২৭৬ কিলোমিটার এবং দর্শনা-কলকাতার দূরুত্ব ১২০ কিলোমিটার । ঢাকা-দর্শনার দূরত্ব ২৮৮ কিলোমিটার।
বাংলাদেশি রেক ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ছাড়বে শুক্রবার ও রোববার। কলকাতা থেকে ছাড়বে -শনিবার ও সোমবার। ভারতীয় রেক কলকাতা ছাড়বে- শুক্রবার ও মঙ্গলবার। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ছাড়বে-শনিবার ও বুধবার। যাত্রার পূর্বের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা/সরকারি আদেশ প্রদর্শন সাপেক্ষে ঢাকা স্টেশন থেকে ট্রেনের টিকিট নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় করা যাবে (চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে যাত্রা শুরুর ৩৬ ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত একই নিয়মে টিকিট ক্রয় করা যাবে) বলে রেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে।
সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মৈত্রী এক্সপ্রেসের এসি সিট ও এসি চেয়ার এই দুই শ্রেণির টিকিট নিয়ে যাওয়া যাবে। এসি সিট রেলওয়ের প্রাপ্য ভাড়া ভ্যাটসহ ৩ হাজার ৫ টাকা, এর মধ্যে ৫শ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্সসহ মোট ভাড়া ৩ হাজার ৫০৫ টাকা। আর এসি চেয়ার রেলওয়ের প্রাপ্য ভাড়া ২ হাজার ৫ টাকা এবং ৫শ টাকা ট্যাক্সসহ মোট ২ হাজার ৫০৫ টাকা।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বন্ধুন এক্সপ্রেসের ভাড়াও দুই শ্রেণির যাতায়াত করা যায়। এসি সিট রেলওয়ের প্রাপ্য ভাড়া ভ্যাটসহ ১ হাজার ৫০৫ টাকা, ৫শ টাকা ট্রাভেলস ট্যাক্সসহ মোট ২০০৫ টাকা। আর এসি চেয়ার রেলওয়ের প্রাপ্য ভাড়া ভ্যাটসহ ১ হাজার ৫ টাকা, ট্রাভেল ট্রাক্স ৫০০ টাকাসহ মোট ১ হাজার ৫০৫ টাকা। ৫ (পাঁচ) বছর বয়স পর্যন্ত শতকরা ৫০ ভাগ কম।
২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্বের সম্মান হিসেবে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করা হয়। মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা ও খুলনার মধ্যে যাতায়াতকারী বন্ধন এক্সপ্রেসও আবার চালু করা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত সরকার এটিতেও সবুজ সংকেত দিয়ে দিয়েছে, ফলে দুটি ট্রেনই কাছাকাছি সময়ে আবার যাত্রা শুরু করবে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত যাত্রীরা নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন, তাদের জন্য এটা একটা সুখবর। কারণ এই রুটে ফ্লাইটের ভাড়া তাদের অনেকেরই সাধ্যের বাইরে। আর ট্রেন সার্ভিস চালু হলে তুলনামূলক অনেক কম ভাড়ায় তারা আবার দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করতে পারবেন। এছাড়া ভারত সম্প্রতি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা দিতে শুরু করায় এই রুটে যাত্রীদের বিপুল চাপ থাকবে বলেও ধারণা করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে গত সোমবার দিল্লির নর্থ ব্লকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেস চালু করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছাড়াও সেখানে ভারতীয় রেল, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা যোগ দেন।
মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের রুটে ভারতের দিকে যে তিনটি ট্রানজিট পয়েন্ট পড়ে, সেই চিতপুর (কলকাতা), গেদে ও হরিদাসপুর রেল স্টেশনকেও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়া ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত যে ট্রেন চালানোর বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে, সেটাও আগামী মাসের মধ্যেই (মে) ‘গ্রিন সিগনাল’ পেয়ে যাবে বলে আভাস মিলেছে। এই ট্রেন চালু হলে বাংলাদেশ থেকে পর্যটকরা সরাসরি শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং, কার্শিয়াং-কালিম্পং কিংবা সিকিমের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে পারবেন। হিমালয় চলে আসবে তাদের হাতের নাগালে।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য মৈত্রী এক্সপ্রেস অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ট্রেন। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা করাতে যান লাখ লাখ মানুষ। তার মধ্যে অনেকের নানা শারীরিক জটিলতার কারণে বিমানে চড়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। অনেকের বিমানের টিকিট কাটার সামর্থ থাকে না। আবার সড়কপথে বাসে কলকাতা আসার ধকল নিতে পারে না শরীর। এই পরিস্থিতিতে তাদের একমাত্র ভরসা দুদেশের সংযোগ রক্ষাকারী ট্রেনগুলো বলে দাবি হরেছেন রেল কর্তৃপক্ষ।





