বদলে যাওয়া পুলিশের যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ থেকে। কখনো কাঁধে ঝোলানো, কখনো হাতে। বছরের পর বছর ধরে পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের এভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেখে সবাই অভ্যস্ত। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাইফেল বয়ে বেড়ানোর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশে। উন্নত বিশ্বের আদলে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের দেওয়া হচ্ছে ছোট পিস্তল। এ জন্য বাংলাদেশ পুলিশে সংযোজন করা হচ্ছে ট্যাকটিক্যাল বেল্ট। ছয় চেম্বারের আধুনিক এই ট্যাকটিক্যাল বেল্টেই থাকবে পিস্তল, হ্যান্ডকাফ, অতিরিক্ত ম্যাগাজিন, এক্সপেন্ডেবেল ব্যাটন, পানির পটসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের হাত থাকবে সম্পূর্ণ খালি। এতে বিপদগ্রস্ত মানুষের যে কোনো প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারবে পুলিশ। আবার অপরাধীকে দ্রুত ঘায়েল করতে ট্যাকটিক্যাল বেল্টে থাকা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারবেন অনায়াসেই।
আজ মঙ্গলবার রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ড. বেনজীর আহমেদ পুলিশ সদস্যদের মাঝে বেল্টটি সরবারহ করবেন। এর মধ্যে দিয়ে বদলে যাবে বড় অস্ত্রবহনকারী পুলিশের সেই চিরচেনা দৃশ্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ট্যাকটিক্যাল বেল্টের মূল স্লোগান হলো ‘হ্যান্ডস ফ্রি পুলিশিং’ মানে হাত খালি রাখা। এতে বড় অস্ত্র বহনের ঝক্কিঝামেলা আর থাকবে না। এতে পুলিশের কাজে গতি আসবে, মনোবলও বাড়বে। একই সঙ্গে পুলিশকে দেখতেও আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী লাগবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ সদস্যদের মাঝে ১০ হাজার ট্যাকটিক্যাল বেল্ট সরবরাহ করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে পুরো পুলিশ বাহিনীর সব সদস্যকে এই ট্যাকটিক্যাল বেল্ট দেওয়া হবে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ পুলিশকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলার অংশ হিসেবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি পুলিশে ট্যাকটিক্যাল বেল্টের মতো আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত করতে যাচ্ছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জনবান্ধব পুলিশিংয়ের মূলকথা পুলিশকে কাছের ভাববে সাধারণ মানুষ। বিপদে ভরসা মনে করবে। এ জন্য উন্নত বিশ্বে পুলিশের অস্ত্র সাধারণত প্রয়োজন ছাড়া প্রদর্শন করা হয় না। আবার এমনভাবে পুলিশ সদস্যদের কাছে সংরক্ষণ করা হয়, যেন অপরাধীদের দমনে দ্রুত সেটি ব্যবহার করতে পারে। ট্যাকটিক্যাল বেল্টের কারণে অস্ত্র থাকবে হিডেন (লুকানো)। এতে সাধারণ মানুষের পুলিশের অস্ত্রের দিকে সহজে নজর না পড়ে। ট্যাকটিক্যাল বেল্টে ছয়টি চেম্বার থাকবে। এসব চেম্বারে প্রাথমিকভাবে থাকছে ছোট অস্ত্র, এক্সপেন্ডেবল ব্যাটন, ওয়্যারলেস সেট, ৫০০ মিলিলিটার পানির বোতল ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের জন্য পজ মেশিন। পরবর্তী সময়ে ট্যাকটিক্যাল বেল্টে বডি অন ক্যামেরা, টর্চলাইটসহ প্রয়োজনীয় আরো কিছু ফিচার যুক্ত করা হবে।
ওয়্যারলেস সেটেও আসছে বড় পরিবর্তন। ওয়্যারলেস সেট এখন আর হাতে নিয়ে কথা বলতে হবে না। ট্যাকটিক্যাল বেল্টে যুক্ত ওয়্যারলেস সেটের জন্য কানে হেডফোন এবং পোশাকের কলার অথবা বোতামে থাকবে স্পিকার। কোমরের বেল্টে অস্ত্র ছাড়া বাকি সবকিছু থাকবে। আর পিস্তলের জন্য নির্ধারিত চেম্বারটি ডানপাশের ঊরু বরাবর পরবেন পুলিশ সদস্যরা। প্রাথমিকভাবে কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের ট্যাকটিক্যাল বেল্ট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে এসব ট্যাকটিক্যাল বেল্ট। শুরুতে অপারেশনাল ফোর্স, ফুট ও মোবাইল প্যাট্রল টিম, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ট্যাকটিক্যাল বেল্ট প্রদান করা হবে। ডিএমপির সাত হাজার পুলিশ সদস্যকে এবং সিএমপির তিন হাজার পুলিশ সদস্যকে ট্যাকটিক্যাল বেল্ট প্রদান করা হবে। পরে ধাপে ধাপে সব মহানগর, জেলা পুলিশসহ সব ইউনিটের সদস্যদের ট্যাকটিক্যাল বেল্ট প্রদান করা হবে। তবে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটসহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বড় অস্ত্রের ব্যবহারে পরিবর্তন আসবে না।
পুলিশ জানায়, ডিএমপিতে একই সময়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। আর সিএমপিতে এ সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করছেন। এটি বহন কষ্টসাধ্য। একই সঙ্গে কাঁধে ও হাতে বড় রাইফেল থাকায় সহজে হাত দিয়ে কিছু করা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের। চাইনিজ রাইফেলের পরিবর্তে ‘তরাস’ পিস্তল দেওয়া হবে। তরাসের পাশাপাশি অন্য ছোট পিস্তলও দেওয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ইকুইপমেন্ট-২ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) শহিদুল ইসলাম বলেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বর ডিএমপি ও সিএমপির পুলিশ সদস্যদের মাঝে ট্যাকটিক্যাল বেল্ট প্রদানের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৪ সালে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রংয়ের করা হয়। অন্যদিকে, জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রংয়ের। র্যাবের কালো ও এপিবিএন-এর পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রংয়ের মিশ্রণে। আর এসপিবিএন-এর পোশাকের জামার রং করা হয় ধূসর রংয়ের। প্যান্টও ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের করা হয়। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এসব রংয়ের পোশাক পরেই দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) কিংবা স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রোটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) যে পোশাক রয়েছে, সেই পোশাক নিয়মিত পুলিশের জন্যও করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। তবে, সেটা কবে নাগাদ হবে জানা যায়নি বলে জানা গেছে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (সাপ্লাই) রেজাউল করিম বলেন, এমন কোনো পরিকল্পনার বিষয়ে আমার জানা নেই। পুলিশের সব ইউনিট ও ব্যাটালিয়নের পোশাক এক জায়গা থেকে তৈরির একটি পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চার দলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের পোশাক-বিধি সংশোধন করা হয়। নতুন বিধিতে পুলিশের মনোগ্রাম থেকে নৌকা, ক্যাপ, ব্যাজ ও বেল্ট থেকে নৌকার সঙ্গে বৈঠা বাদ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সেই বিধি আবার পরিবর্তন করে ১৯৮৫ সালের বিধি বহাল করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার।
পুলিশের সব সদস্যের পোশাকের ডান হাতের ওপর অংশে ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ লেখা থাকে। কিন্তু আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) কর্মরত পুলিশের শার্টের ডান হাতে কলম রাখার জন্য তিনটি পকেট রাখা হয়।





