বাংলার কৃষি ৫০ বছরে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

বাংলার কৃষি ৫০ বছরে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আমরা মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে। ক্ষুধা, দরিদ্রতার নির্মম কশাঘাত আর পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর শোষণ, বঞ্চনা ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে সুদীর্ঘ ২৪টি বছর আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করলেও নব্যদেশীয় শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আবার বাঙালি জাতির সংগ্রামের যাত্রা শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে চূড়ান্ত মুক্তির সংগ্রামে উপনীত হয় ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নেয়। নয় মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি আমাদের মহান স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের দ্বারপ্রান্তে আমরা আজ দাঁড়িয়ে। যা বাঙালি জাতির জন্য আনন্দের, গর্বের এবং অহংকারের। সেইসঙ্গে মূল্যায়নেরও সময় এসেছে দীর্ঘসময়ে আমাদের অর্জন, প্রাপ্তি ও ব্যর্থতার।

আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হবে, কৃষকের সুদিনের সূর্য উদিত হবে, কৃষক নির্যাতন বন্ধ হবে। কৃষক ও কৃষির সাফল্যের সোপান রচিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এদেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টায় কৃষিতে অভাবনীয় ও ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে সত্য, কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মুহূর্তেও কৃষকের অবস্থা ভালো নেই। এদেশের একসময়ের মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারগুলো চাষের জমি হারিয়ে হয়েছে বর্গাচাষি কিংবা প্রান্তিক চাষি। আর নিম্নবিত্তের পরিবারগুলো চাষের জমি হারিয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে আশ্রয় নিয়েছে নগর-মহানগরের বস্তিতে। ওরা আজ বস্তিবাসী। আর যারা আজো গ্রামে থেকে কৃষিতে লড়াই করছেন, তাদের সমস্যার কোনো অন্ত নেই। অনেক সময়ই ফসল উৎপাদন করে কিন্তু উপযুক্ত মূল্য পান না, এমনকি বাড়তি ফসল উৎপাদন হলে সংক্ষণের অভাবে ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা ফসল উৎপাদনে যেভাবে মনোযোগ দিয়ে নানামুখী সহায়তা দিয়ে থাকে, সেভাবে ফসল সংক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে ফসল নষ্টের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এখনো ঘটছে। বিশেষ করে সবজি জাতীয় পণ্য সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগারের প্রচণ্ড অভাব। অথচ সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে এখন তৃতীয় অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। তবে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, কতটা বিষমুক্ত করে উৎপাদন করা যায়, সেদিকেই নজর দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১০টি উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ‘আইপিএম মডেল ইউনিয়ন’ হিসেবে শুরু হয়েছে কেমিক্যাল বা বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদন। বিষমুক্ত সবজির চাহিদা দেশ-বিদেশেই বেড়েছে। ইতোমধ্যেই বগুড়া এবং যশোর থেকে আইপিএম মডেল ইউনিয়নের চাষ করা বাঁধাকপি রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। বাস্তবে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। আবার এর সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, দূষিত হচ্ছে মাটি, পানি ও বাতাস, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ফলে বিষমুক্ত সবজি চাষের পরিধি পর্যায়ক্রমে গোটা দেশেই বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর দেশের খাদ্য উৎপাদন কম হওয়ায় আমদানি নির্ভরতাও বেশি ছিল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রতি হেক্টর জমিতে মাত্র দুই টন। যা মিলে মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টনের মতো। এখন সেখানে চাল উৎপাদন হয় প্রতি হেক্টরে চার টনেরও বেশি। ফলে মোট চাল উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টনের মতো। অথচ সাড়ে ৭ কোটি জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৭০ লাখে উন্নীত হয়েছে। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মূলত দেশীয়ভাবেই মেটানো সম্ভব হচ্ছে। যদিও গত আমন মৌসুমে পর পর বন্যায় আমনের ফসলহানির কারণে এ বছর চাল আমদানি করতে হচ্ছে। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে এ সংকট কেটে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মাত্র দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল উৎপাদন হতো। সেখানে এখন দেশে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, কৃষকের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা এবং মেধাবী কৃষিবিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ উদ্যোগেই অভাবনীয় এ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। এখন দেশে খাদ্যশস্যের প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উৎপাদন হয়। এখন বাংলাদেশের উপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। অর্থাৎ এখন খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর তালিকায় অন্যতম দেশে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। কৃষির এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের খাদ্যশস্যের গড় উৎপাদন প্রায় তিন টনের মতো হলেও বাংলাদেশের গড় উৎপাদন চার দশমিক ১৫ টন। অর্থাৎ খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য এখন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে অবস্থান করছে। শুধু খাদ্যশস্য উৎপাদনই নয়, মাছ উৎপাদনে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

প্রবাদ আছে, ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। বাস্তবে খাল-নদী-বিলে একসময় যে মাছ পাওয়া যেত, তা এখন আর মেলে না। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের এখন আর খরস্রোতা প্রমত্ত নদীগুলোর সেই যৌবন নেই। সব যেন সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশাল বিশাল নদীতে চর আর চর। এমনকি নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চাষিরা এখন নদীতে নানা জাতের ফসলের চাষও করে। এমনকি নদীর চরে লাউ, কুমড়া, শসা, আলু, তরমুজসহ নানা জাতের ফসলও এখন চাষাবাদ হচ্ছে। অর্থাৎ ছোট ছোট নদী-খাল-বিল মরে গেছে অনেক আগেই। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রকৃতির এক পরিবর্তন এসেছে। শীতকালে বর্ষা, শুষ্ক মৌসুমে অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। অথচ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আমিষের চাহিদা একসময় প্রকৃতিগতভাবে উৎপাদিত মাছেই পূরণ হতো। এখন সেসব কিছু ম্লান হয়ে গেছে। এখন মাছের চাষ করে মাছচাষিরা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করছে। এমনকি তুলনামূলক কম দামেই দেশীয় প্রজাতির মাছ এখন হাটে-বাজারে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেদার মাছ রপ্তানিও হচ্ছে। এক তথ্যে জানা গেছে, মাছের রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে তার মধ্যে প্রথম স্থানটি হবে বাংলাদেশের, এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। এমনকি জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ৫২ হাজার টন বেড়ে এখন সাড়ে তিন লাখ টনে এসে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইলিশের দাম মাঝে মাঝে এমনভাবে বেড়ে যায়, দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে কিনে খাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

সবজি চাষে আরেক অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এমন এক সময় ছিল, যখন গোটা দেশের সব এলাকায় সবজি চাষ হতো না। শুধু দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের যশোরেই কেবল সবজি চাষ হতো। কিন্তু এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই সবজি চাষ হয়। বলা যায় ৬০ ধরনের ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, যারা সারা বছরই কম-বেশি সবজি উৎপাদন করে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়ারবুক-২০১৩ অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সবজি চাষের পরিমাণ বেড়েছে ৫ শতাংশ হারে। এমনকি সবজি খাওয়ার ক্ষেত্রে ২০ বছর আগেও মাথাপিছু পরিমাণ ছিল ৪২ গ্রাম, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ গ্রামে। আর পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য সবজি খাওয়ার পরিমাণ প্রত্যেকটি মানুষকে বাড়ানো উচিত। কারণ সবজি খাওয়া মানুষের মধ্যে রোগবালাইয়ের ঝামেলাও কম। আর দেশে রীতিমতো আলু উৎপাদনে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব। মাত্র এক দশক আগেও আলুর উৎপাদন ছিল ৫০ লাখ টনের নিচে। এখন তা বেড়ে প্রায় কোটি টনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিশ্বের যে দশটি দেশ আলু উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে, সেই কাতারে এখন শামিল হয়েছে বাংলাদেশ। আলু উৎপাদনে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। রপ্তানির এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে চাষিদের আলুর দামও নিশ্চিত হবে, তখন আলুর চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে। সুবিধা হচ্ছে, বেলে দো-আঁশ মাটিতে ব্যাপক আলুর চাষাবাদ হয়। ফলে দেশের চরাঞ্চলে এখন অল্প সেচের পানিতে ভালো মানের আলুর চাষাবাদ হচ্ছে। তবে শঙ্কার জায়গা হচ্ছে, চাষিরা প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবকে মোকাবিলা করে আলু চাষ করে ঠিকই; কিন্তু আলু ওঠার সময় সংরক্ষণ উপযোগী পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাবে সব চাষি আলু সংরক্ষণে সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। অনেকেই সংরক্ষণের উৎকণ্ঠায় আলু ক্ষেতেই কম দামে বিক্রি করে দেন। যেমন এ বছর আবহাওয়া পুরোটাই আলু চাষের প্রতিকূলে রয়েছে। টানা কুয়াশা ও তীব্র শীতে আলুর মড়ক রোগ বৃদ্ধি পায়। ফলে বাড়তি পরিচর্যা করে আলুর ক্ষেতকে রক্ষা করতে চাষিদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ফলন বিপর্যয়ও ঘটে। এ বছর শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে আলুচাষিদের ভাগ্যে, যা এখন বলাও দুষ্কর। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের চাষিরা চাষের জমিতে প্রাণান্তকরভাবে ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা, বন্যা, খরা মোকাবিলা করে যেভাবে কষ্ট করে চাষাবাদ করে, অনেক সময়ই ফসলের উৎপাদন বেশি হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। এ সংকট থেকে চাষিদের রক্ষা করতে পারলে কৃষিতে আরো সফলতা অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে আমাদের দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধার কারণে ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে বহুদূর পথ অতিক্রম করা গেছে। আমরা আশাবাদী, আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীদের অভাবনীয় সফলতা দেশের কৃষির উন্নয়নে আরো অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। একসময় পাট ছিল রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত। পাটকে বলা হতো সোনালি আঁশ। ছিল দেশে সরকারি-বেসরকারি পাটকল। পাট বিদেশে রপ্তানি করে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশ পরিচালিত হতো। দেশের কৃষক পরিবারগুলোরও বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন ছিল পাট। পাটকে ঘিরে দেশের পাটখ্যাত রাজধানী নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায়, থানায় ছিল পাটের রমরমা ব্যবসা। এক মণ পাট বিক্রি করে একজন কৃষক পরিবারের সপ্তাহের খরচ জোগাতো। জন্মসূত্রে আমার কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী চিলমারী বন্দরে প্রমত্ত নদী ব্রহ্মপুত্রের বুকে পানসি বড় বড় নৌকায় পাট আনা-নেওয়ার বাস্তব চিত্র স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। চিলমারী বন্দরে ছিল মাড়োয়ারিদের বিশাল বিশাল পাটের গুদাম। শুধু মাড়োয়ারিই নয়, ছিল স্থানীয় পাট ব্যবসায়ীদের বড় বড় পাটের গুদামও। ছিল সরকারি পাটকলের সারি সারি পাটের সুবিশাল গুদাম। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য, যা কলমে লিখে প্রকাশ করাও কঠিন। পাট ব্যবসাখ্যাত সেই কুড়িগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্য এখন শুধুই স্মৃতি। অথচ এখন নতুন নতুন জাতের পাটবীজ উদ্ভাবন হচ্ছে। পাটচাষও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, পাটচাষিদের ধারাবাহিকভাবে পাট চাষ করার কোনো নিশ্চয়তা আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাটশিল্পের অভাবনীয় সফলতা এসেছে। পাট উৎপাদন ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে তারা দেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করছে। যে মুহূর্তে আমাদের পাটশিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে, সে মুহূর্তে গোটা বিশ্বে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। অথচ স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হলে পাটকল সমৃদ্ধ হবে, পাটচাষিদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে কিন্তু তা আর হয়নি। এ ব্যর্থতার দায় স্বাধীনতা-উত্তর সব সরকারকেই বহন করতে হবে। কিন্তু পাট নিয়ে দেশের মানুষ আজো স্বপ্ন দেখে। এখনো তা পূরণ করা সম্ভব। সেদিকেই আমাদের নজর দিতে হবে।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আর কৃষকই সমৃদ্ধির প্রকৃত কারিগর। সেই কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলে দেশের অর্থনীতিকে সুস্থ রাখাও সম্ভব হবে না। এজন্য কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্জীবিত করা জরুরি। তাহলে দেশে উৎপাদিত ফসলের ওপর ভিত্তি করে দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে। ফলে বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান যেমন সৃষ্টি হবে, তেমনি কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। এজন্য পাটশিল্প, চিনিশিল্প, চালকল শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসহ কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে পুনর্জীবিত করা একান্তভাবে আবশ্যক। পাশাপাশি বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতি থেকে সরে আসতে হবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে হবে। সরকার সে উদ্যোগই গ্রহণ করবে, এটাই দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা।

লেখক : সমাজকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads