বায়ুদূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ঢাকা

সংগৃহীত ছবি

মহানগর

বায়ুদূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ঢাকা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর, ২০২১

করনো মহামারির কারণে কয়েক দফা লকডাউনে রাজধানী ঢাকার বায়ু হয়েছিল নির্মল। কিন্তু লকডাউন শিথিল করার পর থেকে আবারো বাড়ছে দূষণের মাত্রা। বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে এ দূষণ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’-এর বায়ুমান সূচক-একিউআই অনুযায়ী বায়ুদূষণের মানমাত্রায় ঢাকার পয়েন্ট গত রোববার সকাল ৯টায় ১৫৬ ও অবস্থান ছিল ৩ নম্বরে। একই সময় প্রথম অবস্থানে ছিল ভারতের কলকাতা, মানমাত্রা ১৮১। সে দিন বেলা ৩টায় ঢাকায় মাত্রা বেড়ে হয় ১৬১। এ সময় শীর্ষে ছিল চীনের বেইজিং শহর, মাত্রা ১৮৮। 

বায়ুদূষণের মানমাত্রা অনুযায়ী, রোববার প্রায় সারা দিন রাজধানী ঢাকার বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর। তাই দ্রুত উদ্যোগ না নিলে আগামী ডিসেম্বরের শুষ্ক মৌসুমে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা তৈরির আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

বায়ুদূষণ বৃদ্ধির জন্য যে কারণগুলোকে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করছেন, তার মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক কিছু বিষয় (আবহাওয়া ও জলবায়ু), নগর পরিকল্পনার ঘাটতি, আইনের দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা, আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক কারণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব। আর বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে তারা চিহ্নিত করছেন, সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তায় চলাচলরত গাড়ির কালো ধোঁয়া, ব্ল্যাক কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, ইটের ভাটা ও শিল্প কারখানা, উন্মুক্তভাবে আবর্জনা পোড়ানো, বস্তি এলাকায় বর্জ্য পোড়ানো এবং আন্তঃদেশীয় বায়ুদূষণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লকডাউন উঠে যাবার পর থেকে বাতাসে দূষণ বাড়তে শুরু করে। মাঝে কদিন বৃষ্টির কারণে ধুলোবালি কম হওয়ায় দূষণ ছিল কম। এখন তা আবার অনেক বেড়ে গেছে। আর সামনে শীতকাল। ওই সময় এমনিতেই ধুলোবালি বেড়ে যায়। এখন যদি এই অবস্থা হয় তাহলে শীতকালে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে সেটাই এখন শঙ্কার কারণ।

ঢাকার অস্বাস্থ্যকর বাতাস থেকে রক্ষায় এরআগেও নগরবাসীর জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছিল এয়ার ভিজুয়াল। এর মধ্যে ছিল, ঘরের বাইরে শরীরচর্চা করা যাবে না। বন্ধ রাখতে হবে বাসাবাড়ির দরজা-জানালা। ঘর থেকে বাইরে বেরোলে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। ঘরের বাতাস দূষণমুক্ত করতে চালিয়ে রাখতে হবে বায়ু বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র।’ ঢাকাবাসীকে গত শীতের শুরু থেকে প্রতিদিনই এই পরামর্শ দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষ। আর বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বায়ুদূষণজনিত বার্ষিক মৃতের গড় সংখ্যা ৪৬ হাজার। এছাড়া জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্য বলছে, বিশ্বে ৩০ কোটি শিশু দূষিত বায়ু পরিবেষ্টিত এলাকায় বাস করে। এর মধ্যে ২২ কোটিই দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা।

প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণে ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণক্ষমতা কমে শ্বাসকষ্ট ক্রমাগত বাড়ে বলে জানান স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, প্রথমে শ্বাসনালি ও চোখে সমস্যা তৈরি করে। ফলে অ্যাজমা ও নিউমোনিয়ার রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ দূষিত বায়ু গ্রহণ ব্রঙ্কাইটিস থেকে ফুসফুস ক্যানসারের কারণ হতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) বেশি দেখা দেয়।

দূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চললেও কর্তৃপক্ষ কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না এমন অভিযোগ পরিবেশবিদদের। ঢাকার উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে সকাল-বিকাল পানি ছিটানো হলেও আশানুরূপ ফল দৃশ্যমান নয়। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশনের পানি ছিটানোর কাজে সার্বক্ষণিক তদারক এবং বাতাসের মান স্বাভাবিক ও জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন তারা। দূষণের মাত্রা যেভাবে বেড়েছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গাড়ির কালো ধোঁয়া কমানো ও অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, পরিবেশ রক্ষায় যানবাহন, নির্মাণ শিল্প ও কল-কারাখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর মধ্যে বায়ুদূষণকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। সামগ্রিকভাবে সারা দেশকে দূষণের জন্য বিবেচনা করা হলেও রাজধানীর দূষণ এ সূচককে বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন তারা। বর্তমান সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দূষণকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে ঢাকাসহ সারা দেশের বায়ুমান নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় ধরনের পদার্থ এবং গ্যাসের কারণে ঢাকায় দূষণের মাত্রা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। এরমধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ পিএম ২ দশমিক ৫-এর কারণেই ঢাকায় দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে গেলেই পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে গর্ভবতীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। অতিমাত্রায় বায়ুদূষণের কারণে অনেকক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়।

এদিকে রাজধানীজুড়ে চলছে অনেক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প। চলছে ব্যক্তিগত ও বেসরকারি নির্মাণকাজ। কোথাও ধুলা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে কাজ হচ্ছে না। এসব নির্মাণ এলাকা দিয়ে একটি যানবাহন গেলেই পেছনের পুরো এলাকা ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে। দূষণ কমাতে সড়কে নির্মাণসামগ্রী না রাখতে দুই সিটি করপোরেশন নির্দেশ দিলেও রাজধানীর অলিগলিগুলো ইট-বালু-পাথরের দখলে। বালুর ওপর দিয়ে দ্রুতগামী যানবাহন ছুটে যাচ্ছে ধুলা উড়িয়ে। এছাড়া কিছু অভিজাত এলাকা ছাড়া রাজধানীর অধিকাংশ ওয়ার্ডের রাস্তাঘাটের করুণ দশা। নতুন ওয়ার্ডগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে যানবাহন যাওয়ার সময় ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে আশপাশের দোকান-বাড়িঘর।

অন্যদিকে রাজধানীতে অনেক গাড়ি আবার তরল জ্বালানিতে ফিরতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন গাড়ি বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে দূষণ। বেশ কিছুদিন আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপে রাজধানীর বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটার ধোঁয়াকে ৫৮ এবং ধুলা, অন্যান্য ধোঁয়া, জৈববস্তু পোড়ানো ও অন্যান্য কারণকে ৪২ ভাগ দায়ী করা হয়। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম বড় উৎস ইটভাটা। তাই রাজধানীর আশপাশ থেকে ইটভাটা সরানোর পরামর্শও ছিল তাদের। দূষণ কমাতে ঢাকা ও আশপাশের পাঁচ জেলায় ৬২ শতাংশের বেশি অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপরও ঢাকা শহরের বায়ুমানের উন্নতি হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০২০ সালের জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর বায়ুদূষণের জন্য অর্ধেক দায় তরল জ্বালানি পোড়ানো ধোঁয়ার, যা মূলত যানবাহন ও শিল্পকারখানার। ৪০ ভাগ দূষণের উৎস খড়, কাঠ, তুষের মতো জৈববস্তুর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা। বাকি ১০ ভাগ দূষণ ইটভাটায় পোড়ানো কয়লা থেকে ঘটছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি ৫ লাখের মতো। এর বড় একটি অংশই ঢাকায় চলাচল করে। নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও প্রতি বছর মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি ২০-৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এগুলো বাতাসে কালো বিষাক্ত ধোঁয়া ছাড়ছে। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের জুন থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত যানবাহনের কালো ধোঁয়ার বিরুদ্ধে ৩৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিভিন্ন যানবাহনকে ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ঢাকার বায়ুদূষণের আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ অবৈধ ইটভাটা। কিছু ইটভাটা বন্ধ করা হলেও আশপাশের অনেক ইটভাটা এখনো চলছে। নেই পরিবেশ ছাড়পত্র, ঘটাচ্ছে মারাত্মক দূষণ। এ ক্ষেত্রে নেই সরকারি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে মোট ইটভাটা ৮ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৫১৩টির পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। বাস্তবে ঢাকার আশপাশে অন্তত ৫ হাজার অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। ঢাকার পাশেই সাভার ও আশুলিয়ায় প্রায় আড়াই শ অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ইটভাটাই অবৈধ। বছরের পর বছর এগুলো মারাত্মক দূষণ ঘটিয়ে চলেছে।

বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ ড. কামরুজ্জামান বলেন, যেসব কারণে বাতাসের দূষণ বাড়ে তার সবকিছুই এখন পুরোদমে চলছে। করোনা সংক্রমণ কমে আসায় মানুষ এখন বাইরে বের হচ্ছে, গণপরিবহন, ইটভাটা, রাস্তা মেরামতসহ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজও বেড়েছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সরকার উদ্যোগ না নিলে আবারো দূষণের মাত্রার দিক থেকে প্রথম অবস্থানে চলে যাবো আমরা।

তিনি বলেন, যদি এখনই সচেতন না হই, বায়ুমান সূচক যদি তিনদিন ৩০০ পয়েন্টের ওপরে যায়, এবং তিন ঘণ্টার মতো থাকে, তাহলে বাতাসের দূষণগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে শীতকালে সেটা সেখানে গিয়েই দাঁড়াবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী ডিসেম্বরে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি জানান, বায়ুদূষণের কারণের মধ্যে ক্ষুদ্র ধূলিকণা, গ্যাসীয় এবং অণুজীবকে আমরা চিহ্নিত করি। এখন ধুলোবালির পাশাপাশি বাড়ছে অণুজীবগত স্বাস্থ্য সমস্যা। ঢাকার বর্জ্য পচে অণুজীবগুলো বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এতে মাইক্রোবিয়েল এয়ারপলুশন বা অণুজীবগত দূষণ বাড়ছে। ডিসেম্বরে আমরা তিনগুণ বেশি দূষণের মধ্যে বসবাস করি।

এ বিষয়ে বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, লকডাউনে যখন বাতাসের দূষণ কমে এসেছিল, তখনই বলেছিলাম এ অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। কারণগুলো আমরা সবাই জানি। সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতেই হবে। আমরা বার বার ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট চূড়ান্ত করার কথা বলছি। কিন্তু পরিবেশ মন্ত্রণালয় সেটি ফেলে রেখেছে। সব কিছু দেখে আমাদের মনে হয়, সরকার আন্তরিক নয়।

তিনি বলেন, ঢাকার দূষণ কমাতে সরকার একটা রুলস করছে বলে শুনেছি। আমরা বলছি, সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আর সরকার আবারো একাই কাজ করে যেতে চাইছে। এতে করে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার সুবিধা দেওয়া হবে। এইভাবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads