সরকারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি মেট্রোরেল। গত ২৯ আগস্ট থেকে উড়াল রেল সড়কে মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করা হয়েছে। আপাতত ছয়মাস এভাবে পরীক্ষা চলবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে যাত্রী সেবায় বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুৎচালিত কোনো রেল চালু হবে। এটি চালু হলে ঢাকার তীব্র যানজট সমস্যার অনেকাংশে সমাধান হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয়ের এ প্রকল্প পরিচালন খরচও বেশি। আয়-ব্যয় সমন্বয় করতে গেলে যাত্রীদের দিতে হবে অধিক ভাড়া। তাই যাত্রী ভাড়া ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিকল্প আয়ের মাধ্যমে মেটানো হবে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেট্রোরেল পরিচালনার বেতন ভাতা বাবদ দিনে ১৩ লাখ ৯ হাজার ৭১৭ টাকা প্রয়োজন হবে। অন্যান্য প্রাশাসনিক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১১ হাজার ৬৮৫ টাকা। মেট্রোরেলের রক্ষাবেক্ষণে দিনে সাত লাখ টাকার প্রয়োজন হবে। ট্রেন পরিচালনায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ বাবদ ৬৭ হাজার ৯৮৫ টাকা খরচ হবে। বিদ্যুতের বর্তমান দাম ধরে এ হিসাব করা হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে ভাড়াও বাড়াতে হবে। অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৩৫ হাজার ৭৯৩ টাকা।
দৈনিক দুই কোটি ৩৩ লাখ পাঁচ হাজার ৭৪১ টাকা ব্যয় মেটাতে চার লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী হলে কিলোমিটারে দুই টাকা ৪০ পয়সা ভাড়া নিতে হবে। কিন্তু এমআরটি লাইন-৬ বা মেট্রোরেলে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। ৬টি কোচ সম্বলিত প্রতিটি মেট্রোরেল প্রতিবারে ৩৮ মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১৬টি স্টেশনে থেমে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০৮ জন যাত্রী পরিবহন করবে। এ পরিমাণ যাত্রী থেকে ভাড়া আদায় করে এটি পরিচালন করা দূরূহ ব্যাপার।
এবিষয়ে ভাড়া নির্ধারণ কমিটির প্রধান ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, তারা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, কিলোমিটার প্রতি ভাড়া প্রস্তাব করেছেন। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করবে। ভাড়া চূড়ান্ত করবে সরকার। তা প্রস্তাবিত ভাড়ার চেয়ে কম/বেশি হতে পারে। মেট্রোরেল আইন ২০১৫ এর ১৮ (২) অনুযায়ী, পরিচালনা ব্যয় ও জনসাধারণের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হবে।
তিনি জানান, ঢাকার গণপরিবহনে প্রতি কিলোমিটারে বড় বাসে ভাড়া এক টাকা ৭০ পয়সা, মিনিবাসে ১ টাকা ৬০ পয়সা। বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৭ টাকা। মিনিবাসে ৫ টাকা। তাই মেট্রোরেলেও থাকবে সর্বনিম্ন ভাড়া। কিন্তু কেবল যাত্রী পরিবহন করে মেট্রোরেলের ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে না। এজন্য ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। তবে বিকল্প খাত থেকে আয়ের চিন্তাভাবনা করছে কর্তৃপক্ষ। এ জন্য বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে বিপণিবিতান, হোটেল, স্টেশন প্লাজা, বিনোদনকেন্দ্রসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে বিকল্প আয়ের লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে এমআরটি লাইন-৬ এর প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের অধীনে ২৮ দশমিক ৬১৭ একর ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এবং স্টেশন প্লাজা নির্মাণের জন্য এ জমি ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি এ জমিতে বিপণিবিতান, হোটেল, স্টেশন প্লাজা, বিনোদনকেন্দ্রসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এমএএন সিদ্দিক বলেন, ভাড়া নিয়ে আমাদের আইনে দুইটি বিষয় আছে। প্রথমত, জনগণের সামর্থ্য বা সক্ষমতা। দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য যে ব্যয় হবে সেটি তুলে আনা। আমাদের যেটা পরিচালনা ব্যয় সেটি সরকারকে জানিয়ে দেব। আমরা বলব, পরিচালনা ব্যয় এত হলে মেট্রোরেল নিজের মতো করে চলতে পারবে। সরকার যদি মনে করে সামর্থ্য ও সক্ষমতার জন্য প্রথম দিকে একটু কমিয়ে ভাড়া রাখব, সে ক্ষেত্রে ওই অর্থটা না আসলে তো মেট্রোরেল চলতে পারবে না। এখন এটা সমন্বয় করবে সরকার। যদি কোনো কারণে সরকার মনে করে ভর্তুকি দিতে হবে, সেটি সরকারের বিষয়।
তিনি জানান, আমার ভাড়ার পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে আয়ের পথ খুঁজছি। আর এটা দুনিয়ার সবখানেই রয়েছে। শুধু ভাড়া দিয়ে মেট্রোরেল লাভজনক করা যায় না। তার সঙ্গে কতগুলো জিনিস সংযুক্ত রয়েছে। স্টেশনে কমার্শিয়াল স্পেস। টিওডি বা ট্রান্সপোর্ট অব ইন্টার ডেভেলপমেন্ট। তার সঙ্গে স্টেশন প্লাজা। এই তিনটি বিষয় যদি করা যায় তাহলে যে ঘাটতিটা থাকবে, সেটা সেখান থেকে মেটানো যাবে। এভাবেই দেখা গেছে সারা দুনিয়াতে মেট্রোরেল লাভজনকভাবে চলছে।





