জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত নবজাতক বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য যে ভিত রচনা করেছিলেন, আজ তার জন্মশতবার্ষিকী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে তারই কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘ কর্তৃক সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন। এই স্বল্প সময়ে ধ্বংসাবশেষ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে রূপ দেন। ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ এ তালিকাভুক্ত ছিল। ২০১৮ সালে দীর্ঘ ৪৬ বছর পর সিডিপি’র সব শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশ পর পর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণে সক্ষম হলে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। সিডিপি যে তিনটি সূচকের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে, তার সবকটি সূচকেরই শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ : এক. উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার প্রথম শর্ত দেশের জনসাধারণের মাথাপিছু আয় হতে হবে ১২৩০ মার্কিন ডলার, সেখানে বাংলাদেশের জনসাধারণের মাথাপিছু বর্তমান আয় ১৮২৭ মার্কিন ডলার; দুই. মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে ৬৬ পয়েন্ট প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭৫.৩০ পয়েন্ট; তিন. অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোনো দেশের পয়েন্ট ৩৬-এর বেশি হলে সেই দেশকে এলডিসিভুক্ত ধরা হয়। আর এই পয়েন্ট ৩২-এ নেমে আসার পর সেই দেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। সেখানে বাংলাদেশ ভঙ্গুরতার সূচক ২৫.০২-এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। নির্ধারিত মানদণ্ড সফলতার সঙ্গে উতরিয়ে বাংলাদেশ এই বিরল সম্মাননা অর্জন করেছে। জাতির পিতার আজন্মকালের সাধনা ছিল ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ। আজ তার জন্মশতবার্ষিকীতে তার দেশের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তারই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সারা বিশ্বের দরবারে অর্থনীতিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
১৯৭১-এ যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক কাঠামো কেমন হবে, তার একটি যুগোপযোগী আধুনিক রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যা আজ অব্দি বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাঙালির স্বাধীনতার মন্ত্রদাতা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত বঙ্গবন্ধু কিন্তু একদিনও বিশ্রাম নেওয়ার মতো ফুরসত পাননি। ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরদিন ১১ জানুয়ারি দু-দফা মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ১২ জানুয়ারি এবং ওইদিনই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন যা তার সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের মিশন ও ভিশন ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান কেমন হবে তা জাতির পিতা ৩ জানুয়ারি ১৯৭১ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— ‘৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নে কেউ বাধা দিতে পারবে না। ৬ দফার প্রতি জনগণ যে রায় দিয়েছে তা পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই।’
বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনায় চারটি মূলনীতি— গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তরে ধারণ করতেন। তিনি ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বেতার ও টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে ‘কেমন বাংলাদেশ চাই’ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনো অগণতান্ত্রিক কথা নয়। আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নতুন ব্যবস্থার ভিত রচনার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ব।’
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি পুনর্গঠনে তিনি অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত এবং দ্রুততম সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থাকা যুদ্ধাস্ত্র সমর্পণের ব্যবস্থা করেন। তার দক্ষ নেতৃত্বের কারণেই ১৯৭২ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ভারত তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। একটি সর্বজনীন সংবিধান প্রণয়ন করে জাতির পিতা মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর সংবিধানের উপর বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত। এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।’ ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন তিনি উপহার দেন। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই প্রতিপাদ্য বিষয়কে অন্তরে ধারণ করে জাতির পিতা পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎকর্ষ সাধনে ১৯৭৫ সালে ২২ মার্চ ইসলামিক ফাউন্ডেশন নতুন আঙ্গিকে চালু করেন। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের তত্ত্বাবধানে ৬শ বাঙালি মুসলমানকে পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে প্রেরণ করেন। দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক সুবিধার লক্ষ্যে পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত করেন। যার সুবিধা বাংলাদেশ আজও পাচ্ছে।
১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই খুদাকে প্রধান করে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। ১৯৭২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বিশ্ব ব্যাংক, ইউনেস্কো, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭৩ সালে লাভ করে ন্যাম, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইসক্যাপ, এডিবি, রেড ক্রস সদস্যপদ। এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ, ওআইসি, আইডিবি, ফিফা’র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণত অধিবেশনে প্রথম বাঙালি হিসেবে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ভিত রচনা করেন। কৃষি ও কৃষকের উন্নতির লক্ষ্যে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ ও কৃষকদের ৫ হাজার টাকার উপরে কৃষিঋণ মওকুফ করেন। সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দেশে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তিনি ১৯৭৪ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি শিল্প সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ‘শিল্পকলা একাডেমি’ স্থাপন করেন। তার হাতে একটি কানাকড়িও ছিল না। তবু বৈদেশিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন। তাই তো শান্তিতে নোবেল বিজয়ী বিশ্বখ্যাত আইনজীবী সন ম্যাক ব্রাইড বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা শুধু পতাকা পরিবর্তন ও দেশের নতুন নামকরণ বোঝায় না। তার দৃষ্টিতে স্বাধীনতার অর্থ হলো সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও নীতিবোধ সম্পূর্ণ আদর্শবাদ’।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে আমাদের। এর নেপথ্যে রচিত জাতির পিতার উন্নয়ন ভিত।
জিয়াউল হক
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক





