বৈশ্বিক বিপদ আর আতঙ্ক করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে মানুষ নিজ নিজ ঘরে অবরুদ্ধ থাকছে নিরুপায় হয়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মত আমাদের দেশেও চলছে লকডাউন। সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণদের ঘরে থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে সপ্তাহ যেতে না যেতেই মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে অবরুদ্ধ ঘরে। বিশেষ করে দুরন্তপনায় মেতে উঠা শিশু কিশোর পড়েছে বেশি বেকায়দায়। তাই সব বাধা নিষেধ অমান্য করে শিশু কিশোররা ঘরের বাইরে খেলার মাঠে নেমে পড়ে। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সে ঝুঁকি কমাতে অনন্য এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কালিয়াকৈর সার্কেলের এএসপি (সহকারি পুলিশ সুপার) মোহাম্মদ আল মামুন।
তিনি বিভিন্ন খেলার মাঠে ঘুরে ঘুরে শিশু কিশোরদের করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতার বিষয়ে সচেতন করছেন। এ সময় ঘরে থাকলে কি ভাবে এ মহামারী রোগ করোনা সংক্রমণ রোধ করা যাবে তাও তুলে ধরছেন শিশু কিশোরদের মাঝে। ঘরে না থাকলে কি ভয়ঙ্ককর আকার ধারণ করবে করোনা ভাইরাস তা বুঝিয়ে বলা হচ্ছে তাদের। এমন সচেতনতায় শিশু কিশোররা উদ্বুদ্ধ হয়ে আগামী দিনগুলো ঘরে থাকার অঙ্গীকার করছে। ঘরে বসে যেন ভাল সময় কাটে সে জন্য শিশু কিশোরদের মাঝে ভাল মানের শিক্ষনীয় বই তুলে দিচ্ছেন। শিশু কিশোররাও দারুন খুশি মনের মত বই পেয়ে। এমন মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সবাই।
স্থানীয়রা জানান, যে সব মাঠে শিশু কিশোররা বিভিন্ন খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকে সে সব মাঠেই হাজির হোন পুলিশ কর্মকতা মোহাম্মদ আল মামুন। প্রথমে পুলিশের উপস্থিতি দেখে দ্বিগবিদ্বিক দৌঁড়ে পালাতে থাকে মাঠে আসা কিশোররা। পরে তাদের ডেকে ভয় ভাঙ্গিয়ে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে তাদের সচেতনামূলক কথা বলেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। ঘরের বাইরে থাকার কুফল ও নির্দিষ্ট কিছু দিন ঘরে থাকলে এর কি সুফল আসবে তা সুন্দর ভাবে শিশু কিশোরদের বুঝিয়ে বলেন। শিশু কিশোররাও মনোযোগ দিয়ে সে সব কথা শুনেন। আলোচনা শেষে ঘরে বসে সময় কাটাতে তাদের মাঝে ভাল মানের শিক্ষনীয় বই বিতরণ করেন পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল মামুন। শিশু কিশোররাও দারুন খুশি পছন্দের সব বই পেয়ে। গত কয় দিন ধরেই তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে গিয়ে খেলার মাঠে বই বিতরণ করছেন।
ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আজিজুল হক বলেন, মাঠে খেলাধুলা চলছিল। হঠাৎ পাশেই থেমে গেল পুলিশের জিপ গাড়ি। কিশোরেরা কিছুটা ভয় পেয়ে গেলো। গাড়ি থেকে নেমে এলেন সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল মামুন (কালিয়াকৈর সার্কেল)। তিনি শিশু কিশোরদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দিলেন বই। সবাইকে বললেন, আর কিছু দিন ঘরে থাকতে। তিনি বলেন, বই হাতে দিয়ে কিশোরদের ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে আপদকালীন সময়ের জন্য জমা রাখা হয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সময় শেষ হলে কিশোরদের আবার এগুলো ফেরত দেওয়া হবে।
তিনি আরো জানান সহকারী পুলিশ সুপার শিশু কিশোরদের করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানোর বিভিন্ন কৌশল বুঝিয়ে বলেন। তিনি তাদের এও বলেন, 'এখন সরকারি ব্যবস্থাপনায় টেলিভিশনে পাঠদান করা হচ্ছে। তোমরা টেলিভিশনের পাঠদানে অংশ নাও।
চকপাড়া মেডিকেল মোড় এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি সন্ধ্যায় এ বিষয়টি মেডিকেল মোড় এলাকার বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, কারো কাছ থেকে এভাবে হঠাৎ বই উপহার পাওয়া ওই কিশোরদের কাছে একদমই নতুন। গ্রাম এলাকায় একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে বই পাওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট আলোচিত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু কিশোরেরা অনেক সময় বিকেল হলেই একসাথে খেলাধুলায় মেতে ওঠে। এটা তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বই দিয়ে কিশোরদের ঘরে ফেরানোর কৌশলটি সত্যিই চমৎকার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই পুলিশ কর্মকর্তা (এসআই) বলেন মামুন স্যার সবসময়ই আনন্দবাজ মানুষ। যে কোনো ভাল কাজে সবার আগে থাকতে পছন্দ করেন। নিজেও বই পড়তে পছন্দ করেন। তাই নিজ উদ্যোগে খেলার মাঠে মাঠে গিয়ে শিশু কিশোরদের বই দিয়ে বাড়িতে থাকার পরার্মশ দেন। এ কাজটি তিনি খুবই আনন্দের সাথে করছে। শিশু কিশোররাও দারুন উপভোগ করছে পুলিশের কাছ থেকে বই উপহার পেয়ে।
দুই কিশোর জানান, ঘরে বন্দি থেকে শরীর মন দুই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই সুযোগ করেই মাঠে খেলতে চলে আসি। তবে বই উপহার পেয়ে খুবই আনন্দ লাগছে। ঘরে বসে বই পড়ে ভাল সময় কাটবে। মামুন স্যারের এমন কাজে ধন্যবাদ জানাই। করোনা প্রতিরোধে আগামী সময়টুকু ঘরেই কাটাব বই পড়ে।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি কালিয়াকৈর সার্কেল) মোহাম্মদ আল মামুন বলেন, প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজে বের হলেই বিভিন্ন এলাকার মাঠে মাঠে শিশু কিশোরদের খেলাধুলা করতে দেখি। অথচ করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু কিশোরদের ওপর বল প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। চিন্তা করে দেখলাম তাদের বই উপহার দিয়ে বাড়িতে পাঠানো যায় কিনা। তিনি বলেন, তার নিজের সংগ্রহে ২ শর উপরে শিশু-কিশোরদের জন্যে লেখা বিভিন্ন লেখকের বই আছে। তিনি বইগুলো গাড়িতে রেখে দেন। যেখানেই কিশোরদের খেলতে দেখেন, সেখানেই তিনি তাদের বই উপহার দিয়ে বাড়িতে পাঠান। এ সময় তাদের খেলার সরঞ্জামগুলো স্থানীয়দের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমা রাখা হয়। তিনি আরো বলেন শিশু কিশোরেরা কোমল মনের মানুষ। তাদের বল প্রয়োগ করে নয়, সুকৌশলে ঘরে রাখতে হবে। তারা বই পড়বে, ঘরে বসে দূরশিক্ষণে অংশ নেবে। এভাবে তাদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে'। আশা করি আগামী সময়টুকু কিশোররা ঘরে থেকে বই পড়ে সময় পার করবে। পালা করে আরো বই উপহার দেব শিশুদের।





