আইন-আদালত

আদালতে মামলার ভিড়-১

বিচারকাজে গোঁজামিল

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত মহানগর দায়রা জজ আদালত। প্রতিদিন হাজারো বিচারপ্রার্থী ভিড় করেন এখানে। বিচারাধীন ৭২ হাজারেরও বেশি মামলার পাশাপাশি প্রতিদিন জমা হচ্ছে আরো নতুন নতুন অনেক মামলা।

রাজধানীর অর্ধশতাধিক থানার চুরি, ডাকাতি, হত্যা, মাদক, অস্ত্র ও বোমা-সংক্রান্ত হাজারো মামলার বিচারকাজ পরিচালিত হয় এই আদালতের অধীনে। এছাড়া, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে, নারী ও শিশু আদালতের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং ও দুদকের মামলাসহ বিভিন্ন মামলাগুলো কোনো এক পর্যায়ে মহানগর দায়রাতে তালিকাভুক্ত হয় বিচারের জন্য।

চিফ মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত- সিএমএম তথা ৩৫টি আমলী আদালতের যেসব মামলার জামিনের আবেদন বাতিল হয় (ফৌজদারি বিবিধ মামলা) সেগুলোও পরবর্তীতে এই আদালতে জামিনের জন্য তোলা হয়। এতে প্রতিদিন হাজারো মামলা চাপছে মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন ১৫ টি আদালতের কাঁধে। প্রতিটি আদালতে প্রতিদিন শতাধিক মামলা শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু একজন বিচারকের পক্ষে দিনে ৩০ থেকে ৪০টির বেশি মামলার বিচারকাজ পরিচালনা সম্ভব হয় না। আর একদিনে বিপুল সংখ্যক মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে তাদের ওপর তৈরি হয় প্রচণ্ড মানসিক চাপ। যার প্রভাব পড়ে মামলার সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে।

অন্যদিকে, বিচারপ্রার্থীদেরকে একটি জামিন আবেদন শুনানির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বাদী ও বিবাদী উভয় বিচারপ্রার্থীকেই পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। এ প্রসঙ্গে, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুসলেহউদ্দিন জসিম বলেন, চাঁদাবাজি মামলার প্রায় ৯০ শতাংশই ভুয়া মামলা। প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্যই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব মামলা করা হয়। ফলে নিরীহ অনেক মানুষ এই মামলায় মাসের পর মাস জেল খাটছেন। এই মামলায় জামিনের জন্য ভুক্তভোগীরা এলে মামলার ধরন অনুযায়ী কখনো কখনো বিবাদীকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এরপর শুনানির সময় বিবাদীর আইনজীবী যথাযথভাবে মামলার শুনানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তাড়াহুড়ো করে শুনানি করতে গিয়ে আইনজীবী প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের সুযোগ পান না। নিম্ন আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, কোনো মামলার শুনানি করতে গেলে অন্য আইনজীবীরা শুনানি দ্রুত শেষ করার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন। যদিও এখানে বিচারকের কিছুই করার থাকে না। কারণ, তার কাঁধে অনেক মামলা থাকায় নিরুপায় হয়েই মামলাগুলো শুনতে কম সময় নেন।

মনিরুজ্জামান বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীকে স্বাভাবিকভাবেই মামলার মেরিট তুলে ধরতে গেলে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেখা গেলো তিনি কোনো কারণে স্বল্প সময়ে যথাযথ বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন নি। কিন্তু বাদীপক্ষের আইনজীবী সংক্ষেপে দু একটি জোড়ালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তখন জামিনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বিচারক তাড়াহুড়ো করে জামিন আবেদন বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন। এসবক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীকে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় উচ্চ আদালতে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এতে ওই ব্যক্তিকে মাস কিংবা বছরের পর বছর বিনা অপরাধে জেলের ঘানি টানতে হয়।

ঢাকা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী মুসলেহউদ্দিন জসিম বলেন, চাঁদাবাজি মামলায় অনেক সময় বাদী মামলা করে আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিরুদ্দেশ হয়ে যান। অথচ এসব মামলার বিচারকাজ শেষ হতে ৮ থেকে ১০ বছর লেগে যায়। তখন বিবাদীপক্ষের হয়রানি এবং সীমাহীন দুর্ভোগ দেখার কেউ থাকে না। মুসলেহউদ্দিন জসিমের মতে, বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো হলে এই সমস্যার সমাধান মিলতো। পাশাপাশি চাঁদাবাজি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বিচারিক আদালতের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

হয়রানি আর ভোগান্তির একটা নমুনামাত্র চাঁদাবাজি মামলা। এরকম অধিকাংশ মামলার ক্ষেত্রেই বিচারক সঙ্কটে বিচারপ্রার্থীদের অন্তহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিষয়টি স্বীকার করে মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) তাপস কুমার পাল বলেন, বিচারক সঙ্কটের কারণে অনেক বিচারককে সকাল-বিকাল দুই বেলাও বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। আবার একই কোর্টে সকালে একজন এবং বিকেলে অন্যজনকে বসতে হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেকক্ষেত্রে একটি মামলায় একাধিক সাক্ষীকে জেরা করতে হয়। কিন্তু সময়ের অভাবে সাক্ষীদের ঠিকভাবে জেরা করার সুযোগ পাননা আইনজীবীরা। এর ফলে বিচার প্রক্রিয়ায় এক ধরনের গোঁজামিলের বিষয়টি স্বীকার করে সরকারি এই কৌঁসুলির জানান, বর্তমানে কোনো কোনো বিচারককে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টিরও বেশি মামলা পরিচালনা করতে হয়। এছাড়া, মহানগর দায়রার প্রধান বিচারককেও আরো বেশি মামলা পরিচালনা করতে হয়। কোনো কোনোদিন তাকে দিনে শতাধিক মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করতে হয়। যেটি একেবারেই বাস্তবসম্মত নয় বলে জানান, তাপস পাল। তিনি বলেন, এসব কারণে বিচারপ্রার্থীরাও যথাযথ বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পিপি তাপস পাল জানান, রেবতী ম্যানশনে নতুন আদালত ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে আদালতের সংখ্যা বাড়বে। তখন হয়তো চাপ কমার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের হয়রানিও হয়তো কিছুটা লাঘব হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads