জাতীয়

বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় সরকার

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ১১ মার্চ, ২০২২

করোনা মহামারি শেষ না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন উত্তেজনা। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাসের দাম হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যের ওপর। দেশের বাজারেও প্রায় প্রতিদিন বাড়ছে, চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ সবধরণের নিত্যপণ্যের দাম। এবার নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে খানিকটা নড়েচড়ে বসছে সরকার।

আসন্ন রমজানকে ঘিরে নিত্যপণ্যের দাম যেন আর না বাড়ে সেজন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে মোট ৬৯১ কোটি ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৬ টাকার খাদ্যপণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ সংক্রান্ত চারটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এরমধ্যে এক কোটি ৭১ লাখ ১৫ হাজার ৬৫২ লিটার সয়াবিন তেল কেনা হবে। এছাড়া, চিনি, ছোলা ও মসুর ডালও কেনা হবে। এরমধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার টন চিনি, ১০ হাজার টন ছোলা এবং ১৯ হাজার ৫০০ টন মসুর ডাল ক্রয়ের প্রস্তাব।

সভা শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, ক্রয় কমিটির অনুমোদনের জন্য ১৩টি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ক্রয় প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চারটি, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের তিনটি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তিনটি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাবনা ছিল। ক্রয় কমিটির অনুমোদিত ১৩টি প্রস্তাবে মোট অর্থের পরিমাণ দুই হাজার ৮১৬ কোটি ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৬৭৫ টাকা। মোট অর্থায়নের মধ্যে জিওবি থেকে ব্যয় হবে এক হাজার ৭৮৪ কোটি ৬৪ লাখ ৭৪ হাজার ৮৮৩ টাকা। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের ঋণ এক হাজার ৩১ কোটি ৪৯ লাখ ৮২ হাজার ৭৯২ টাকা।

 বৈঠক শেষে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলাম। সাংবাদিকদের তিনি জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কর্তৃক সেনা ভোজ্যতেল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সুপার অয়েল রিফাইন্ড লিমিটেড, মেঘনা ভোজ্যতেল শোধনাগার লিমিটেড, সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড এবং শুন শিং এডিবল অয়েল লিমিটেডের কাছ থেকে মোট এক কোটি ৭১ লাখ ১৫ হাজার ৬৫২ লিটার সয়াবিন তেল কেনা হবে। মোট ২৮৭ কোটি ৫৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩৬ টাকায় এটি সরাসরি ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

মো. জহিরুল ইসলাম জানান, টিসিবি কর্তৃক মেঘনা সুগার রিফাইন্ড লিমিটেড ও সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১৪ হাজার মেট্রিক টন চিনি কেনা হবে। সর্বমোট ১১০ কোটি ৬০ লাখ টাকায় এসব চিনি সরাসরি ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেঘনা সুগার রিফাইন্ড লিমিটেডের কাছ থেকে ৭ হাজার টন চিনি ৫৫ কোটি ৩০ লাখ টাকায় কেনা হবে। এছাড়া সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছ থেকে ৭ হাজার টন চিনি ৫৫ কোটি ৩০ লাখ টাকায় কেনা হবে।

এদিকে, বাজারে ভোজ্যতেল সয়াবিনের দাম বাড়ার কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। গতকাল সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা শেখ রুবেল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ভোজ্যতেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিরতা বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভোজ্যতেলের বাজারে প্রতিযোগিতা পরিপন্থি কর্মকাণ্ড ও কৃত্রিম সংকট বিষয়ে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী অনুসন্ধান কাজ পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে তিন সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ কতটা বিপাকে, সেটি ফুটে উঠেছে স্বল্পমূল্যের পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাককে ঘিরে মানুষের আকুতি। একেকটি ট্রাক আসছে, মানুষ দৌড়াচ্ছেন, কোথাও কোথাও ঝুলে থাকছেন, কোথাও বা কাতর হয়ে পণ্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছেন, এই চিত্র এখন এক স্বাভাবিক চিত্র। প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন ছবি ভাইরাল হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে।

টিসিবির একটি ট্রাক থেকে পণ্য বিক্রির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে বোঝা গেল, এই বিষয়টি মাথাতেই নেয়নি সংস্থাটি। রাজধানীতে মোট ৪৫০টি স্থানে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করা হয়। কিন্তু টিসিবির ট্রাক আছে ১৫০টি। ফলে একেক দিন দেড় শ স্থানেই পণ্য বিক্রি করা হয়। এই ১৫০টি স্থানে কখন বা কোনদিন ট্রাক যাবে, সেটি আগে থেকে জানতে পারেন না ক্রেতারা। আবার প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়েও আসে না ট্রাক। ফলে অপেক্ষায় থাকা মানুষ হুড়োহুড়ি করতে থাকেন।

টিসিবির দাবি, তারা ওয়েবসাইটে আগের রাতে তালিকা দিয়ে দেয়। কিন্তু ট্রাক থেকে যারা পণ্য কেনেন, তাদের পক্ষে ওয়েবসাইট ঘেঁটে তথ্য জানা সম্ভব নয়।

এদিকে, টিসিবির ট্রাকে এখন চাহিদার তুঙ্গে সয়াবিন তেল। আরো বিক্রি হয় পেঁয়াজ, ডাল, চিনি। চারটি পণ্য কিনলে বাজারের চেয়ে প্রায় ৩৪০ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য এই টাকাটা কম নয় কোনো বিবেচনাতেই। তাই চাহিদা বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

একেকজন ক্রেতাকে সয়াবিন তেল দেওয়া হচ্ছে ২ লিটার করে। দাম ১১০ টাকা। বাজারদর ১৬৮। এখানে সাশ্রয় ১১৬ টাকা। ট্রাকে পেঁয়াজ চাইলে পাঁচ কেজি করে কিনতে পারেন একেকজন। দাম ৩০ টাকা করে। যে পেঁয়াজ ট্রাকে দেওয়া হয়, সেটির বাজারদর কমসে কম ৪৫ টাকা। পাঁচ কেজিতে সাশ্রয় ৭৫ টাকা।

চিনির দর এখন ৮০-৯০ টাকা কেজি। তবে টিসিবি বিক্রি করে ৪৫ টাকা করে। একেকজন নিতে পারে দুই কেজি করে। এখানে সাশ্রয় ৭০ থেকে ৯০ টাকা।

আর যে ডাল টিসিবি দেয় ৬০ টাকা কেজি, সেটির বাজারদর ৯০ টাকার কম নয়। একেকজন নিতে পারেন দুই কেজি, এখানে সাশ্রয় ৬০ টাকার মতো।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads