জাতীয়

বায়ুদূষণে শীর্ষে গাজীপুর

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বায়ুদূষণ বাড়ছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে বায়ুদূষণে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গাজীপুরের। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে আসে।

গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালে বায়ুদূষণে ঢাকাকে টপকে শীর্ষে উঠে যায় গাজীপুর। দূষণের দিক থেকে বায়ুমান প্রতি ঘনমিটারে ২৬৩.৫১ মাইক্রোগ্রাম। এছাড়া ঢাকা জেলা দ্বিতীয় ও নারায়ণগঞ্জ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দূষিত বাতাসের জেলা মাদারীপুর।

২০২১ সালে ৬৪ জেলার মধ্যে গাজীপুর জেলায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম ২.৫) বার্ষিক গড়ে প্রতি ঘনমিটারে ছিল ২৬৩.৫১ মাইক্রোগ্রাম। যেখানে, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা জেলার পিএম ২.৫ বার্ষিক গড়ে ছিল ২৫২.৯৩ মাইক্রোগ্রাম এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের বার্ষিক পিএম ২.৫ এর উপস্থিতি ছিল ২২২.৪৫ মাইক্রোগ্রাম।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দেশব্যাপী ৬৪ জেলার বায়ুমান সমীক্ষা ২০২১’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ক্যাপস প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। এতে সভাপতিত্ব করেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী নকী।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, ৪র্থ-১০ম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে হবিগঞ্জ, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম এবং কিশোরগঞ্জ।

সংবাদ সম্মেলনে আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, দেশজুড়ে গত বছরের ৬ জানুয়ারি থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা শহরগুলোতে এক গবেষণা চালায়। গবেষণায় সাত ধরনের ভূমির ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে ৩ হাজার ১৬৩টি স্থানের বস্তুকণা ২.৫ মান ধরে পর্যবেক্ষণ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করা হয়।

বাংলাদেশের জেলাগুলোর সর্বমোট ৩ হাজার ১৬৩টি স্থানের গড় অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ১০২.৪১ মাইক্রোগ্রাম, যা দৈনিক আদর্শ মানের (৬৫ মাইক্রোগ্রাম) চেয়ে প্রায় ১.৫৭ গুণ বেশি। উল্লেখিত সবচেয়ে দূষিত তিনটি শহরের বায়ুমান ছিল বাংলাদেশের আদর্শমানের চেয়ে প্রায় ৪-৫ গুণ বেশি। মজুমদার বলেন, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও সংস্কারকাজ, মেগা প্রকল্প, আশপাশের ইটভাটা, ছোট-বড় কয়েক হাজার শিল্প-কারখানা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো—এই প্রধান তিনটি শহর দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়।

এছাড়াও গবেষণা ফলাফলে দেখা যায়, উপকূলীয় এলাকার মধ্যে শুধু পটুয়াখালী জেলার বায়ুমান ভালো বায়ুমানের পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, কক্সবাজার, নোয়াখালী এলাকার বায়ুমান অতিমাত্রার দূষণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অপরদিকে, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, শরিয়তপুর, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, বরগুনা এবং যশোর জেলা মধ্যম পর্যায়ের দূষণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৪ জেলার মধ্যে ১০টি জেলায় বায়ুমান ভালো, ৩৬টি জেলার বায়ুমান  মধ্যম মানের এবং ১৮টি জেলার বায়ুমান অতিরিক্ত দূষিত বলে উল্লেখ করা হয়।

ভালো বায়ুমানের জেলাগুলো—কুড়িগ্রাম, নাটোর, জয়পুরহাট, রাজবাড়ী, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ও মাদারীপুর।

মধ্যম মানের দূষিত বায়ুর জেলাগুলো— যশোর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, শেরপুর, নেত্রকোনা, বরগুনা, খাগড়াছড়ি, সিলেট, গোপালগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, ঠাকুরগাঁও এবং জামালপুর।

অতিরিক্ত দূষিত বায়ুর জেলাগুলো— গাজীপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, লক্ষ্মীপুর, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, ঠাকুরগাঁও এবং জামালপুর। 

বায়ুদূষণ রোধে ক্যাপস থেকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ দেওয়া হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— শুষ্ক মৌসুমে দূষিত শহরগুলোতে প্রতিদিন ২-৩ ঘণ্টা পর পর পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা; নির্মাণ কাজের সময় নির্মাণ স্থান ঘেরাও দিয়ে রাখা ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় ঢেকে নেওয়া; অবৈধ ইটভাঁটাগুলো বন্ধ করে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা; ব্যক্তিগত গাড়ি ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা; সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগানো ও ছাদ বাগান করা; দূষিত শহরগুলোর আশপাশে জলাধার সংরক্ষণ করাসহ নির্মল বায়ু আইন-২০১৯ বাস্তবায়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল।

এদিকে এক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণ মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়াচ্ছে বলে ধারণা করছেন মনোবিজ্ঞানীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণে রাজধানীর ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন। মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। ফুসফুসের রোগ ও হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। বায়ুদূষণে মানুষের শরীরে নানা রোগবালাই যেমন বাসা বাঁধছে, তেমনি মনের মধ্যেও রোগ-শোকের জন্ম দিচ্ছে। ওই বছর শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-২০২০’ এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

এছাড়া, ভিন্ন এক গবেষণায় পাওয় গেছে, শুষ্ক মৌসুমে নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত পুরো সময়টায় দূষণের মাত্রা থাকে চরম বিপজ্জনক অবস্থায়। আর বাকি পাঁচ মাস থাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায়। যার অর্থ শহরের সবাই মারাত্মক বিপজ্জনক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। বছরব্যাপী বায়ুদূষণে ঢাকার পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে পাকিস্তানের লাহোর আর তৃতীয় অবস্থানে ভারতের মুম্বাই। বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ এখন বাংলাদেশ। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ বড় শহরগুলোতে দূষিত বায়ু অব্যাহত থাকে সারা বছর। বায়ু দূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু প্রায় তিন বছর কমছে। দেশে প্রতি বছর এক লাখ ২২ হাজার ৪শ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে চতুর্থ প্রধান কারণ এখন বায়ুদূষণ। শিশুদের অ্যাজমা রোগ বেড়ে যাচ্ছে, অসুস্থ বাচ্চার জন্ম হচ্ছে। আর দেশে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) বিশ্ব এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট  প্রকাশ করেছে।

এ রিপোর্টে এমন ভয়াবহ তথ্য ওঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে- বায়ুদূষণে ২০২০ সালে বিশ্বে ৭ মিলিয়ন মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে। আর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন। একিউআই বিশ্বের ১০৬ দেশের বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআই) তথ্য পর্যালোচনায় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের প্রথম স্বীকৃতি পেয়েছিল ঢাকা। বছরের পুরো সময়টায় রাজধানী ঢাকা বিশ্বের প্রথম বা দ্বিতীয় দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে অবস্থান করে।

সেখানে বলা হয়, ঢাকার বাতাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ধুলোকণা ভেসে বেড়ায়। সহনীয় মাত্রার চেয়ে এই পরিমাণ পাঁচগুণ বেশি। ক্যানসারসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগ বাড়ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরে নির্মূল বায়ু ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ১৬৫ দিন রাজধানীর বায়ু বিপজ্জনক পর্যায়ে ছিল। পর্যায়ক্রমে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। ২০১৫ সালে দূষণের মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৮ দিন। এরপর ২০১৬ সালে দূষণ ছিল ১৯২ দিন। আর ২০১৭ সালে ২১২ দিন পর্যন্ত দূষণের কবলে ছিল ঢাকার মানুষ। এরপর ২০১৮ সালের ২৩৬ দিনই ছিল ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা চরম বিপজ্জনক। ২০১৯ সালে ২৮৩ দিন দূষণের কবলে থাকে ঢাকার মানুষ। ২০২০ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বায়ুদূষণে শীর্ষে বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় একাধিকবার হাইকোর্ট হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সচিবদের তলব পর্যন্ত করেন হাইকোর্ট। পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করলেও থামেনি দূষণ কার্যক্রম। দূষণের লাগাম টেনে ধরতে দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে।

এর আগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ ( কেস) শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮০২ কোটি টাকা প্রদান করে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল জানান, দিনের পরদিন বায়ুদূষণ বাড়ছে। ঢাকা ছাড়াও সারাদেশে বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়ছে। ঢাকা তো প্রায় বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হচ্ছে। বায়ুদূষণে স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতের ক্ষতি বিবেচনায় সরকার নির্মূল বায়ু আইন না করে শুধু নীতিমালা করার কথা বলছে। সারাদেশের জন্য আইন করা প্রয়োজন। খণ্ডিত পদক্ষেপ কখনো সুফল বয়ে আনতে পারে না।

সে সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছিলেন, ঢাকাসহ আশপাশের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ কমানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চলছে। বছর ধরে উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত থাকায় সারা বছরই দূষণ হচ্ছে। দূষণ রোধে বিভিন্ন প্রকল্প চলমান আছে। দূষণ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা চলছে। এ জন্য সবার মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। যেখানে-সেখানে নির্মাণসামগ্রী ফেলে দূষণ করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এসডিজি অর্জনে পুরনো ইটভাঁটা ভাঙা হচ্ছে। দূষণকারী যানবাহন ও শিল্প কারখানার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। বায়ুদূষণ বেশি হয়- এমন জেলাগুলোতে বায়ুমান পরিবীক্ষণ যন্ত্র বসানো হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads