ঢাকা উদ্যান এলাকায় তুরাগ নদের তীরঘেঁষে বাগানবাড়ি। দূর থেকে বাড়িই মনে হতে পারে যে কারো। কিন্তু আসলে এটি বাড়ি নয়। এটি হচ্ছে টর্চার সেল। আর এ টর্চার সেলটি আদাবর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান মনিরের। মনিরের এ টর্চার সেলটিতে যেদিন লোকজনকে ধরে নিয়ে আসা হয় সেদিন আয়োজন করা হয় ডিজের। একদিকে চলে ডিজে অন্যদিকে নির্যাতন। মূলত অভিনব কায়দায় কেউ যেন না বোঝে সে কারণে ডিজের আড়ালেই চালানো হয় নির্যাতন। স্থানীয় লোকজন বলছেন, বাগানবাড়িটি ব্যবহার করা হতো ভূমি দখল আর চাঁদাবাজির কাজে। এ কাজে যে বাধা হতো তাকে এ বাগানবাড়িতে নিয়ে এসে নির্যাতন করা হতো আর বলত বাড়াবাড়ি করলে মেরে বস্তায় ভরে তুরাগে ফেলে দেব।
সরেজমিনে ঢাকা উদ্যান এলাকায় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আওয়ামী লীগ নেতা মনির সম্পর্কে এসব তথ্য জানা যায়। মনিরের বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গেও কথা হয়। স্থানীয়রা জানান, ওই বাগানবাড়িটি ছিল মূলত মনির মিয়ার টর্চার সেল। রাতের আঁধারে লোকজনকে ঘুম থেকে ডেকে এনে ওই টর্চার সেলে নির্যাতন করা হতো। নির্যাতনের সময় সাউন্ড বক্সে উচ্চ ভলিউমে ডিজে গান বাজানো হতো। বাজনার তালে তালে চলত নির্যাতন। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির আর্তনাদ বাইরের অন্যরা যেন শুনতে না পান এ জন্য এই গান বাজানো হতো। এ ছাড়া মনির মিয়া বাগানবাড়িতে বসে ইচ্ছামতো ফাঁকা গুলি ছুড়তেন। এলাকাবাসীকে ভয় দেখানোর জন্য এই ফাঁকা গুলি ছোড়া হতো বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
২০১৬ সালে ঢাকা উদ্যান বালুঘাটের দখল নেওয়াকে কেন্দ্র করে মনিরের বাহিনী নির্যাতন চালান মেসার্স আজহার এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী সুবল চন্দ্র দাশ, রুহুল, পাটোয়ারী খানের ওপর। এদের সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে মধ্যরাতে নেওয়া হয় বাগানবাড়িতে। সেখানে মনিরের উপস্থিতিতে তাদের দফায় দফায় মারধর করা হয়। ওইদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন মনিরের সহযোগী হুমায়ুন, হোসেন ও শাহাবুদ্দীন। নির্যাতনের সময় ওই চারজনই অস্ত্রধারী ছিলেন।
নির্যাতনের শিকার রুহুল আমিন বলেন, ‘রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলে মনিরের বিশাল বাহিনী। ঘুমের মানুষকে ডেকে নিয়ে বলা হয়, মনির ভাই তোদের সবাইকে ডাকছে।’
রুহুল বলেন, ‘বাগানবাড়িতে ঢোকামাত্রই মনিরের লোকজন আমাদের ওপর হামলা শুরু করে। আমরা আজো জানতে পারিনি আমাদের অপরাধ কী ছিল?’
ওই একই রাতে হামলার শিকার হয়েছিলেন আজহার এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার সুবল চন্দ্র দাশ। মারধরের সময় সুবলকে কলেমা পড়তে বলা হয়। প্রাণের ভয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী সুবল কলেমা পড়তে বাধ্য হন।
সুবল বলেন, ‘ইট, লাঠি, চাপাতি, দা, গজারি দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। আমার হাতে কোপ দেওয়া হয়। মনিরের ম্যানেজার শাহিন আমার হাতে কোপ দেয়।’
ব্যবসায়ী হাজি বরকত উল্লাহও অত্যাচারের শিকার হয়েছেন মনির বাহিনীর হাতে। তিনি বলেন, ‘বালুঘাটের ৮টা গদি দখল করে নেয় মনির মিয়া। গদির মালামাল দখলে নিয়ে তাতে বেড়া দেয় মনিরের বাহিনী। এরপর নজর দেয় আমার গদির দিকে।
এই ব্যবসায়ী জানান, মনির মিয়া এক রাতে তার গদির ৬০ লাখ টাকার বালু ও পাথর লুট করে তার বাজারের কাছে স্টক করে রাখে। এরপর আড়াই লাখ টাকার বালু-পাথর লুট করা হয়। সেই আড়াই লাখ টাকার বালু-পাথর ফেরত পেলেও বাকি ৬০ লাখ টাকার মাল আর পাননি। ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুট হলেও ওই সময় মামলা করতে পারেননি বরকত উল্লাহ।
এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার লোকগুলোকে মনির তার বাগানবাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আমি বাগানবাড়িতে খুঁজতে গিয়ে দেখি আমার দুজন লোক নেই। পরে জানতে পারি প্রাণভয়ে তারা তুরাগ নদী সাঁতরে এরপর গ্রামের বাড়ি বরিশাল চলে গেছে। আমি বাগানবাড়ি যাওয়ার পরপরই হোসেন, শাহাবুদ্দীন, মনির, হুমায়ুন ফাঁকা গুলি ছোড়া শুরু করে। তখন সকাল ৭টা-৮টা বাজে।’
মনিরের সাঙ্গোপাঙ্গদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ী আ. হালিমও। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা উদ্যান এলাকায় বালুর ব্যবসা করতেন। কিন্তু মনির বাহিনী তার কাছে চাঁদা চাওয়ায় তিনি ওই এলাকা থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ব্যবসায়ী আ. হালিম বলেন, ‘মনির মিয়া কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন আমি ভূমিদস্যু।’
এ ছাড়া মনির বাহিনীর হাতে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বছিলার দুই ভাই মিয়া হোসেন ও মাইদুল, বছিলার ভিংকু ব্যাপারীর মসজিদ এলাকার আমজাদ, বছিলার রেজাউল, জয়নাল, মাতবরপাড়ার আয়নাল ও মফিজ।
মনির বাহিনীর তাণ্ডবের শিকার মিয়া হোসেন বলেন, ‘আমরা ঘাট ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতাম। ২০১৩ সালের দিকে মনির মিয়া এসে ওই ঘাটের মালিকানা দাবি করেন। বেড়াও দেওয়া হয় ঘাটে। আমার ৬৫ হাজার ইট ও ১০ গাড়ি লাল বালু লুট করে নেয় মনিরের বাহিনী। সব মিলিয়ে অন্তত ১৫ লাখ টাকার মাল লুট করেছেন।’
মিয়া হোসেন আরো বলেন, ‘আমার ছোট ভাই মাইদুলকেও বাগানবাড়িতে ডেকে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু ভয়ে তখন মামলা-মোকদ্দমা করতে পারিনি।’
র্যাবের হাতে মনির গ্রেপ্তার হওয়ায় খুশি হয়েছেন মিয়া হোসেন। তিনি বলেন, মনিরের বিচার হোক তার দৃষ্টান্তমূলক সাজা হোক।
ঢাকা উদ্যানের আরেক ব্যবসায়ী আয়নাল বলেন, ‘আমাকে মনির মিয়া বাগানবাড়িতে ডেকে নিয়ে বলে বালুঘাটের ভাড়া আমার কাছে দিবা। আমি বলেছি ব্যাপারীর কাছে ভাড়া দেব। এই কথা শোনার পর মনির মিয়ার লোকেরা দা নিয়ে আমাকে কোপানোর ভয় দেখায়।’
আয়নাল হোসেন বলেন, ‘আমি গদিতে বসা। হঠাৎ একদিন দেখি ১৫ জনের একটি দল আমাদের দিকে তেড়ে আসছে। সবার হাতে দা ছিল। ওই দৃশ্য দেখার পর আমি পালিয়ে যাই। দা বাহিনীর সঙ্গে তো পেরে উঠব না।’
মনির বাহিনীর অত্যাচারে ঢাকা উদ্যান থেকে ব্যবসা গুটিয়েও নিয়েছেন আয়নাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন বেকার অবস্থায় আছি। কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছি। ব্যবসা সংক্রান্ত টাকা-পয়সা মানুষের কাছে পড়ে আছে। তাদের কাছ থেকে পাওনা টাকাও এখন পাচ্ছি না।’
আতঙ্কের নাম মনির হোসেন। ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, নবীনগর হাউজিং এলাকায় আতঙ্কের নাম মনির হোসেন। তার চাঁদাবাজি ও জুলুমের মাত্রা বেড়েছে দিন দিন। আদাবর-মোহাম্মদপুর এলাকায় আরেক আতঙ্ক হয়ে ওঠা মনিরের রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট, বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা সবই রয়েছে। নদীর তীর ভরাট, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্যসহ হাজি মনিরুজ্জামান মনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ। কিন্তু বরারই তিনি থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে একটি চাঁদাবাজি মামলায় মনিরকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। এরপর জামিনে মুক্ত হয়ে আমেরিকায় চলে যান। পরে কাউন্সিলর রাজীবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। আবারো ফিরে আসেন দেশে। নিজের অপরাধের দুর্গ হিসেবে গড়ে তোলেন গোটা মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকাকে। হয়ে ওঠেন ওই দুই এলাকার জলজ্যান্ত ত্রাস।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানান, মনিরের নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য হলেন মনিরের ভগ্নিপতি মাহিন, আকবর ও সুলতান, হোসেন ও শাহাবুদ্দীন। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় জিডি করেন ঢাকা উদ্যানের বালুঘাট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ। বাড়ি দখল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় মো. বিল্লাল হোসেন ও হাজী ইকবাল হোসেন নামে দুজন ভুক্তভোগীও একই থানায় পৃথক মামলা ও সাধারণ ডায়েরি করেন।
র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার রিমান্ডে মনির হোসেন, রাজধানীর আদাবর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান ওরফে মনিরের অস্ত্র মাদক আইনের মামলায় বিভিন্ন মেয়াদের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
শুক্রবার অস্ত্র মামলায় তিন দিন এবং মাদক মামলায় একদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
র্যাব জানায়, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে সপরিবারে দেশের বাইরে পালিয়ে যান মনির। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে গত কোরবানির ঈদের সময় দেশে ফেরেন তিনি। এরপর ঢাকা উদ্যান, নবীনগর হাউজিং ও চন্দ্রিমা উদ্যানে দখল বাণিজ্য শুরু করেন। গত তিন মাসে জাল কাগজপত্র বানিয়ে শুধু ঢাকা উদ্যানের চারটি প্লট দখল করেছেন মনির। মনিরের বিরুদ্ধে দখল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় ৭০টি মামলা-জিডি রয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের ১/২ পিসিকালচার হাউজিং সোসাইটির বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি অবৈধ অস্ত্র ও চারশ পিস ইয়াবাসহ মনিরুজ্জামান ওরফে মনিরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-২।





