আলিজা ইজেতবেগোভিচ। বসনিয়া- হারজেগোভিনার প্রথম প্রেসিডেন্ট। বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের বুকে ইসলামি চেতনা জাগ্রত করার বীর সিপাহসালার। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন লড়াকু মুজাহিদ, রাষ্ট্রনায়ক, লেখক, আইনজীবী, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী। কর্মজীবনে তিনি ২৫ বৎসর আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল টিটোর সরকারের ধর্মচর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ও জাতীয়বাদী চেতনার লক্ষে সংগ্রাম শুরু করেন তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর জানাযায় এক থেকে দেড় লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল। শুধু তাই নয়, তার পরিবার যে পরিমাণ শোকবার্তা পেয়েছিল তার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪,০০০ হাজার। ইসলামী রাজনীতি বিষয়ক তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেছিলেন। তার বই ‘ইসলাম বিটুইন ইস্ট এন্ড ওয়েস্ট’ ও প্রবন্ধ ‘ইসলামিক ডিক্লেয়ারেশন’ আধুনিক ও পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের ব্যাপারে ব্যপক প্রভাব ফেলেছিল।
তিনি ১৯২৫ সালের ৮ আগস্ট অটোমান সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির মাত্র দু বছর পর বসনিয়ার সামাক শহরের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষগণ ছিলেন বেলগ্রেডের বাসিন্দা। সেখান থেকে তারা সামাকে চলে এসেছিলেন। তাঁর দাদা ছিলেন সামাকের মেয়র-যিনি তাঁর সততা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে মানুষের মনিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিলেন। ইতালীয় ফ্রন্টে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সেনাবাহিনীর হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করেছিলেন তাঁর বাবা। তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার । আলিজা ইজেতবেগোভিচের বয়স যখন প্রায় দুই বছর তখন তার বাবা সপরিবারে সরজেভোতে চলে আসেন। তাঁর মা ছিলেন খুব ধর্মপরায়ণ মহিলা। আলিজা তাঁর এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় বলেছেন, ‘শৈশবে তার কচি মনে তার মা-ই সর্বপ্রথম ঈমানের বীজ বপন করে দিয়েছিলেন।’
তাঁর প্রাথমিক লেখাপড়া বসনিয়ার বয়েজ গ্রামার স্কুলে। কৈশোরে তিনি যখন বয়েজ গ্রামার স্কুলে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর শিক্ষক এবং সমবয়সীদের কাছ থেকে তিনি নতুন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এই সময়েই তিনি কমিউনিজম, দর্শন এবং বিভিন্ন মতাদর্শ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এ সব বিষয়ে তখন তার প্রবল আগ্রহও তৈরি হয়েছিল। এর কয়েক বছর পর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানের পর নতুন করে তাঁর চারপাশের পৃথিবীর সাথে বোঝাপড়া করে পুনরায় ইসলামী চিন্তা-চেতনায় ফিরে আসেন। ইসলামে ফিরে আসার পর তার সেই সময়ের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘একটা সময় স্রষ্টা ব্যতীত মহাবিশ্বকে আমার কাছে অর্থহীন মনে হতে লাগল।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ইয়াং মুসলিমস নামে একটি সংগঠনে যোগ দান করেন। এটি ছিল এমন একটি সংগঠন। যা সেই সময়ের ধসেপড়া মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক ও রাজনীতি বিষয়ে কাজ করেছে। এই সংগঠনটির লক্ষ-উদ্দেশ্য ছিল, বসনিয়ার মুসলমানদের উন্নতি সাধন ও তাদেরকে তাদের মূলের সাথে পুনঃসংযুক্ত করে দেওয়া। এ সংগঠনটি বিশ্বাস করত যে, মুসলিমবিশ্বের রাজনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক ও অস্থিতিশীল। যদিও ইসলাম হচ্ছে এমন একটি জীবন্ত দর্শন। যা তার অস্তিত্ব বিলীন না করেই আধুনিক হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৯৩ সালে আলিজা ইজেতবেগোভিচ সারজেভো ইউনিভার্সিটি থেকে আইন নিয়ে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার এই সময়ের কর্মতৎপরতা তাকে একজন কট্টর কমিউনিস্ট বিরোধী হিসেবে প্রসিদ্ধ করে দিয়েছিল।
১৯৪৪ সাল। তাঁর বয়স যখন মাত্র বিশ। তখন ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার আহ্বানের কারণে তাকে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক অবস্থান কমিউনিস্ট শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী হওয়াই তার তিন বছরের কারাদণ্ড হয় তখন। তিন বছর পর তাঁর পুনরায় আরো ৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। মার্শাল টিটোর সরকারের ধর্মচর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও মুসলিম ইয়াং-এর প্রতি তার সক্রিয় সাপোর্ট থাকার কারণে। ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অর্জনের পর মুসলিম ইয়াং দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়। এক অংশ হ্যান্ডশ্চার ডিভিশন অব দ্য ওয়াফেন-এস এস কে সমর্থন জানায়, আরেক অংশ যুগোস্লাভিয়া কমিউনিস্টের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। যদিও আলিজার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তার লেখাগুলোতে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ ছিল। এরপরও তিনি নাকি ঝঝ -এ যোগ দিয়েছেন, এমন ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে তার খ্যাতি আরো বেড়ে যায়। এ কারণ দেখিয়ে কমিউনিস্ট সরকার তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে। মূলত আলিজাকে গ্রেপ্তারের অলিখিত কারণ ছিল কমিউনিস্ট বিরোধিতা ও তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করা।
আলিজার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ১৯৭০ সালে তাকে তাঁর রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র (প্রবন্ধ) ‘ইসলামিক ডিক্লেয়ারেশন’ প্রচার-পসারে তাকে সহযোগিতা করেছিল। তিনি এ প্রবন্ধে আধুনিক পশ্চিমা পাণ্ডিত্য প্রসঙ্গে ইসলামী রাজনীতির প্রকৃতি, ইসলাম, উম্মাহ, আইন, অর্থনীতি, শাসনপদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। এ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সত্যিকারের ইসলামিক শাসনকার্য কেবল সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম জাতির মাঝে বিদ্যমান থাকতে পারে। ইসলামী শৃঙ্খলা কেবলমাত্র সেই দেশগুলোতেই উপলব্ধি করা যেতে পারে যেখানে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। আলিজার ঘোষণাপত্র গভীর চিন্তামূলক হওয়ার কারণে কূটনীতিবিদগণের কাছে তা প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু যুগোস্লাভিয়ার প্রাক্তন কমিউনিস্টরা এটাকে শরয়ী আইন বাস্তবায়নের ডাক হিসেবে ব্যখ্যা করেছিল। যার ফলস্বরূপ আলিজার লেখাগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো এবং ১৯৮৩ এ জন্য তাকে ১৪ বৎসর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তা দু বছর কমিয়ে ১২ বছর করা হয়। কিন্তু ১৯৮৮ সালে কারাগারে তার ৫বছর অতিবাহিত হওয়ার পর যখন কমিউনিস্ট শাসনের পতন শুরু হয় তখন তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি তার জেলখানার সময়টাতে বসনিয়ার ভবিষ্যতের জন্য তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিশীলিত ও পরিমার্জন করেছিলেন। তার মুক্তির কিছু দিনের মাঝে এবং যুগোস্লাভিয়া বহু-দলীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার সাথে সাথে আলিজা ১৯৯০ সালে’ পার্টি অফ ডেমোক্রেটিস একশন’ নামে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করেছিলেন। যা পরবর্তীতে দেশের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল। ওই বছরের শেষের দিকের নির্বাচনে আলিজা বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হোন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, জাতিগত উত্তেজনা, প্রতিবেশী স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়ার সার্ব এবং ক্রোয়েটদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার ফলে ১৯৯১ সালে এ ‘সরকার ব্যবস্থা’ ভেঙে যায়। পরবর্তীতে আলিজা ১৯৯২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ও পুনরায় ১ মার্চ সংযুক্ত বসনিয়ান রাষ্ট্রের অনুসরণ ও শান্তিরক্ষার প্রত্যাশায় বসনিয়ার জনগনের ইচ্ছার প্রকাশ হিসাবে একটি স্বাধীন গণভোটের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ তখন স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তাই বসনিয়া হার্জেগোভেনিয়াকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। গণভোটের ঠিক এক মাস পরই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্বাধীনতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু ইউরোপের বুকে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র মেনে নিতে চায়নি ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো। সার্বিয়ানরা তখন বসনিয়ার স্বাধীনতাকে প্রত্যাখান করে সম্পূর্ণ গায়ে জোরে অবৈধভাবে স্বাধীন বসনিয়ার জনগণের ওপর আক্রমণ শুরু করে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।
১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই, সার্বিয়ান সেনারা এক নৃশংস গণহত্যায় ৮ হাজারেরও বেশি বসনিয়ান মুসলমানকে জবাই করে হত্যা করে। গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তাঁকে। তাঁর প্রাণনাশের আশংকা দেখা দেয়। সৌভাগ্যক্রমে বিশ্বনেতাদের চাপের মুখে সার্বিয়ারা তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বিশ্বনেতাদের মধ্যস্থতায় পরস্পর টেবিল আলোচনার মাধ্যমে ১৯৯৫ সালের পহেলা নভেম্বর তাদের মাঝে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে সাড়ে তিন বৎসরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটে। গৃহযুদ্ধের এ ভয়াবহ সময়ে আলিজা তার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন। তুমুল ঝড়ের মাঝেও বসনিয়ানবাসীকে পাকাহাতে নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন। বসনিয়া পুনর্গঠনের জন্য এটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নিরসন ও হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পূর্ব ইউরোপে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র জন্ম হয়। আলিজা ছিলেন ইউরোপের বুকে সেই প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথ প্রেসিডেন্ট।
২০০০ সনের অক্টোবর মাসে ৭৫ বৎসর বয়সে তিনি অসুস্থতার কারণে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অব্যহতি নেন। অব্যহতি নেওয়ার তিন বৎসর পর ১৯শে অক্টোবর ২০০৩ সালে তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে জেল-জুলুম, দুঃখ-কষ্টে। এগুলোর জন্য তিনি কখনো ব্যথিত হননি। তিনি তার এক বইয়ে লিখেছেন, আমার জীবন ছিল খুবই বেগবান ও ঘটনাবহুল। আমি জীবনে অনেক কিছু করেছি। আমি তিনধরণের জীবনযাপন অনুভব করেছি। এটি একজন মানুষের জন্য অনেক কিছু। কথার কথা, যদি মৃত্যুর পর আমাকে আবার জন্ম হয় আমি সেভাবেই জীবন যাপন করব যেভাবে পূর্বে জীবন যাপন করেছি।
আলিজা শুধু একজন রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন না। ছিলেন গণ মানুষের হূদয়ের মধ্যমনি। তার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পূর্ব ইউরোপের মুসলিমরা ফিরে পেয়েছে তাদের জাতিসত্তা ও ধর্মীয় অধিকার। আলিজাকে বসনিয়াবাসী এখনো দেদো নামে স্মরণ করে। যার অর্থ ‘বসনিয়ার দাদা’। ‘বসনিয়াবাসীর ওপর তার যে অবদান, বসনিয়াবাসীর কাছে তা সারাজীবন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক :মুজীব রাহমান
আলেম, প্রাবন্ধিক





