বাংলাদেশে করোনা টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয় এ বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি। এ সময় বিশ্বের অনেক দেশই ভ্যাকসিন পায়নি, কবে নাগাদ পাবে তাও ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু তারপরও শুরুতে এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকা নিতে দেখা দিয়েছিল অনীহা। এখন বদলে গেছে সেই দৃশ্যপট। প্রদিদিন টিকা নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তারা। এমনকি টিকা নিতে মারামারির ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে করোনার টিকা সংগ্রহের শুরুতে শুধু ভারতের সেরামের সাথে চুক্তি হলেও তারা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় হোচট খেয়েছিল সরকার। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন বাংলাদেশ টিকা সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন করার পর ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বের সবাই যেখানে টিকা নিতে আগ্রহী, উম্মুখ, সেখানে টিকা নেবার জন্য বাংলাদেশে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কোনো গতি ছিল না। টিকা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল নানমুখী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, যা বিভ্রান্ত করে সাধারণ মানুষকে। সেইসব অপপ্রচার ও গুজবই প্রথমে সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করে টিকা নেবার নিবন্ধন থেকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ ফেব্রুয়ারিতে দেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর পর গত ১২ মে পর্যন্ত নিবন্ধন করেন মাত্র ৭২ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৯ জন। আর গত বুধবার পর্যন্ত টিকা নেওয়ার জন্য নাম নিবন্ধন করেছেন ২ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার ৫১৯ জন। গত বুধবার পর্যন্ত প্রথম ডোজের টিকা পেয়েছেন ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৭ জন। দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ৪৯ লাখ ২ হাজার ১৭৩ জন। অর্থাৎ এখনো টিকা পাওয়ার অপেক্ষয় আছেন এক কোটি ৩৫ লাখ ৫১ হাজার ৭২ জন।
আবার টিকাদান কার্যক্রম শুরুর পরপরই দেখা দেয় টিকা সংকট। শুরুতে দেয়া হয় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা। এজন্য ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বেক্সিমকোর মাধ্যমে ছয় মাসের মধ্যে তিন কোটি টিকা আনার চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ সরকার। গত জানুারির এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত থেকে দুই চালানে ৭০ লাখ ডোজ টিকা পায় বাংলাদেশ। এছাড়া ভারত সরকারের উপহার হিসেবে দিয়েছিল ৩২ লাখ ডোজ। সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও ভারতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এরপর আর কোনো চালান আসেনি। অদূর ভবিষ্যতে দেশটি থেকে টিকা আসার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয় যায়। ফলে শুরুতেই দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ১৩ লাখ ডোজ টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। সেইসাথে সরকার প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া এবং নিবন্ধন কার্যক্রমও স্থগিত করে দেয়।
তবে সরকার দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতায় চীন থেকে উপহার হিসাবে পাঁচ লাখ ডোজ করোনাভাইরাসের সিনোফার্ম টিকা পায় গত ১২ মে। তবে মাত্র কয়েকমাসে অনেকটাই পাল্টে গেছে টিকা নেয়ার অনীহা আর টিকা সংকট। শিগগির দেশে আসছে টিকা বিরাট চালান। সেই টিকা সংরক্ষণের জন্য নেওয়া হচ্ছে পদক্ষেপ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচির পরিচালক ডা. শামসুল হক গত রোববার সাংবাদিকদের বলেন, বিরাট সংখ্যক টিকা দেশে আসছে, তা সংরক্ষণের জন্য দেশের সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
খোদ প্রধানমন্ত্রীও টিকার বিষয় শুরু থেকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত ১৮ জুলাই এক সরকারি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নির্ধারিত বয়সের কোনো মানুষ যেন করোনার ভ্যাকসিন থেকে বাদ না থাকে সেজন্য সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি বলেন, টিকাদানের এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার যত ভ্যাকসিন প্রয়োজন তা জোগাড় করার জন্য তৎপর রয়েছে।
তার কথার সত্যতা পাওয়া যায় গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়। রাজধানীর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে করোনা ও ডেঙ্গু মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা প্রস্তাব নিয়ে গেলাম যে আমরা সিনোফার্মের ছয় কোটি ভ্যাকসিন কিনতে চাই, যেটা পাওয়া যেতে পারে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন দিয়ে দিলেন এবং আমরাও সেই ভ্যাকসিন কনফার্ম করে ফেললাম।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আমরা বিভিন্নভাবে ভ্যাকসিন পাচ্ছি। কোভ্যাক্স থেকে আমরা ভ্যাকসিন পাচ্ছি, নিজেরাও কিনছি। চলতি মাসে দেশে আরো এক কোটি ডোজ করোনার টিকা আসছে। এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ করোনাভাইরাসের টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন এবং ৫০ লাখের বেশি মানুষ দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন।
জাহিদ মালেক বলেন, আমাদের ৮০ শতাংশ লোককে ভ্যাকসিন দিতে হলে ২৬ থেকে ২৭ কোটি ভ্যাকসিন লাগবে। এত ভ্যাকসিন আমরা একসঙ্গে পাব না, রাখতেও পারব না। সে জন্য যখন যে ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, সেটা আমরা আমরা আনার চেষ্টা করছি। ভ্যাকসিন নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে একটা রাজনীতি আছে। এটা নিয়েও একটা অর্থনীতি চলছে। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্র ভ্যাকসিন বানিয়েছে এবং স্টক করেছে। তাদের যা জনসংখ্যা, তার থেকে চার-পাঁচ-ছয় গুণ তারা স্টক করে রেখেছে। অথচ এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে এখনো ভ্যাকসিন পৌঁছায়ইনি। আমরা ভাগ্যবান যে শুরুতেই ভ্যাকসিন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম এবং পেয়েছি। আমরা ভ্যাকসিন দিয়ে যাচ্ছি।
এদিকে টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৭ থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ৬ দিনের জন্য সরকার গনটিকা কার্যক্রমের ক্যাম্পেইন শুরু করে। এতে ৩২ লাখ টিকা দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৪২ লাখ মানুষকে। আবার ১৪ আগস্ট থেকে নতুন করে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করার কথা জানিয়েছে সরকার। তবে লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেলেও টিকা দেওয়া নিয়ে স্বজনপ্রীতি, বিশৃঙ্খলা আর অনিয়মের অভিযোগ ছিল। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ টিকাকেন্দ্রে হাজির হন। ৩৫০ টিকার মধ্যে নিজেরটি বুঝে নিতে আগের দিনরাত থেকেই লাইনে দাঁড়ান বহু মানুষ। কিন্তু অনেকেই টিকা নিতে ব্যর্থ হন। আবার মুখ চিনে টিকা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এদের মধ্যেই অনেকের অভিযোগ, রাত ৩টা সময় লাইনে দাঁড়িয়েও তারা টিকা পাননি।
আবার টিকার জন্য নিবন্ধন করেও অনেকে পাচ্ছেন না এসএমএস। তবে এতে হতাশ না হয়ে অপেক্ষা করতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমএনসিএইচ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, বয়সসীমা কমিয়ে দেওয়ায় টিকার নিবন্ধন দ্রুত গতিতে বাড়ছে। এই কারণে অনেকের এসএমএস পেতে একটু দেরি হচ্ছে। যেসব কেন্দ্রে ভিড় বেশি সেখানে এই দীর্ঘসূত্রতা আরো বেশি হচ্ছে। তবে পর্যায়ক্রমে সবাই টিকা পাবেন বলে আশ্বস্ত করছেন এই চিকিৎসক।
টিকা কার্যক্রমের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন দেশের শতকরা ৫ দশমিক ৪৪ জন এবং দ্বিতীয় ডোজ ২ দশমিক ৫২ জন। সরকারের হাতে এখন টিকা আছে মডার্নার ৪৪ লাখ ডোজ, সিনোফার্মের ৪৭ লাখ এবং অক্সফোর্ডের ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ডোজ। সব মিলিয়ে এক কোটি সাত লাখ ১৬ হাজার ডোজ। এর মধ্যে অক্সফোর্ডের ১৬ লাখ ৪৩ ডোজ রাখা আছে দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে। মডার্না ও সিনোফার্মেরও দ্বিতীয় ডোজ মজুত রাখতে হচ্ছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মর্ডানা আর ফাইজারের টিকা দ্বিতীয় ডোজের জন্য বরাদ্দ রেখে সরকার এখন সিনোফার্মের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।





